পান বিক্রি করছে প্রমিলা © সংগৃহীত
অভাব যখন নিত্য দিনের সঙ্গী তবুও জীবন সংগ্রামে থেমে থাকেনি সোনাগাজীর অদম্য প্রমিলার। দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পান বিক্রি করে সে হয়েছে স্বাবলম্বী। তার এ স্বাবলম্বী হওয়ার অন্তরালে রয়েছে প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করার অনুকরণীয় গল্প।
মাগরিবের নামাজের আজান পড়েছে। হেটে যাচ্ছিলাম ফেনীর সোনাগাজী পৌরসভার মেইন রোড হয়ে পশ্চিম বাজারে। বাজারের মাঝখানে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের অপর পাশে ব্যবসায়ী মোশারফের তানিয়া ফ্যাশনের সামনে এসে একটি আওয়াজে পথচলা থেমে গেলো। ‘দিদি নামাজে যাচ্ছি দোকানের দিকে খেয়াল রাইখেন’ -কথাটা বলছিলো কয়েকজন দোকান মালিক। রাস্তার পাশে তানিয়া ফ্যাশনের সামনে পানের ঝুপড়ি নিয়ে বসা মাথায় সিঁদুর, হাতে শাখা পরা শ্যাম বর্ণের হালকা পাতলা গঠনের মহিলাটি উত্তর দেয়, ‘দাদা আপনারা নামাজে যান, কোন সমস্যা হবেনা।’
নামাজ শেষে মহিলাটির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো দাদা পান লাগবে? উত্তরে বলেছি না এমনিতে দাঁড়িয়েছি পান লাগবেনা। মহিলাটির পাশে গিয়ে বসে ক্ষীনস্বরে প্রশ্ন করলাম মহিলা হয়ে কেন ফুটপাতে পান বিক্রি করেন? তার সাথে আলাপচারিতায় জানা গেলো অদম্য সাহসী নারীর জীবন সংগ্রামের গল্প। বেঁচে থাকার জন্য সে কিনা জীবন সংগ্রামের অংশ হিসেবে পান বিক্রি করছে।
পান বিক্রেতা মহিলাটির নাম প্রমিলা রানী দাস (৩০)। সে ফেনীর সোনাগাজীর চরছান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব চরছান্দিয়া গ্রামের রাদেশ্যাম মাস্টার বাড়ির অলঙ্গ কুমার দাসের মেয়ে। সোনাগাজীর উপকূলীয় দরিদ্র এলাকা জেলে পাড়ায় তার জন্ম। দারিদ্রতাই জন্মের পর প্রমিলার নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠে।
শৈশব ও কৈশর পার করে একসময় প্রমিলা যৌবনে পা দেয়। দরিদ্র পিতাকে সহযোগিতা করার জন্য সে মাঠে ঘাটে কাজ করেছে, এমনকি হালচাষ পর্যন্ত করেছে। ২০০৭ সালে হবিগঞ্জের যুবকের সাথে বিয়ে হয় প্রমিলার। বিয়ের পর স্বামীর সংসার নিয়ে সুখে থাকার কথা থাকলেও সুখ নামক সোনার পাখিটা তার জীবনে আসেনি। ২০১০ প্রমিলার একমাত্র ছেলে ফয়েল চন্দ্র সরকার যখন ছয় মাসের গর্ভে তখন তার স্বামী তাকে রেখে পালিয়ে যায়।
স্বামী পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে জীবন সংগ্রামে নামতে হলো প্রমিলাকে। সন্তান জন্মের পর অভাবের তাড়নায় পাঁচ বছর প্রমিলা হালচাষ, বদলা দেওয়া, মাছ ধরাসহ সবই করেছে। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে সে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাড়া প্রতিবেশীর সহযোগিতায় তিন মাস চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে নতুন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে।
