অপরাজেয় কথাশিল্পীর 'দেনা পাওনা'

০৬ জুলাই ২০২১, ০৯:৩৮ PM
আনিকা তাসনিম সুপ্তি

আনিকা তাসনিম সুপ্তি © টিডিসি ছবি

বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প ও উপন্যাসের এক অবিস্মরণীয় স্রষ্টার নাম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' নামেই খ্যাত। তাঁর ঔপন্যাসিক খ্যাতি গড়ে উঠেছিল সমাজ ও নীতিঘটিত উপন্যাসে। নিন্দার স্বীকার হলেও তিনি প্রগতিবাদী নতুন অনেক লেখক ও পাঠকের প্রশংসাও পেয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় শরৎসাহিত্য লাভ করেছে এক অনন্যসাধারণ বিশিষ্টতা যা পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত করেছে।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অত্যন্ত পাঠক নন্দিত একটি উপন্যাস হলো 'দেনা-পাওনা'। জনপ্রিয় এই লেখক জমিদার প্রথা, ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব এবং একজন নারীর মনের দৃঢ়তা আর কোমলতাই চিত্রায়ন করেছেন এই উপন্যাসে।

বীজগাঁর জমিদারিভুক্ত গ্রাম চন্ডীগড়। এই গ্রামের মা চন্ডীর প্রধান সেবিকার পদবী ভৈরবী। উপন্যাসের ভৈরবী হচ্ছে ষোড়শী- এক সাহসী নারী যে তার বুদ্ধিমত্তা, দয়ালু মনোভাবের মধ্য দিয়ে গ্রামের মানুষকে আগলে রাখে। কিন্তু বীজগাঁর জমিদার জীবানন্দ চৌধুরী চন্ডীগড়ে আসার পর থেকেই তার অত্যাচার অনাচার আর নিষ্ঠুরতায় গ্রামের জনতা দিশেহারা। তাদের মাতৃরূপী ষোড়শীও এই নিষ্ঠুরতা হতে রেহাই পায় না। বলিষ্ঠ এই নারীর সতীত্বে কালিমা লাগিয়ে তাকে পদচ্যুত করাই যেনো ক্ষমতালোভী শ্রেনীর উদ্দেশ্য। জমিদার ছাড়াও এই শ্রেনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বয়ং ষোড়শীর পিতা তারাদাস, জনার্দন রায়, শিরোমণি, গোমস্থা এককড়িসহ ছোট বড় আরো অনেকে। ষোড়শীর এমনই সম্মানহানির সময় সে পাশে পায় জনার্দন রায়ের কন্যা হৈমবতী ও তার ব্যারিস্টার স্বামী নির্মল বসুকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র ফকিরসাহেব, ষোড়শী যাকে গুরু মেনেছিল। এতসবকিছুর পরও ভাগ্য ষোড়শীর সহায় না, অথবা সে নিজেই নিজের ভাগ্যকে অগ্রাহ্য করেছিল।

আপাত দৃষ্টিতে কাহিনী এটি হলেও উপন্যাসের ভেতরকার ঘটনা আরো ঘোলাটে। বইয়ের মাঝপথে জটিল এক কাহিনী এসে হাজির হয় পাঠকের সামনে। প্রধান চরিত্র- ষোড়শী আর জীবানন্দের মন পরিবর্তনে বারবার উপন্যাসের মোড় ঘুরা দেখে এটিকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বললেও খুব বেশি ভুল হবে না।

নিজের বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানো বা পরনির্ভরতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবাদী ষোড়শীর উপর জমিদারের বিভিন্ন অন্যায়, অত্যাচারের জবাব ষোড়শী কখনোই দেয়নি, কিন্তু তার অমায়িক ও অকপট চরিত্রের ভারে উদ্দেশ্যহীন ব্যভিচারী পাপিষ্ঠ জমিদার জীবানন্দ পর্যুদস্ত হয়েছে অনেকবার। তবে ষোড়শীর নারী মনের কোমলতা দিয়ে জমিদারকে রক্ষা করেছে সে। কিন্তু কেনো সে এই পাপিষ্ঠকে রক্ষা করেছে বারবার? কেনই বা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও প্রতিবাদ না করে লোকচক্ষুর আড়াল চলে যায় এই সন্ন্যাসিনী? অবশেষে কি ষোড়শীর মুক্তি মেলে? এতসব প্রশ্নই থাকবে পাঠকের মনে। শেষ পরিণতি সুন্দর তবে উপন্যাসের শুরুর দিকের ষোড়শী শেষের দিকে যেনো অন্য এক মানুষে পরিণত হয়ে যায়।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দৈনন্দিন জীবনের অতি ছোটখাটো ঘটনাকেও অবিশ্বাস্য দক্ষতায় তুলে এনেছেন তাঁর এই উপন্যাসে। বাঙালির সমাজ সম্পর্কে এক বিরাট জিজ্ঞাসা এবং বাঙালির অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ জীবনের অনেক সত্য উন্মোচন করেছেন সামাজিক এই উপন্যাসে। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় জমিদারী প্রথার প্রভাবই মূল বিষয় নয়, বরঞ্চ ধর্মীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র অংকিত হয়েছে এখানে। সেই সাথে নারীর মনের প্রেম ভালোবাসা ও মায়া কে ফুটিয়ে তুলেছেন এই বিজ্ঞ লেখক। তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় জমিদার প্রথার বাস্তব চিত্র অঙ্কিত করেছেন নিজস্ব মহিমায়। সাধারণ প্রজা ও জমিদারদের সম্পর্কের ছোট ছোট নানান চিত্রও এনেছেন।

