কক্সবাজারের চকরিয়া

বিদ্যালয়ের চারপাশে তামাকখেত, শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৩ PM , আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০৫ PM
একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের জমিতে চাষ করা হয়েছে তামাক

একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের জমিতে চাষ করা হয়েছে তামাক © টিডিসি

কক্সবাজারের চকরিয়ায় বিদ্যালয়ের চারপাশে বিস্তৃত তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। শ্রেণিকক্ষের আশপাশে তামাকখেত ও চুল্লির উপস্থিতিতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার অন্তত ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে ব্যাপকভাবে তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ চলছে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন তামাকখেত ও তামাকচুল্লির মধ্যেই পড়াশোনা করছে। কোথাও বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষে তামাকখেত, কোথাও বিদ্যালয়ে প্রবেশের পথের দুই পাশে বিস্তৃত তামাক চাষ। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, তামাকখেতের মাঝখানেই যেন বসে আছে বিদ্যালয়।

মাতামুহুরী নদীর তীরঘেঁষা চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের পুলের ছড়া এলাকায় দেখা যায় হৃদয়বিদারক এক চিত্র। তামাকপাতার আঁটির ওপর বসে আছে আট বছরের এক শিশু। সামনে সদ্য কাটা তামাকপাতার স্তূপ। এই বয়সে তার থাকার কথা ছিল স্কুলের শ্রেণিকক্ষে, কিন্তু বাস্তবতা তাকে টেনে এনেছে তামাকখেতে। তামাক মৌসুম এলেই সে বাবার সঙ্গে মাঠে যায়—পাতা কাটা, আঁটি বাঁধা এবং চুল্লিতে পাতা নিয়ে যাওয়াই হয়ে ওঠে তার প্রতিদিনের কাজ।

শিশুটি জানায়, তামাক কাটার সময় সে স্কুলে যেতে পারে না। তার বাবা বলেন, শ্রমিক রাখার সামর্থ্য না থাকায় ছেলেকে সঙ্গে নিতে বাধ্য হন। স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও আর কোনো উপায় নেই। এই চিত্র শুধু একটি পরিবারের নয়—চকরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়নে তামাক মৌসুমে অনেক শিশুই পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, বমু বিলছড়ি, বরইতলী এবং সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। কাকারা ইউনিয়নের ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই তামাকখেত। ফাঁসিয়াখালীর পুকপুকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কের দুই পাশে তামাক চাষ। বমু বিলছড়ির নাজমা ইয়াছমিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রায় তিন দিক থেকেই তামাকখেতের মধ্যে আবদ্ধ।

এসব বিদ্যালয়ের আশপাশে অন্তত ১১০টি তামাকচুল্লিতে পাতা শুকানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে উপজেলা শিক্ষা অফিস। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় চুল্লি থেকে বের হওয়া তীব্র গন্ধ বাতাসে ভেসে শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে যায়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত এই দূষিত পরিবেশে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ডা. গোপাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমেনা বেগম বলেন, তামাকপাতার গন্ধ ক্লাসরুম পর্যন্ত চলে আসে। তামাক কাটার মৌসুমে অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের সঙ্গে কাজে যুক্ত হওয়ায় স্কুলে অনুপস্থিত থাকে। এতে তাদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।

চিকিৎসকদের মতে, তামাকপাতায় থাকা নিকোটিন ত্বকের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা ‘গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস’ নামে পরিচিত। এতে বমি, মাথা ঘোরা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এ ছাড়া তামাক চাষে ব্যবহৃত কীটনাশক শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অল্প বয়সে এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলে দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

পরিবেশগত দিক থেকেও তামাক চাষের প্রভাব মারাত্মক। তামাক চাষে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানি ও সেচের মাধ্যমে নদী ও জলাশয়ে মিশে জলজ প্রাণীর ক্ষতি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। পাশাপাশি তামাকখেতের পাশের জমির ফসলের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে।

সুরাজপুর চরের কৃষক আলী আহমদ জানান, তামাকখেতের পাশে তার বাদামের জমিতে আগের তুলনায় ফলন অনেক কমে গেছে। আগে যেখানে একটি গাছে প্রায় ২৫০ গ্রাম বাদাম পাওয়া যেত, এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১০০ গ্রামে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহানাজ ফেরদৌসী বলেন, তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার মাটির জৈব গঠন নষ্ট করে এবং দীর্ঘ মেয়াদে জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। এতে খাদ্যশস্য উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।

তবু অনেক কৃষক তামাক চাষে ঝুঁকছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তামাক কোম্পানিগুলো আগাম অর্থ, বীজ ও উপকরণ সরবরাহ করে, ফলে আয় তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত থাকে। অন্য ফসলে সেই নিশ্চয়তা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে তামাক চাষ করছেন।

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর চকরিয়া উপজেলার সভাপতি ও চকরিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ কে এম বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘তামাকের আগ্রাসন রোধে সব পরিবেশ সংগঠন ও পরিবেশবাদীদের যৌথ উদ্যোগে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনকেও ঐক্যবদ্ধভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এ সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ারও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সব মিলিয়ে চকরিয়ার এই চিত্র শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

বড় চমক দেখাল ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, দুইদিনে ফলোয়ার ছাড়…
  • ২১ মে ২০২৬
পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব পিডিবির, ভোক…
  • ২১ মে ২০২৬
দাদা-দাদির কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলো রামিসা
  • ২১ মে ২০২৬
নির্মাণ শ্রমিক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থী হেনস্তা, নোবিপ্রবিতে …
  • ২১ মে ২০২৬
পশুর হাটের ইজারা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে বন্ধ ইজারা কার…
  • ২১ মে ২০২৬
আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা ভাইরাসের বৈশ্বিক ঝুঁকি কতখানি?
  • ২১ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081