ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি, সচেতন নাগরিকদের উদ্বেগ

১৬ জুলাই ২০২৫, ০৯:১৮ AM , আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৫, ০২:৫২ PM
হরিকিশোর রায়ের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বাড়ি

হরিকিশোর রায়ের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বাড়ি © টিডিসি

ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর একটি হরিকিশোর রায়ের প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো বাড়িটি। ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ভবনটি ভেঙে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাস সচেতন নাগরিকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

শিশু একাডেমির এই উদ্যোগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, এই ভবনটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের অংশ। হরিকিশোর রায়ের নামে শহরের একটি রাস্তার নামকরণ হয়েছিল ‘হরিকিশোর রায় রোড’। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর এ বিষয়ে কাজ করে রিপোর্ট দিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে নতুন স্থাপনা নির্মাণের জন্য এটি ভাঙা হয়েছে।

এদিকে, বাড়িটি ভাঙ্গা শুরু করার পরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিন্দার ঝড় ওঠে। কবি শামীম আশরাফ তার ফেসবুকে লেখেন, হরিকিশোর রায় রোড, (রাজবাড়ীর পিছনে) শশীলজ সংলগ্ন পুরাতন বাড়ি। রাজা সূর্যকান্তের কর্মকর্তাদের বাড়ি। পরবর্তীতে আশপাশে সব দখল ভোগের পর এই বাড়িটি বাকি ছিলো। শিশু একাডেমির নামে চলতো কার্যক্রম। ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কি হবে কেউ জানেন না? আমাদের মমিসিঙ যেন ভাঙনের মমিসিঙ!

‘ময়মনসিংহ সিটি’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মুসরিন আক্তার মিম মন্তব্য করেন, কেন ভাঙল? এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তো সংরক্ষণ করা উচিত। ফাল্গুনী চক্রবর্তী লেখেন, শিশু একাডেমির ক্লাস করতাম এখানে।

আশিকউজ্জামান নামে একজন মন্তব্য করেন, কী আর বলবো, পুরোনো স্থাপনা ময়মনসিংহে আর তেমন কিছুই রইলো না। অথচ জমিদারবাড়ির আধিক্যের কারণে ময়মনসিংহ শহরকে বলা হতো জমিদারদের শহর। পুরাতন বিল্ডিংয়ের শহর। আজ সেটা অস্তিত্ব সংকটে। অথচ এই ময়মনসিংহ শহরকে কলকাতার মতো রাজকীয় শহর হিসেবে সাজানো যেত। ভবনটির সামনের অংশ ইতোমধ্যে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ইটগুলো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। ভবনের ভেতরের অংশও প্রায় গুঁড়িয়ে গেছে। তবে সোমবার বিকেল ও মঙ্গলবার সকালে গিয়ে কোনো শ্রমিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। আপাতত ভাঙার কাজ বন্ধ রয়েছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন গণমাধ্যমকে জানান, এ সম্পর্কে তথ্য চেয়ে জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেছি। এটি রায় পরিবারের ঐতিহাসিক বাড়ি এবং সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের নিবাস ছিল। যদিও এটি এখনও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়, তবে এ বছর নতুন জরিপে এটি তালিকাভুক্ত হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, আজ ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি জানিয়েছেন, শিশু একাডেমির সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। তবে শতবর্ষী এই ভবনটি ভাঙা মোটেও ঠিক হয়নি। এটি রক্ষা করে নতুন ভবন নির্মাণ সম্ভব ছিল।

ময়মনসিংহ শিশু একাডেমির জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা মো. মেহেদী জামান বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে ভবনটি ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। একাডেমির কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল ভাড়াবাড়িতে। ঝুঁকি বিবেচনায় একবার মেরামতের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে ৪৭ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া শিশুদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ভাড়াবাড়ি উপযুক্ত নয়।

