পার্লামেন্টে সিরিয়ার নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন © সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা করল সিরিয়া। দেশটিতে নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টের প্রথম উদ্বোধনী অধিবেশন শুরু হয়েছে। এই ঐতিহাসিক অধিবেশনে সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে।
আজ রবিবার (১২ জুলাই) রাজধানী দামেস্কে নতুন পার্লামেন্ট সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবিধানিক শপথ গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক বাশার আল-আসাদ বিদ্রোহীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১৮ মাসেরও বেশি সময় পর এই প্রথম সিরিয়ায় কোনো পার্লামেন্ট অধিবেশন বসল। বাশার আল-আসাদকে হটিয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া ৪৩ বছর বয়সী আহমেদ আল-শারা এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট আল-শারা বলেন, ‘আমি আপনাদের এই সংসদকে দায়িত্বশীলতা এবং যোগ্যতার একটি রোল মডেল হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সাথে দেশে সংলাপের সংস্কৃতি, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখার অনুরোধ করছি।’
সিরিয়ার এই নতুন পার্লামেন্ট ‘পিপলস অ্যাসেম্বলি’ নামে পরিচিত। ২১০ আসনবিশিষ্ট এই সংসদের প্রধান কাজ হবে দেশের জন্য একটি নতুন ও আধুনিক সংবিধানের খসড়া তৈরি করা। একই সাথে আসাদ পরিবারের কয়েক দশকের দমনমূলক শাসন এবং পরবর্তীতে ৫ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ১৪ বছরের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়ায় একটি টেকসই ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করা।
প্রেসিডেন্ট আল-শারা সিরিয়ার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করার অঙ্গীকার করেছেন। কারণ, বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ এবং দীর্ঘ বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সিরিয়ার অর্থনীতি বর্তমানে চরম বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। আসাদ সরকারের পতনের পর দেশটিতে শুরু হওয়া রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই অবস্থায় অর্থনীতি সচল করা, সরকারি পরিষেবাগুলো জোরদার করা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা নতুন সংসদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আল-শারা তাঁর বক্তৃতায় আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘সিরিয়া আজ বীরত্বের এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস লিখছে। আমাদের সামনে এখন রাষ্ট্র এবং একই সাথে দেশের প্রতিটি নাগরিককে নতুন করে গড়ে তোলার এক বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছে।’
সিরিয়ার এই অন্তর্বর্তীকালীন ২১০ আসনের পার্লামেন্টের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য গত বছর আঞ্চলিক নির্বাচনী কলেজের মাধ্যমে মনোনীত হয়েছেন। আর বাকি ৭০ জন সদস্যকে চলতি মাসের শুরুতে সরাসরি নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আল-শারা। সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জনসংখ্যা ও ভোটার তালিকার সঠিক রেকর্ড না থাকা এবং আইনগত ও লজিস্টিক জটিলতার কারণে এই মুহূর্তে দেশজুড়ে সাধারণ নির্বাচন করা সম্ভব ছিল না।
সিরিয়ার জন্য জাতিসংঘের ডেপুটি স্পেশাল এনভয় ক্লাউডিও কর্ডোন পার্লামেন্টের এই প্রথম অধিবেশনকে ‘সিরিয়ার রাজনৈতিক উত্তরণের পথে একটি অন্যতম প্রধান মাইলফলক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই অন্তর্বর্তীকালীন সংসদের কার্যক্রমের ওপর গভীর নজর রাখবে এবং সিরিয়াকে পুনর্গঠনে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।