বোরো ধান কাটছেন দুজন © টিডিসি
বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে মাঠ ভরে রয়েছে পাকা ধানে। কিন্তু সেই ধান ঘরে তোলার নিশ্চয়তা নেই কৃষকদের। আকাশে মেঘ, হঠাৎ বৃষ্টি আর ঝড়ের আশঙ্কা সব মিলিয়ে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে চাষিদের। কখন ধান কাটবেন, আর কখন অপেক্ষা করবেন- এই সিদ্ধান্তই এখন সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে পেকে গেছে। তবে, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অনেক কৃষকই ধান কাটতে পারছেন না। আবার কোথাও ধান কেটে রাখার পর হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা।
যশোর সদর, অভয়নগর, কেশবপুর ও শার্শা উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ জমির ধান কাটার উপযুক্ত হলেও কৃষকরা অপেক্ষা করছেন আকাশ পরিষ্কার হওয়ার।
সদরের নুরপুর গ্রামের কৃষক সবুর মন্ডল বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে ধান পেকে গেছে। কিন্তু এখন কেটে ফেললে যদি বৃষ্টি হয়, শুকাতে না পেরে সব নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিতে পারছি না।’
সদরের ডাকাতিয়া গ্রামের আব্দুর রশিদ বলেন, ‘ধানের দাম কম, আর খরচ অনেক বেশি। বিঘাপ্রতি ধান কাটা, বাঁধা, বাড়িতে আনা আর মাড়াই মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার টাকার মতো খরচ হচ্ছে। এমন অবস্থায় যদি ধান নষ্ট হয়, তাহলে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
শুধু আবহাওয়াই নয়, কৃষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে শ্রমিক সংকট। অনেক জায়গায় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আর পাওয়া গেলেও মজুরি অনেক বেশি। কেশবপুরে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। বোলপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, একদিকে আকাশের ভয়, অন্যদিকে শ্রমিকের অভাব দুই দিক থেকেই চাপে আছি। সময়মতো কাটতে না পারলে ফলন নষ্ট হবে।
অন্যদিকে যারা ধান কেটেছেন, তারাও নিরাপদ নন। অভয়নগরে হঠাৎ এক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতে কেটে রাখা ধান পানিতে ডুবে গেছে অনেক মাঠে। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ভেজা ধান রোদে শুকানোর সুযোগ না পেয়ে এখন পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মাঠে নেমে নারী-পুরুষ একসঙ্গে পানির নিচ থেকে ধান তুলে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
মধুগ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘এই এক বিঘা ধানই আমার সারা বছরের ভরসা। ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু শেষ সময়ে এসে বৃষ্টি আর শ্রমিকের কারণে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
শ্রমিকরাও একই সমস্যার কথা বলছেন। ধান কাটা শ্রমিক জিন্নাহ আলী ও বিপুল মিয়া জানান, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় নিয়মিত কাজ করা যাচ্ছে না। এতে তাদের আয়ও কমে যাচ্ছে, আবার কৃষকরাও সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ঝিকরগাছার কৃষি কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম জানান, ঝিকরগাছা উপজেলায় এবার ১৯ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ ধান পেকে গেছে। যেসব ধান পুরোপুরি পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। আর যেসব ধান পানিতে পড়ে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে মারাই করতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই অধিকাংশ ধান কাটা সম্ভব হবে।