প্রমিলা বলেন, সুস্থ হয়ে মুসলমান এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১৫০ টাকা ধার নিয়ে সোনাগাজী বাজারে যায়। এই ১৫০ টাকা দিয়ে পান কিনে তাকিয়া রোডের মাথায় ফুটপাতে বিক্রির জন্য বসে পড়ি। প্রথম দিনেই ১৫০ টাকার পান ২৭০ টাকায় বিক্রি করে। সেই থেকে শুরু প্রমিলার পান ব্যবসা। এরপর দরবেশ ইউপির দাশের হাট এলাকা থেকে অল্প অল্প পান কিনে এনে বিক্রি অব্যহত রাখে।
প্রমিলা আক্ষেপের করে বলেন, ফুটপাতে পান বিক্রি করতে গিয়ে কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি।বাজারের পুরাতন পান বিক্রেতারা তাকে কয়েকবার নিয়ে বেঁধে রাখে ও মারধর করে। কোন দোকানের সামনে পান নিয়ে বসতে গেলে তাকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। উপায়হীন হয়ে পৌর মেয়রের কাছ থেকে পান বিক্রির অনুমতি গ্রহণ করতে হয়। অনুমতি পেলে কি হবে পান নিয়ে বসবে কোথায়? এমন পরিস্থিতিতে এগিয়ে এলো তানিয়া ফ্যাশনের মালিক ব্যবসায়ী মোশারফ।
গত দুই বছর ধরে প্রমিলা তানিয়া ফ্যাশনের সামনে ফুটপাতে পান বিক্রি করছে। প্রতিদিন সকাল ৯ টার সময় এসে রাত ৯টায় বাড়িতে ফিরে যায়। সারাদিন আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকার পান বিক্রি হয়। তিনি দুপুর খাওয়ার জন্য বাড়ী থেকে ভাত নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক প্রয়োজনে ফাজিল মাদ্রাসার বাথ রুম ব্যাবহার করলেও কখনো তাকে সমস্যায় পড়তে হয়নি।
প্রমিলা এখন ভালো আছে। পান বিক্রি করে সে স্বাবলম্বী। একমাত্র শিশু পুত্র ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তার জীবন। স্বামীর প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভগবান তার বিচার করবে। প্রতিবেশী মুসলমান যুবক যে প্রমিলাকে পান বিক্রির ঝুপড়ি কিনে দিয়েছে তারপ্রতি এবং তানিয়া ফ্যাশনের মোশারফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রমিলার নিজের কোন ভিটে নেই। বাড়ির এক আত্মীয়র মালিকের ভূমিতে ছোট একচালা টিনের ঘর তুলে বাস করছে। পান ব্যবসা করে সে কিছু টাকা সঞ্চয় করেছে।তার স্বপ্ন একখণ্ড ভূমি ক্রয় করে সেখানে বাকি জীবন সন্তানকে নিয়ে বসবাস করবে। বাজারে দোকানের জন্য একটা ভিটে নিবে, ব্যবসা প্রসারিত করবে। ছেলেকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। তার ছেলে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। ছেলেকে লেখাপড়া করিয়ে অনেক বড় ডাক্তার বানাবে যেন অসহায় মানুষের সেবা করতে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, হিন্দু হয়েও প্রমিলা সবার বিশ্বাস অর্জন করেছে। সে থাকার কারণে দোকান বন্ধ না করে সবাই নামাজ আদায় করতে যায়। নামাজের সময়ে সে দোকান পাহারা দেয়। পানের সাথে সে সুপারি, সাদা পাতাও বিক্রি করে। কোন ক্রেতা এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি। পুরো বাজারে সে একমাত্র মহিলা ব্যবসায়ী। বাজারের মূল সড়কের ফুটপাতে বসে পান বিক্রি করার কারণে সব শ্রেণির ক্রেতা তার কাছ থেকে পান ক্রয় করে। বর্ষাকালে সমস্যায় পড়লেও অন্য সময় তার তেমন সমস্যা হয়না।