স্বর্ণের ভরি কি ৩ লাখ ছাড়াবে— দাম বাড়ার নেপথ্যে কী

২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:১৯ PM
স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি

স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি © সংগৃহীত

দেশে স্বর্ণের বাজারে একের পর এক রেকর্ড দাম সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগিয়েছে স্বর্ণের ভরি কি খুব শিগগিরই ৩ লাখ টাকা ছাড়াবে? আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়ানোর পর দেশের বাজারেও তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) ঘোষিত দরে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারিত হয় ডলার প্রতি আউন্স হিসাবে। ২৮ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রায় ৫ হাজার ২৫৮ মার্কিন ডলারে পৌছেছে। এক আউন্সে থাকে ৩১.১০৩৫ গ্রাম স্বর্ণ। সেই হিসেবে ৫,২৫৮ ডলার প্রতি আউন্স হলে প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দাম পড়ে প্রায় ১৬৯.০৫ ডলার। বাংলাদেশের স্থানীয় বাজার অনুযায়ী ১১.৬৬৪ গ্রামে এক ভরি হিসাব করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক এই দর অনুযায়ী প্রতি ভরি স্বর্ণের কাঁচামালের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১,৯৭১.৮০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে হিসাব করলে, বাংলাদেশে প্রতি ভরি স্বর্ণের শুধু কাঁচামালের দামই পড়বে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৫৬০ টাকা। 

তবে আন্তর্জাতিক দরের এই মৌলিক মূল্যের সঙ্গে দেশীয় বাজারে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় যুক্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে— স্থানীয় বাজারে তেজাবি (রিফাইন্ড) স্বর্ণের দাম, স্বর্ণ আমদানির খরচ ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি কর, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মজুত ব্যয়। সব ব্যয় যোগ করে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে মূল্য সমন্বয় করে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ টাকা নির্ধারণ করেছে।

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।— ড. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং, বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের বাজারে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকার আশপাশে। সেখান থেকে দেড় বছরের ব্যবধানে দাম বেড়ে এখন ২ লাখ ৬২ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে—অর্থাৎ এই সময়ে ভরিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

এই বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে আন্তর্জাতিক বাজারের লাগাতার ঊর্ধ্বগতির কারণে। একই সময়ে দেশে ডলারের উচ্চ বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও দাম বাড়ার পথ সুগম করেছে।

অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তিনটি প্রধান কারণে স্বর্ণের বাজার এখন নিয়ন্ত্রণহীন: ১. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বড় রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক টানাপোড়েন বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২. সুদের হার ও ডলারের দুর্বলতা: যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমার সম্ভাবনা এবং ডলার দুর্বল হওয়ায় অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ সস্তা ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুত: চীনসহ বিশ্বের বড় বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো টানা কয়েক মাস ধরে বড় পরিমাণে স্বর্ণ কিনে যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়ার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে—ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সুদের হার নিয়ে সংশয় ও নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা সেগুলোর দ্রুত অবসান হচ্ছে না। ফলে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দামে বড় ধরনের সংশোধনের সম্ভাবনা আপাতত কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডলার বাজারে চাপ অব্যাহত থাকায় আমদানি-নির্ভর পণ্যের মতো স্বর্ণের দামও ঊর্ধ্বমুখী থাকছে। এর প্রভাব পড়ছে বিয়ের মৌসুম ও খুচরা বাজারে।

এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয়ও বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে চীন টানা ১৪ মাস ধরে স্বর্ণ কিনে যাচ্ছে। একইসঙ্গে স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ– ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) রেকর্ড বিনিয়োগ প্রবাহ স্বর্ণের দামকে আরও ওপরে ঠেলে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামের উল্লম্ফনের প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের বাজারে। বাজুস আন্তর্জাতিক বাজারে তেজাবি বা পিওর গোল্ডের দাম এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় এনে স্থানীয় বাজারে দাম সমন্বয় করে।

আরও পড়ুন: দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের দামের নতুন রেকর্ড, এবার ভরি কত?

বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের নতুন নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানের অর্থাৎ ২২ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম হলমার্ককৃত স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম এখন ২ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৪ টাকা। ২১ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম হলমার্ককৃত স্বর্ণের প্রতি প্রতি ভরির দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৮৩ টাকা। অন্যদিকে ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি এখন ২ লাখ ২০ হাজার ৭৪৩ টাকায় বিক্রি হবে। এছাড়াও সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ভরিপ্রতি ১ লাখ ৮১ হাজার ৭১১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্বর্ণের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রুপার দামও। বাজারে এখন ২২ ক্যারেট রুপা ভরিপ্রতি ৭,৭৫৭ টাকায় পাওয়া যাবে। ২১ ক্যারেট রুপার ভরিপ্রতি ৭,৪০৭ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের ভরিপ্রতি ৬,৩৫৭ টাকা ধার্য করা হয়েছে। সনাতন পদ্ধতির রুপার ক্ষেত্রে প্রতি ভরির দাম পড়বে ৪,৭৮২ টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম যদি ৫ হাজার ডলারের ওপরে স্থিতিশীল থাকে বা আরও বাড়ে, তাহলে দেশের বাজারে নতুন করে দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে।

দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান টানাপোড়েন এবং ভেনিজুয়েলা ঘিরে সংকট আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান ড. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম প্রতি ভরি ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

তিনি বলেন, স্বর্ণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের বাজারে বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অনেকে ভাবছে স্বর্ণ জমা থাকলে লাভবান হচ্ছে দোকানদার বিষয়টি আসলে তা নয়। বর্তমানে স্বর্ণের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কমতে কমতে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। একজন দোকানদার তার দোকানের সবটুকু স্বর্ণ যদি একসাথে বিক্রি করে দিতে পারতো এই মুুহুর্তে তাহলে সেই খুব খুশি হতো। 

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলা ও ইরানের চলমান টানাপোড়েন আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যা দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।’

বিশেষজ্ঞদের অভিমত—বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনা, ডলারের দুর্বলতা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের ভরি ৩ লাখ টাকা ছোঁয়ার আলোচনা আরও জোরালো হবে।

তবে তারা এটাও বলছেন, যদি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে, ডলার শক্তিশালী হয় বা সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকে তাহলে স্বর্ণের দামে সাময়িক সংশোধন বা স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

গণভোট বিষয়ে প্রচারণায় কিশোরগঞ্জে ‘ভোটের গাড়ি’
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
এক কেন্দ্রের প্রার্থীদের নতুন করে প্রবেশপত্র ডাউনলোডের নির্…
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
নির্বাচন ঘিরে তিন জেলায় বিজিবি মোতায়েন
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
ফরিদপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় স্কুলছাত্র নিহত
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
রুয়েটে নারী নিপীড়নের অভিযোগ: বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাস বর্জন
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
৬ষ্ঠ শ্রেণির মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে অনলাইন রেজিস্ট্…
  • ২৮ জানুয়ারি ২০২৬
diuimage