তিনি জানান, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। মেসার্স ময়ূর বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। ভাঙার কাজ শেষে আপাতত একটি আধাপাকা ভবন নির্মাণ করা হবে এবং পরে পাঁচতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ভবনটি সংরক্ষণ করে নতুন ভবনের কাজ সম্ভব ছিল কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভবনটি অনেক আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর এ বিষয়ে কাজ করে রিপোর্ট দিয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ও লেখক স্বপন ধর বলেন, মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী তার সমমনা হিতাকাঙ্ক্ষীদের নিজের কাছাকাছি নিয়ে আসেন। তাদের মধ্যে ছিল হরিকিশোরদের পরিবার। ভবনটির পাশেই হরিকিশোরের ভবন আছে। যেহেতু ভবনটি পাশাপাশি, ধারণা করছি এটিও তাঁদেরই বংশধরদের কারও। বাড়িটি কয়েকবার হাতবদল হয়েছে। বাড়িটি সর্বশেষ প্রখ্যাত সমাজসেবক রণদা প্রসাদ সাহা কিনে নিয়েছিলেন। স্থাপত্যশৈলী দেখে বোঝা যায়, ভবনটি ১৭৮৭ সালের পর গড়ে ওঠে।

আরও পড়ুন: কেশবপুরে টানা বৃষ্টিতে ৫ হাজার পরিবার পানিবন্দী, সড়কে আশ্রয় অনেকের

স্বপন ধর বাড়িটি ভাঙার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, বাড়িটির যে অবস্থা, তাতে রক্ষা করা সম্ভব নয়। আগে হলে রক্ষা করা যেত। যেহেতু এটি রক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই যে আদলে ছিল ঐতিহ্য রক্ষা করে সেই আদলেই যেন করা হয়, সেই দাবি জানাই।

লেখক ও কবি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ২০০ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রক্ষা করে ভবন নির্মাণ করা যেত। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় ইতিহাসবিদরা যখন সংরক্ষণের পক্ষে, তখন শিশু একাডেমি এই ভবন ভেঙে দিচ্ছে—এটা খুবই দুঃখজনক। ইতিহাস-ঐতিহ্য এভাবে ধ্বংস হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের শহরের পরিচয় কী থাকবে?

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রেজা মো. গোলাম মাসুম প্রধান বলেন, শিশু একাডেমি কীভাবে এ ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করছে, তা জানতে তাদের ডাকা হয়েছে। কাগজপত্র দেখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, হরিকিশোর রায় ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া জমিদারবাড়ির জমিদার। তিনি উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ। জানা যায়, উপেন্দ্রকিশোর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার পিতা কালীনাথ রায়ের জ্ঞাতিভাই হরিকিশোর রায়ের কাছে দত্তক হিসেবে আসেন। হরিকিশোরের স্নেহ-ভালোবাসায় উপেন্দ্রকিশোরের শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং তিনি ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে ১৮৮০ সালে বৃত্তি নিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বাড়িটি ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। একতলা এই বাড়িটির সামনে একটি ছোট মাঠ রয়েছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনটি আগাছায় ঢেকে যায় এবং মাদকসেবীদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। গত কয়েক দিন ধরে বাড়িটি ভাঙার কাজ শুরু করেছে শিশু একাডেমি। ভবনটি ময়মনসিংহে বিএনপির কার্যালয়ের পাশেই অবস্থিত।

 

মদ খেয়ে ৫ বন্ধু মিলে বান্ধবীকে ধর্ষণ
  • ১৯ মে ২০২৬
শিক্ষামন্ত্রীর কাছে আপাতত তিন প্রত্যাশা ফাহামের
  • ১৯ মে ২০২৬
এমসি কলেজের নতুন অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ তোফায়েল আহাম্মদ
  • ১৯ মে ২০২৬
বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় শক্তিশালী শান্তিরক্ষা ব্যবস্থার…
  • ১৯ মে ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ বিষয়ে রচিত হবে নতুন পাঠ্যপুস্তক…
  • ১৯ মে ২০২৬
অটোরিকশার ধাক্কায় এসএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু, গ্রেপ্তার ১
  • ১৯ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081