নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীরা © সংগৃহীত
রাত পোহালেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘদিনের প্রচারণা শেষে ইতোমধ্যে থেমে গেছে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। নির্বাচনী পোস্টার, মাইকিং আর পথসভা এখন স্মৃতি। আগামীকাল সকাল থেকে শুরু হবে ভোট গ্রহণ, আর ভোট শেষেই নির্ধারিত হবে নতুন সরকারের ভাগ্য। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের।
নাটোর জেলার সাতটি উপজেলা নিয়ে গঠিত চারটি সংসদীয় আসনে ভোটকে ঘিরে শেষ মুহূর্তে উত্তেজনা তুঙ্গে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠলেও অন্য দলগুলোর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ ও আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও ভোটের মাঠে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
প্রার্থীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে ভোটারদের দোরগোড়ায় গিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাধারণ মানুষও পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়ন ও জনসেবার স্বপ্ন দেখছেন। নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহলে পুরো নাটোর জেলা রয়েছে কঠোর নিরাপত্তায়।
নাটোর-১ (লালপুর ও বাগাতিপাড়া): বিভক্ত বিএনপি, সুযোগে জামায়াত?
জাতীয়তাবাদী ভোটব্যাংক শক্তিশালী হওয়ায় এ আসনে অতীতে একাধিকবার বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান পটলের কন্যা—
বিএনপি চেয়ারপারসনের পররাষ্ট্রবিষয়ক পরামর্শক কমিটির বিশেষ সহকারী, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল।
মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কলস মার্কা প্রতীক নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির সদস্য বহিষ্কৃত সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে দাড়িপাল্লা প্রতীকে লড়ছেন লালপুর উপজেলা জামায়াতের আমির ও সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ।
বিএনপির একাধিক প্রার্থী ও দলীয় কোন্দলের কারণে এই আসনে জামায়াত তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জয়ের হাসি—তা নির্ধারণ হবে ভোটের ফলেই।
নাটোর-২ (সদর ও নলডাঙ্গা): দুলুই কি শেষ কথা?
জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য, সাবেক উপমন্ত্রী ও একাধিকবারের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। দলের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, দীর্ঘ দেড় দশক ধরে এ এলাকার মানুষ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। দুলু পুনরায় নির্বাচিত হলে মন্ত্রিত্ব পেয়ে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবেন—এমন প্রত্যাশা রয়েছে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও।
এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির ও বাগাতিপাড়া সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ইউনুস আলী। সক্রিয় প্রচারণার কারণে এই আসনেও ভোটের উত্তাপ সবচেয়ে বেশি।
নাটোর-৩ (সিংড়া): বিএনপির ঘাঁটিতে কঠিন লড়াই
বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিংড়া আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সিংড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আলোয়ারুল ইসলাম আনু। তিনবারের সংসদ সদস্য অধ্যাপক কাজী গোলাম মোর্শেদের মতো প্রভাবশালী নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়ন পান আনু।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাঠে রয়েছেন নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সাইদুর রহমান। জামায়াত নেতারা বলছেন, ১৯৯১ সালে সিংড়া থেকে তাদের প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবারও বিজয়ের ব্যাপারে তারা আশাবাদী।
নাটোর-৪ (বড়াইগ্রাম ও গুরুদাসপুর): তৃণমূলে জেগেছে উৎসাহ
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এ আসনে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। প্রার্থীরা ঘরোয়া অনুষ্ঠান ও সামাজিক আয়োজনেও অংশ নিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করেছেন।
ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আজিজ। স্থানীয়ভাবে তাকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক মাওলানা আবদুল হাকিম। তিনিও নিয়মিত ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই আসনটিও নাটোরের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ আসনে পরিণত হয়েছে।
তরুণ ভোটার তুষার ইমরান বলেন, এবারের নির্বাচনে তরুণ সমাজ কোনো আবেগ বা সাময়িক প্রলোভনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। বরং তাঁরা এমন একজন প্রার্থীকে ভোট দিতে আগ্রহী, যাঁর মধ্যে যোগ্যতা, সততা ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের স্পষ্ট প্রতিফলন থাকবে। তাঁর মতে, এলাকার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে জনপ্রতিনিধিকে হতে হবে দূরদর্শী, জনবান্ধব এবং বাস্তবমুখী চিন্তাধারার অধিকারী।
তিনি আরও জানান, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় সংকট হলো শিক্ষার মানের অবনতি এবং বেকারত্বের ক্রমবর্ধমান সমস্যা। একটি উন্নত ও টেকসই সমাজ গঠনে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করা এবং শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি। যিনি এসব খাতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন, তরুণ সমাজ তাকেই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চায়।
বয়স্ক ভোটার রহমান বলেন, এলাকার রাস্তা-ঘাট, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব কাজের মাধ্যমে যিনি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবেন—তাকেই তারা ভোট দেবেন বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।