তুরস্কের নৌবহর © টিডিসি ফটো
ইসরায়েলের সাথে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে নিজেদের প্রথম জাতীয় বিমানবাহী রণতরি 'মুগেম' নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে তুরস্ক। দেশটির নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এরকুমেন্ট তাতলিওলু জানিয়েছেন, এই বিশাল রণতরিটির নির্মাণ কাজ আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হতে পারে।
জাহাজটির মূল কাঠামো এর আগে ঘোষিত নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর আগেই শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
তুরস্কে নির্মিত যুদ্ধজাহাজগুলোর মধ্যে এটিই হবে সবচেয়ে বড়। ৬০ হাজার টন ওজনের এই জাহাজটি লম্বায় ২৮৫ মিটার হবে। ভূমধ্যসাগরের সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্ল্যাগশিপ ফ্রান্সের বিমানবাহী রণতরি 'শার্ল দ্য গল'-কেও ছাড়িয়ে যাবে এটি। শার্ল দ্য গলের লম্বায় ২৬১ মিটার, ওজন ৪২ হাজার ৫০০ টন। তুরস্কের রণতরি একবারে ৬০ টি বিমান বহন করতে পারবে।
২০২৫ সালের আগস্টে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান নিজে উপস্থিত থেকে রণতরি নির্মাণ কাজ শুরুর উদ্ধোধন করেছিলেন। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিমানবাহি এই রণতরি শক্তিশালী দেশগুলোর বিরুদ্ধে তুরস্কের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
সম্প্রতি তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে রয়েছে। ইসরায়েলি সরকারি ও বিরোধী দলীয় নেতারা তাদের বক্তব্যে ক্রমবর্ধমান হারে তুরস্ককে ইরানের সাথে তুলনা করছেন। ইসরায়েলের জনপ্রিয় বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেট গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে এক সম্মেলনে তুরস্ককে ‘পরবর্তী ইরান’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে কোণঠাসা তুরস্ক
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দুই দফা যুদ্ধের পর আঙ্কারা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্ল্যাটফর্ম এবং পঞ্চম প্রজন্মের 'কান' যুদ্ধবিমানের উৎপাদনের গতি বাড়িয়েছে। তুর্কি নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞ মেসুনে ইয়াসার বলেন, গ্রিস ও সাইপ্রাসের সাথে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান জোট তুরস্ককে তার নৌ-সক্ষমতার দিকে নজর দিতে বাধ্য করছে।
সাধারণত বিমানবাহী রণতরিগুলো উন্মুক্ত সমুদ্রের জন্য তৈরি করা হলেও, ইয়াসার মনে করেন তুরস্ক হয়তো 'মুগেম'-কে এই অঞ্চলের শত্রু দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছে।
তিনি বলেন, 'গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইসরায়েলের উষ্ণ সম্পর্ক এবং তাদের অবস্থান বেশ আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। তুরস্ক পূর্ব ভূমধ্যসাগরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এই বিমানবাহী রণতরি তুরস্কের জন্য সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।'
তুরস্কের অনেক আগে থেকেই বিমানবাহী রণতরি তৈরির পরিকল্পনা করে আসছে। শুরুটা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে।
তুরস্কের নৌবাহিনীর সাবেক অ্যাডমিরাল ইয়াঙ্কি বাসিওলু বলেন, ১৯৯৩ সালেই উন্মুক্ত সমুদ্রে মোতায়েনের জন্য হালকা বিমানবাহী রণতরি এবং উভচর আক্রমণাত্মক জাহাজের তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের একটি গবেষণার পর প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ পেতে শুরু করে।
আঙ্কারার ড্রোনবাহী রণতরি 'টিসিজি আনাদোলু' সঙ্গে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ যুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এই প্রোগ্রাম থেকে বের করে দেয়। ফলে বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হয় তারা। বর্তমানে তুর্কি সামরিক বাহিনী এই জাহাজে স্টিলথ ক্ষমতা সম্পন্ন 'কিজিলএলমা' (Kizilelma) ড্রোন, 'হুরজেট' (Hurjet) হালকা যুদ্ধবিমান এবং পঞ্চম প্রজন্মের 'কান' (Kaan) যুদ্ধবিমানের একটি নৌ-সংস্করণ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এছাড়া এআই-চালিত স্বল্প উড্ডয়ন ক্ষমতা সম্পন্ন 'বায়রাক্তার টিবি৩' ড্রোনও এখানে মোতায়েন করা হবে।