শরৎচন্দ্র দারিদ্র্যকে চিনেছিলেন নিজের জীবন দিয়ে, মনোগত ও বস্তুগত- উভয় প্রকারেই। তাই তাঁর সাহিত্যেও দারিদ্র্যের কশাঘাত বেশ স্পষ্ট। তাই এই কথাশিল্পী সমাজের বঞ্চিত-লাঞ্ছিতদের জীবন অতিশয় গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নিগৃহীত, প্রপীড়িতদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছেন এবং উপন্যাসের সংলাপের ছলে তাদের হয়ে কথা বলেছেন। পাশাপাশি মূর্খতায় আচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুর শাসনে লাঞ্ছিত নরনারীর অশ্রুসিক্ত জীবনকথা অবলম্বন করে মানবদরদী শরৎচন্দ্র এই উৎকৃষ্ট উপন্যাসটি রচনা করেছেন। এতে বাংলার সমাজের নানান চিত্র উন্মোচিত হয়েছে আমাদের সামনে।

এই উপন্যাসটিতে শুধু কঠিন নারী চরিত্র সৃষ্টিই নয়, নারীর পক্ষে এবং নারীর সামাজিক বঞ্চনার বিরুদ্ধেও সংলাপের আড়ালে তিনি তেজি, সাহসী বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি যেমন খুব চিত্তাকর্ষক কাহিনীর অবতারণা করেছিলেন, তেমনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার চাপে পিষ্ট মানুষের মর্মান্তিক পরিণতি আর তাদের প্রতিবাদের কাহিনি লিখে সমাজের শিষ্ট ও শিক্ষিত স্তরে প্রচন্ড আঘাত দিয়েছেন। উপন্যাসটির শেষ পরিণতিতে কিছু পাঠকের মনে দোটানা বা বিতর্কের সৃষ্টি হলেও উপন্যাসটির কিছু জায়গা এককথায় অনন্য।

উপন্যাসের লাইনগুলো থেকে সংলাপের আড়ালের বাস্তব কিছু সত্য তুলে এনেছি-

"অযাচিত মধ্যস্থতায় কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণই বেশি হয়।"

"নারীর একজাতীয় রূপ আছে যাহাকে যৌবনের অপর প্রান্তে না পৌঁছিয়া পুরুষে কোনোদিন দেখিতে পায় না৷"

"একজন স্ত্রীলোকের নষ্ট-চরিত্রের কাহিনী তার অসাক্ষাতে বলার মধ্যে যথাধর্মের যথাটা যদি বা থাকে, ধর্মটা থাকবে কি?"

"দেবতার সঙ্গে আপনাকে জড়িয়ে আত্নবঞ্চনার চেয়ে বরঞ্চ দেবতাকে ছাড়াও ভাল।"

"যত্ন জিনিসটায় মিষ্টি আছে সত্যি, কিন্তু তার ভান করাটায় না আছে মধু না আছে স্বাদ।"

"দুর্নাম জিনিসটা তো চিরদিনই মন্দ, কিন্তু চিরকালের দোহাই দিয়েও মন্দটাকে চিরকাল চালানো চলে না।"

"দুঃখীদের কোন আলাদা জাত নেই, দুঃখেরও কোন বাঁধানো রাস্তা নেই। তা থাকলে সবাই তাকে এড়িয়ে চলতে পারত৷ হুড়মুড় করে যখন ঘাড়ে এসে পড়ে তখনই মানুষ তাকে টের পায়। কিন্তু কোন পথে যে তার আনাগোনা আজও কেউ তার খোঁজ পেলো না।"

৪র্থ বর্ষ, লোকপ্রশাসন বিভাগ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইরানে ব্যবহার করা হবে পারমাণবিক অস্ত্র, প্রস্তুতি নিচ্ছে জা…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
জ্বালানি তেল সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি এমপি রা…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
মৌচাকের মধু বিক্রির টাকায় শিক্ষার্থীদের ক্রীড়াসামগ্রী, প্রশ…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
ইরানে যুদ্ধ থামাতে গিয়ে আহত হলেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্…
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
নওগাঁয় ৫ বিঘা ধানক্ষেতে বিষ ছিটিয়ে ফসল নষ্টের অভিযোগ
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল নিয়ে ধোঁয়াশা, যা …
  • ৩০ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence