প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ ও সংঘাত চলছে। বিশ্ব শান্তি সূচকের ( জিপিআই) সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত বছরের তুলনায় পৃথিবী এখন আরও বেশি অশান্ত হয়ে উঠেছে। এই সূচকে চলতি বছর ৯৯টি দেশেই সার্বিক শান্তি পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, যা বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতা হ্রাসের টানা ১২তম বছর। তবে এই চরম অবনতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেও গুটিকয়েক দেশ নিজেদের শীর্ষ অবস্থান এবং শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। যেখানে আছে বাংলাদেশের নামও। গেল বছরের তুলনায় তিন ধাপ এগিয়ে ১১৭ দেশ হিসেবে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করেছে বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা দেশটি।
২০০৭ সালে শান্তি সূচক চালু করা ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী চেয়ারম্যান স্টিভ কিলেলিয়া বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী শান্তির এই বিপর্যয়কর পতন ঘটলেও, তা শীর্ষ দেশগুলোর অবস্থানে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি।’ মুলত সামরিক ব্যয়, চলমান সংঘাত, হত্যাকাণ্ডের হার, সুরক্ষার অনুভূতি ও নিরাপত্তার ধারণাসহ মোট ২৩টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের ওপর এই গবেষণা ও র্যাংকিং করা হয়েছে।
চলতি বছরের বিশ্ব শান্তি সূচকে শীর্ষ ১০টি শান্তিপ্রিয় দেশের তালিকায় আছে যথাক্রমে— আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড এবং জাপান। যেসব দেশ এই সূচকে সবচেয়ে ভালো করেছে, মূলত তাদের দেশে সহিংসতার হার অত্যন্ত কম, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা বেশ শক্তিশালী, সামাজিক পারস্পরিক বিশ্বাস উচ্চ এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্কের পাশাপাশি উন্নত জীবনযাত্রার মান রয়েছে।
বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। চীন,ভারত,পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে পেছনে ফেলে ২.২২৬ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার ১১৭তম অবস্থানে উঠে এসেছে ঢাকার নাম। গেল বছরের চেয়ে তিনধাপ অগ্রগতির মুখ দেখেছে দেশটি।
২০০৮ সাল থেকে টানা সূচকের শীর্ষে থাকা আইসল্যান্ড এবারও ১৯তম বছরের মতো বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৬ সালে দেশটির শান্তি পরিস্থিতি আরও ২ শতাংশ উন্নত হয়েছে। আইসল্যান্ডের নিবিড় সামাজিক বন্ধন, লিঙ্গ সমতাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে সমঅধিকার, শক্তিশালী জনসেবা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারকে এর প্রধান নিয়ামক হিসেবে দেখা হয়। এ ছাড়া ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে দেশটি বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা থেকেও বেশ দূরে থাকে।
গত বছরের তুলনায় এক ধাপ এগিয়ে ২০২৬ সালের সূচকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে নিউজিল্যান্ড। এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে এটিই সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে কম সামরিকায়িত দেশ। মূলত অস্ত্র আমদানি হ্রাস পাওয়ায় দেশটির এই উন্নতি হয়েছে। ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্ত থেকে দূরে থাকায় নিউজিল্যান্ড বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত রয়েছে।
গত বছরের পঞ্চম স্থান থেকে দুই ধাপ এগিয়ে সুইজারল্যান্ড এবার তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। কম অপরাধের হার এবং দীর্ঘদিনের ‘সামরিক নিরপেক্ষতা’ নীতি দেশটিকে অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। সুইজারল্যান্ডে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। মানুষ যেকোনো সমস্যা বা মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে একটি ব্যবহারিক সমাধান বা আপসে পৌঁছাতে পছন্দ করে। সমাজে এইShared Commitment বা একসঙ্গে মিলেমিশে থাকার মানসিকতা সুইজারল্যান্ডের শান্তির মূল চাবিকাঠি।
প্রথমবারের মতো বিশ্ব শান্তি সূচকের শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় জায়গা করে নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে এসেছে স্লোভেনিয়া। কম সামরিক ব্যয় এবং উচ্চমাত্রার নাগরিক নিরাপত্তা দেশটিকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। স্লোভেনিয়ার মানুষ কমিউনিটি বা সমাজকে খুব গুরুত্ব দেয় এবং তারা প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাতে ভালোবাসে। চমৎকার কর্ম-জীবন ভারসাম্য থাকার কারণে এখানে মানুষের মধ্যে একটি মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতি কাজ করে, যা মানুষকে যেকোনো ভীতিহীন জীবনযাপনের সুযোগ দেয়।
বৈশ্বিক এই সূচকে পঞ্চম স্থানে রয়েছে আয়ারল্যান্ড। কম সহিংসতা এবং আন্তর্জাতিক কোনো সংঘাতে যুক্ত না হওয়ার কারণে দেশটি এই অবস্থানে রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে একটি অশান্ত অতীত পার করে আসা আয়ারল্যান্ড এই শান্তিকে মোটেও হালকাভাবে নেয় না। অতিথিপরায়ণতা আয়ারল্যান্ডের ডিএনএ-তে মিশে আছে। প্রাচীন ‘ব্রেহন আইন’ থেকেই এখানে অপরিচিত ও মুসাফিরদের আশ্রয় দেওয়াকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিদেশি যুদ্ধ বা কোনো সামরিক জোটে অংশ না নেওয়ার ‘নিরপেক্ষ নীতি’ দেশটির এই আন্তর্জাতিক শান্তির আমেজ বজায় রেখেছে।