যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা © টিডিসি এআই সম্পাদিত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও সংঘাত বন্ধে অবশেষে সমঝোতার পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণে ১৪ দফার একটি খসড়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। খসড়ায় যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, জব্দ সম্পদ মুক্ত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির বিষয়ে তেহরানের অঙ্গীকারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফা পড়ে শোনান। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান কেউই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র প্রকাশ করেনি। একই সঙ্গে ইরানের কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থাপিত পাঠ্যের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। জনসমক্ষে চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করায় যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্র এই খসড়ার তথ্য প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
খসড়া অনুযায়ী, প্রাথমিক এই সমঝোতার পর উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের আলোচনায় বসবে। পারস্পরিক সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানোও যাবে। আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করা এবং যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর হলে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হবে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে এবং হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
মার্কিন কর্মকর্তা আরও জানান, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরানের জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের জন্য নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত ছাড় প্রদান করবে যুক্তরাষ্ট্র। তার দাবি, সমঝোতার প্রাথমিক নথিতে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর করেছে। তবে শুক্রবার নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগে উভয় পক্ষই চাইলে চুক্তি থেকে সরে আসতে পারবে।
প্রকাশিত ১৪ দফার প্রথমটিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের মাধ্যমে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেবে। একইসঙ্গে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না এবং শক্তি প্রয়োগ কিংবা শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে। লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথাও এতে উল্লেখ রয়েছে।
দ্বিতীয় দফায় উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে।
তৃতীয় দফা অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালানো হবে। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এ সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
আরও পড়ুন: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি নিয়ে কী বলছেন নেতানিয়াহু
চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণভাবে তুলে নেবে। একইসঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম দফা অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনামূল্যে চলাচলের ব্যবস্থা করবে। প্রযুক্তিগত ও সামরিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মাইন অপসারণের পর ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার করা হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও সামুদ্রিক সেবা নিয়ে ওমান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান।
ষষ্ঠ দফায় যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর বাস্তবায়ন কাঠামো ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে।
সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গভর্নর বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাসহ সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।
অষ্টম দফায় ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। একইসঙ্গে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিদ্যমান মজুত কীভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, তা পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় আইএইএর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়াম নিম্নমাত্রায় রূপান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হবে। পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম এবং অন্যান্য পারমাণবিক প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা হবে।
নবম দফায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থা বজায় থাকবে। এ সময়ে ইরান তার বিদ্যমান পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরে যাবে না এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করবে না।
দশম দফা অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র প্রদান করবে। এতে ব্যাংকিং, বীমা, পরিবহনসহ সব ধরনের আর্থিক লেনদেন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
একাদশ দফায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত অর্থ ও সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে উন্মুক্ত করবে। এসব অর্থ কীভাবে ছাড় করা হবে, তা দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যাদের চূড়ান্ত সুবিধাভোগী হিসেবে নির্ধারণ করবে, তাদের অর্থ ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
দ্বাদশ দফা অনুযায়ী, সমঝোতা স্মারক এবং ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির জন্য একটি নির্বাহী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
ত্রয়োদশ দফায় বলা হয়েছে, প্রথম, চতুর্থ, পঞ্চম, দশম ও একাদশ দফার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর এবং তা অব্যাহত থাকলে বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আলোচনা শুরু হবে।
চতুর্দশ ও শেষ দফায় উল্লেখ করা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতি, পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা। তথসূত্র: আল জাজিরা