একদল তরুণ ছুটছে দু’চক্রযানে
যান্ত্রিকতার এই যুগে সবাই এখন যান্ত্রিক। স্বল্প দূরত্বের রাস্তাও আমরা যান্ত্রিক যানবাহনে পাড়ি দিচ্ছি। তরুণরা ব্যস্ত থাকছে মোবাইল, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটারে। আবার অনেকেই হতাশায় জড়িয়ে পড়ছে মাদকের ধূম্রজালে। ইট পাথরের শহরে যানজট, দূষণ,ব্যস্ততায় সবাই যখন হাঁপিয়ে উঠছি, তখনই প্রকৃতির একটু সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় একদল তরুণ ছুটছে দু’চক্রযানে। সবার উদ্দেশ্য একটাই প্রকৃতিকে একটু কাছ থেকে পরখ করা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা কোনো বিশেষ দিনের উদযাপনে তরুণরা এখন বেছে নিচ্ছে দলবেঁধে সাইক্লিংকে। ধীরে ধীরে শুরু হলেও বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে এখন অনেক জনপ্রিয় সাইক্লিং। পিছিয়ে নেই নারীরাও, তারাও সমান তালে যোগ দিচ্ছে সাইক্লিং করতে। স্বাস্থ্য সচেতনতায়, প্রতিবাদ র্যালি কিংবা সমাজ সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে তরুণ-তরুণীকে প্রায়ই দেখা যায় সাইক্লিং করতে।
এছাড়াও স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন সাইকেলকে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহার করছে। কর্মজীবীরা যানজট থেকে রেহাই পেতে সাইকেলে করেই যোগ দিচ্ছে কর্মস্থলে। শুধু তরুণ-তরুণী কিংবা ছাত্র-ছাত্রী নয় সকল বয়সের মানুষের মধ্যে সাইক্লিংয়ে আগ্রহ দেখা যায়। স্বাস্থ্য সচেতনার অংশ হিসেবেও অনেকেই সাইক্লিং করে।
এরই মধ্যে সাইক্লিং নিয়ে ফেসবুক ভিত্তিক বেশকিছু ছোট বড় সংগঠনও তৈরী হয়েছে। যারা মূলত বিভিন্ন ইভেন্ট খুলে ছুটির দিনসহ বিভিন্ন সময় সাইক্লিং করে। দলবেঁধে সাইকেলে করে তারা চলে যায় যান্ত্রিক নগরী থেকে কিছুটা দূরে কোনো এক গ্রামে বা দর্শনীয় কোনো স্থানে।
এরকম কিছু গ্রুপ হচ্ছে বিডি সাইক্লিস্ট, সাউথ ঢাকা সাইক্লিস্ট, ইস্ট ঢাকা সাইক্লিস্ট, হেমন্ত রাইডার্স, হলিডে রাইডার্স, মিরপুর রাইডার্সসহ বিভিন্ন জেলা বা এলাকা ভিত্তিক গ্রুপ। তার মধ্যে বিডিসাইক্লিস্টস নামে সাইকেলিং গ্রুপ ২০১৬ সালে ১৬ ডিসেম্বর গড়েছে ‘লংগেস্ট সিংগেল লাইন অব বাইসাইকেল মুভিং’ গ্রিনিচ ওয়াল্ড রেকর্ড।
প্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল বা কম্পিউটার রেখে তরুণদের সাইক্লিং এ আসাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্য হওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণীই বিপথে যাচ্ছে, একাকীত্বে ভুগছে। আবার তরুণ সমাজের বড় একটা অংশ মাদকসহ অন্যান্য অপরাধমূলক কাজের দিকেও ঝুঁকছে। এসব থেকে বের হয়ে আসতে সাইক্লিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে শারীরিক ভাবেও অনেক সুফল পাওয়া যায়। জানা যায়, নিয়মিত সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ওজন কমে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, শরীরের মাংসপেশির ব্যায়াম হয়, কার্ডিয়ভাসকুলার ফিটনেস উন্নত হয়। নিয়মিত সাইকেলিংয়ের ফলে ডিপ্রেশন, স্ট্রেস ও অ্যাংজাইটি কমায় এতে মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কর্মক্ষেত্রে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া-আসা করেন তাদের মোটা হওয়ার সম্ভাবনা ৩৯ শতাংশ। বিবিসি জানায়, ৫ বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব গ্লাসগো’র বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, যেসব মানুষ নিয়মিত কর্মক্ষেত্রে সাইকেল চালিয়ে যান তাদের ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকি অর্ধেক কমে যায়। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের ওপর গবেষণা করে গবেষকরা দেখেন, যারা নিয়মিত সাইকেল চালান তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ কমে যায়, আর হৃদরোগের ঝুঁকি কমে ৪৬ শতাংশ। তাছাড়া, এ অভ্যাসের কারণে মানুষের যেকোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে অসময়ে মৃত্যুর ঝুঁকিও কমে ৪১ শতাংশ।
অপরদিকে যারা গাড়িতে যাওয়া-আসা করেন তাদের মোটা হওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে নিয়মিত সাইকেল চালানো পেশিশক্তি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখে এবং ঊরু, কাফ ও নিতম্ব সুগঠিত হয়। এছাড়াও সাইকেল চালালে শরীর প্রচুর ঘামে। এই ঘামের সঙ্গে শরীরের বর্জ্য বের হয়ে ত্বক পরিষ্কার হয়, শরীর ও মন ফুরফুরে থাকে। নিয়মিত সাইকেল চালালে শরীরের বাড়তি ওজন কমে আসে। শরীর সুঠাম থাকে।
সাইক্লিংয়ের সুফল এবং তরুণদের আগ্রহ সম্পর্কে কথা হয় সাউথ ঢাকা সাইক্লিস্ট গ্রুপের এডমিন সিফাত মাহমুদুল হাসানের সাথে। তার মতে, ঢাকা শহরের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা ঘরে বন্দি হয়ে থাকে। তাদের চেনা-জানার গণ্ডিটাই অনেকটা কম্পিউটার আর ছোট্ট ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাদের এই গণ্ডি থেকে বের করে একটি সুস্থ প্র্যাকটিস দিতে পারে সাইক্লিং, তারা সুস্থ জীবন গঠন করে ছোটখাটো সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডেও অংশগ্রহণ করে দেশের উন্নয়নেও নিজেদের অবদান রাখতে পারে।
সাইক্লিং নিয়ে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী সাইক্লিস্ট আমিনুল ইসলাম বলেন, সাইক্লিংয়ের ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, পেশীশক্তি উন্নতসহ মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। এছাড়া পরিবেশ দূষণ মুক্ত রাখার একমাত্র ব্যক্তিগত বাহন সাইকেল। ২০১১ সাল থেকে বিডি সাইক্লিস্টসের হাত ধরে বাংলাদেশে সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়ে চলছে। তরুণদের মধ্যে সহজ ও সাশ্রয়ী যাতায়াতে উন্নত বিশ্বের মতো ফ্যাশনে রূপ নিচ্ছে সাইক্লিং।
যানজটের এ শহরে সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তা যে কতটা বেড়েছে তা বোঝা যায় সম্প্রতি অ্যাপ ভিত্তিক সাইকেল সার্ভিস জো-বাইক চালু হওয়ায় পর থেকে তরুণরা তাতে যে ব্যাপক সাড়াও দিয়েছে তা দেখে।