ইরানের নতুন ড্রোন © সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ড্রোন হামলা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী বা ‘ফিদায়েঁ’ ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবসহ পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের ভেতরের সিআইএ কার্যালয়কে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। একই সঙ্গে এসব ড্রোনে রাশিয়ার ‘কোমেটা-এম’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা ইরানি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। হামলা প্রতিহত করতে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলেও ইরানের ড্রোনগুলো ক্রমেই আরও নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। এর ফলে আরব অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলোর ভেতরে থাকা সিআইএর কার্যালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।
সিআইএ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময় থেকে শুরু করে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে সংস্থাটির ভূমিকা ছিল। সেই সিআইএর বিভিন্ন কার্যালয়ে ধারাবাহিকভাবে নির্ভুল ড্রোন হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটনে প্রশ্ন উঠেছে, এর পেছনে রাশিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তা রয়েছে কি না।
পশ্চিমা কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, মার্কিন গোয়েন্দাদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, আইআরজিসি সিআইএর কার্যালয়গুলোতে হামলার জন্য ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করছে। এসব ড্রোনে রাশিয়ার কোমেটা-এম প্রযুক্তি সংযুক্ত থাকতে পারে। এই প্রযুক্তির কারণে ড্রোনগুলো ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এড়িয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ মার্চ প্রথমবার সৌদি আরবে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে কয়েকটি শাহেদ ড্রোন আঘাত হানে। পরে জানা যায়, দূতাবাসের যে অংশে সিআইএর কার্যালয় রয়েছে, ঠিক সেই স্থানেই বিস্ফোরণ ঘটে। তবে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘটনাটিকে পুরো দূতাবাসকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাদের দাবি ছিল, আইআরজিসির লক্ষ্য ছিল পুরো স্থাপনাটি ধ্বংস করা।
শুরুতে বিষয়টিকে কাকতালীয় মনে করলেও পরবর্তী হামলাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন বদলে দেয়। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানি ড্রোনের লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। এর ফলে আত্মঘাতী শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করা মার্কিন বাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, তুলনামূলক কম খরচের এই ড্রোন ব্যবহার করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বহু কোটি ডলার মূল্যের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কার্যত অকার্যকর করে দিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জুলাইয়ে সংঘাত আরও তীব্র হলে সৌদি আরবের পাশাপাশি কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এবং সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়। পশ্চিমা গণমাধ্যমের দাবি, এসব হামলার ক্ষেত্রেও সিআইএর কার্যালয়গুলোকে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এরপর থেকেই মার্কিন গোয়েন্দাদের সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে যে, ইরানের ড্রোনগুলোর এই সাফল্যের পেছনে রাশিয়ার কোমেটা-এম প্রযুক্তি ভূমিকা রাখছে।
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়েছে, এ বিষয়ে তদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদন ইতোমধ্যে পেন্টাগনে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ব্যয় ও ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, কোমেটা-এম প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় দুটি বৈশিষ্ট্য হলো—এটি ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারে এবং একই সঙ্গে স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবহার করে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত করতে সক্ষম।
সাধারণভাবে কোনো ড্রোন পরিচালনার জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়। শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত হলে সেনাবাহিনী ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। এতে ড্রোন মাঝপথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, দিক পরিবর্তন করে অথবা ভূপাতিত হয়।
কিন্তু সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, কোমেটা-এম প্রযুক্তিতে আট থেকে ৩২টি পর্যন্ত অ্যান্টেনা থাকতে পারে, যা শত্রুপক্ষের পাঠানো জ্যামিং সিগন্যাল শনাক্ত করে তা অকার্যকর করে দেয়। ফলে ড্রোন সহজেই স্যাটেলাইটের সহায়তায় নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যায়। এই কারণেই প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে এসব ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে না বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটেও এই প্রযুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুদ্ধের শুরুতে তুরস্কের তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। এরপর রাশিয়াকে সহায়তা করতে বিপুলসংখ্যক শাহেদ আত্মঘাতী ড্রোন সরবরাহে সম্মত হয় ইরান।
পশ্চিমা কয়েকটি গণমাধ্যমের দাবি, সেই সহযোগিতার বিনিময়ে রাশিয়া কোমেটা-এম প্রযুক্তি ইরানের কাছে হস্তান্তর করে, যা শাহেদ ড্রোনকে আরও কার্যকর করে তোলে। যদিও এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া শাহেদ ড্রোনে নিজস্ব কিছু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এনে সেগুলোর নাম দেয় ‘গেরান’। এসব ড্রোনে কোমেটা-এম প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় ইরানকে একই ধরনের উন্নত ড্রোন সরবরাহ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রয়টার্স আরও জানিয়েছে, জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে কাস্পিয়ান সাগর হয়ে ইরানে রাশিয়ার সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রেখে দুই দেশের সামরিক জাহাজ চলাচলও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। গত এপ্রিলে ইরান একটি মার্কিন এফ-১৫ ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে বলে দাবি করা হয়। ওই বিমানের দুই পাইলট প্যারাসুটের মাধ্যমে অবতরণ করলে মার্কিন বিশেষ বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাদের উদ্ধার করে।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ওই দুই পাইলটকে খুঁজে বের করতে ‘ঘোস্ট মুরমুর’ নামে একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি হৃদস্পন্দন শনাক্ত করে উদ্ধারকারী বাহিনীকে পাইলটদের অবস্থান নির্ধারণে সহায়তা করে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর বিশ্বজুড়ে ‘ঘোস্ট মুরমুর’ প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে রাশিয়ার কোমেটা-এম প্রযুক্তি। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, এই প্রযুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কৌশল ও শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বজায় রাখতে সিআইএর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রমের বড় অংশই পরিচালিত হয় এই সংস্থার মাধ্যমে। তাই মার্কিন দূতাবাসের ভেতরে থাকা সিআইএর কার্যালয়গুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সক্ষমতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশিত তথ্যের বড় অংশই পশ্চিমা গণমাধ্যম, সামরিক বিশ্লেষক এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়েছে। রাশিয়ার কোমেটা-এম প্রযুক্তি ইরানের শাহেদ ড্রোনে ব্যবহার হচ্ছে কি না কিংবা সিআইএর কার্যালয়গুলোই হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল কি না—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।