দরকষাকষির ক্ষমতা
তুরস্কের সাবেক রাষ্ট্রদূত আল্পের কোসকুন বলেন, এই বিমানবাহী রণতরিটি প্রমাণ করে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে ওয়াশিংটনের কার্নেগি থিঙ্কট্যাঙ্কের সিনিয়র ফেলো কোসকুন আরও যোগ করেন, এই রণতরি ন্যাটোর ভেতরে তুরস্কের অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে যাবে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র এখন মিত্রদের সামরিক অবদানে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে বলছে।
এটি তুরস্কের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর জন্য বড় খরচ রয়েছে এবং এটি অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে নতুন হুমকি হিসেবেও দেখা দিতে পারে।
২০২০ সালে গ্রিসের সাথে উত্তেজনার জেরে ফ্রান্স ও গ্রিসের মধ্যে একটি সামরিক জোট গঠিত হয়, যেখানে উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। কোসকুন মনে করেন, ইসরায়েলসহ অন্যান্য দেশ যেন একে হুমকি হিসেবে না দেখে, আঙ্কারার উচিত সেই বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য একটি বিষয় লক্ষ্য করেছেন। ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধে দেখা গেছে, বড় নৌজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরিগুলো ছোট ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলের সামনে ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছরের এপ্রিলে হুতিদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে দ্রুত মোড় নিতে গিয়ে ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যান থেকে একটি যুদ্ধবিমান লোহিত সাগরে পড়ে গিয়েছিল। এমনকি ইরানের সাথে যুদ্ধের সময় মার্কিন রণতরিগুলো ইরানি মিসাইলের নাগালের বাইরে অবস্থান করেছিল। তবে তুর্কি রণতরিটিতে বিভিন্ন আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হচ্ছে যাতে ড্রোন বা মিসাইল হামলা ঠেকানো যায়।
ইস্তাম্বুল শিপইয়ার্ডের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল রিসেপ এরদিনচ ইতকিন গত মার্চে জানান, প্রকল্পটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে এবং তারা ইতোমধ্যে ফ্লাইং র্যাম্প তৈরি করে ফেলেছেন, যা এ বছর পরীক্ষা করা হবে। জাহাজটি ২০৩০ সালের মধ্যে পুরোপুরি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গানবোট ডিপ্লোম্যাসি
আঙ্কারার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উত্তর আফ্রিকা, বিশেষ করে লিবিয়া এবং হর্ন অফ আফ্রিকা বা সুদান ও সোমালিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তুরস্ক ইতিমধ্যে সোমালিয়া উপকূলে জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান চালাচ্ছে এবং সেখানে একটি মহাকাশ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। একটি বিমানবাহী রণতরি এই স্বার্থগুলো রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল সিএইচপির বর্তমান সহ-সভাপতি বাসিওলু ব্যক্তিগতভাবে এই রণতরিকে সমর্থন করলেও মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে এই টাইমিং সঠিক নয়। তিনি বলেন উত্তর সাইপ্রাসে তুরস্কের একটি বিমানঘাঁটি রয়েছে যা ভূমধ্যসাগরের মাঝখানে ‘অনিঃশেষ বিমানবাহী রণতরি’ হিসেবে কাজ করছে।
তার মতে, বর্তমানে উন্নত যুদ্ধবিমানের অভাব মেটাতে 'কান' প্রজেক্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা তুরস্কের জন্য বেশি জরুরি।
বাসিওলু স্বীকার করেন, এই রণতরি গ্রিসকে দুশ্চিন্তায় ফেলবে এবং এটি 'গানবোট ডিপ্লোম্যাসি' বা নৌ-শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার করা যাবে। তবে এর জন্য একটি স্ট্রাইক গ্রুপ বা বিশাল নৌ-বহর প্রয়োজন, যা তুরস্কের বর্তমানে নেই। তিনি পরামর্শ দেন, তুরস্কের উচিত আগে আটটি 'ইস্তাম্বুল' ক্লাস ফ্রিগেট এবং 'টেপে' ক্লাস ডেস্ট্রয়ার নির্মাণের কাজ দ্রুত শেষ করা। সেটি করতে পারলে হয়তো বিমানবাহী রণতরির প্রয়োজনই পড়বে না।
তবে শিক্ষাবিদ মেসুনে ইয়াসার এই যুক্তির সাথে একমত নন। তিনি মনে করেন, তুরস্ক ধাপে ধাপে এই সম্পদগুলো গড়ে তোলার সক্ষমতা রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই বিমানবাহী রণতরি তুরস্কের জন্য একটি বিরাট শক্তি হিসেবে কাজ করবে।