চেরনোবিল দুর্ঘটনার ৪০ বছর, পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো কী ভাবছে?

২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫০ PM , আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫৪ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘বিশ্বখ্যাত’ চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের ৪০ বছর পূর্ণ হতে আর মাত্র একদিন বাকী। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত ইউক্রেনের চেরনোবিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৪ নম্বর রিঅ্যাক্টরে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে যেটি বিশ্ব পারমাণবিক শক্তির ইতিহাসকে পুরোপুরিভাবে পাল্টে দিয়েছিল। সেই দুর্ঘটনা থেকে বর্তমানের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো আদৌ শিক্ষা নিয়েছে? নাকি আরও একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর ঘুম ভাঙবে পারমাণবিক শক্তি অর্জনে মরিয়া দেশগুলোর?

মানবসভ্যতার ইতিহাসে আজ পর্যন্ত ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনা হিসেবে ধরা হয় চেরনোবিল দুর্ঘটনাকে। চার দশক পরও এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির ঝুঁকি নিয়ে বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল রাত ১টা ২৩ মিনিটে একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় মানুষের ভুল এবং রিঅ্যাক্টরের নকশাগত ত্রুটির কারণে ওই বিস্ফোরণ ঘটে। এর ফলে টানা ১০ দিন ধরে পারমাণবিক জ্বালানি পুড়তে থাকে এবং তেজস্ক্রিয়া ধোঁয়া ইউক্রেন, বেলারুশ ও রাশিয়া ছাড়িয়ে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। 

আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এই ঘটনার জন্য রিঅ্যাক্টর ডিজাইনের ভয়াবহ ত্রুটি এবং অপারেশনাল নিয়ম ব্যত্যয়কে দায়ী করেছে। এই বিপর্যয়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আজও মতভেদ রয়েছে; ২০০৫ সালের জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে ৪ হাজার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা বলা হলেও গ্রিনপিস ২০০৬ সালে দাবি করেছিল যে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি। এছাড়া প্রায় ৬ লাখ ‘লিকুইডেটর’ যাদেরকে দুর্ঘটনার পরে ওই পারমাণবিক কেন্দ্রে পরমাণু বর্জ্য পরিষ্কার করার জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, তারা মারাত্মক তেজস্ক্রিয়তার শিকার হন।

বর্তমানে চেরনোবিলের ১৯ মাইল ব্যাসার্ধের নিষিদ্ধ এলাকা বা ‘এক্সক্লুশন জোন’ কার্যত জনশূন্য হলেও সেখানে এক অন্যরকম দৃশ্য দেখা যায়। দুর্ঘটনার পর মানবশূন্য হয়ে পড়া একসময় ইউক্রেনের এই এলাকাটি এখন ঘন অরণ্যে পরিণত হয়েছে। রাস্তাঘাট ও দালানকোঠা গাছপালায় ঢেকে গেছে। জনমানবহীন এই এলাকায় এখন ভাল্লুক, লিঙ্কস, মুজ এবং বন্য ঘোড়াদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। 

তবে এই নিস্তব্ধতাও এখন যুদ্ধের ডামাডোলে বিপন্ন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের শুরুতে রুশ বাহিনী এই এলাকাটি দখল করে নিয়েছিল এবং রেড ফরেস্টের মতো উচ্চ তেজস্ক্রিয় এলাকায় পরিখা খনন করেছিল রুশ বাহিনী। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি রুশ ড্রোন চেরনোবিলের তেজস্কিয়তা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে নির্মিত সুরক্ষা কবচ নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট গম্বুজটিকে ছিদ্র করে দেয়। যার ফলে নতুন করে তেজস্ক্রিয় ঝুঁকি তৈরী হয়েছে এলাকাটিতে।

গ্রিনপিসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কাঠামোটি বর্তমানে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং এর মেরামত করতে অন্তত তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিচালক জানিয়েছেন, আবারও কোনো হামলা হলে এই সুরক্ষা কাঠামোটি ধসে পড়তে পারে, যা বিশ্বজুড়ে নতুন করে তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করবে। এছাড়া রুশ সেনাদের পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের কারণে এই এলাকাটি অদূর ভবিষ্যতে মানুষের জন্য আর কতটুকু নিরাপদ থাকবে, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।

চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর মার্কিন নিউক্লিয়ার রেগুলেটরি কমিশন (এনআরসি) আশ্বস্ত করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রে এমন দুর্ঘটনা ঘটা অসম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক চাপ এবং নতুন নির্বাহী আদেশের ফলে মার্কিন পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এনআরসি দাবি করে আসছিল যে, শক্তিশালী ‘কনটেইনমেন্ট’ কাঠামো এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে মার্কিন চুল্লিগুলো নিরাপদ, তবে ২০০২ সালে ওহাইওর ড্যাভিস-বেসে চুল্লিতে মেল্টডাউন হওয়ার উপক্রম হলে সংস্থাটির তদারকির দুর্বলতা সামনে চলে আসে। 

বর্তমানে পারমাণবিক শক্তি অর্জনে বিশ্ব মোড়লেদের প্রতিযোগিতার প্রভাব এবং রাজনৈতিক চাপে এই তদারকি আরও শিথিল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গেল বছরের মে মাসে স্বাক্ষরিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশগুলো গত ৫০ বছরের স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থাকে অনেকটা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ৪ জুলাইয়ের মধ্যে তিনটি নতুন চুল্লি চালু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে এক ‘বেপরোয়া’ গতি। 

এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রথম বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টেরা-পাওয়ারের ‘নেট্রিয়াম’ প্রকল্পকে। বিল গেটসের সহ-প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিকে ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের কেমোরার শহরে একটি ৩৪৫ মেগাওয়াট চুল্লি তৈরির অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ফাস্ট-নিউট্রন রিঅ্যাক্টরটির নকশায় কোনো প্রচলিত ‘কনটেইনমেন্ট’ বা সুরক্ষা কাঠামো নেই। এটি অত্যন্ত দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত শক্তি বৃদ্ধিতে সক্ষম এবং এতে শীতলকারক হিসেবে ব্যবহৃত ‘তরল সোডিয়াম’ অত্যন্ত দাহ্য। সমালোচকরা এই নতুন ধারার বিপজ্জনক চুল্লিগুলোকে ‘কাউবয় চেরনোবিল’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, যা ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপর্যয়ের সংকেত হতে পারে।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়ের চার দশক নিয়ে জাতিসংঘের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি অ্যানালিনা বেয়ারবক বলেছেন: ‘আজ চেরনোবিলের ৪০ বছর পূর্তিতে, আসুন আমরা দায়িত্বশীলতার সাথে সেই স্মৃতিকে সম্মান জানাই। পারমাণবিক প্রযুক্তি যাতে কঠোরভাবে কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার কার্যক্রমের মাধ্যমে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইনের আনুগত্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়—যাতে চেরনোবিলের মতো বিপর্যয় আর কখনো না ঘটে।’

তবে বিশ্ব মোড়লদের ক্ষমতার আস্ফালনের কাছে জাতিসংঘের এ আহ্বান বরাবরের মতো দুর্বল। যার প্রতিফলন ইরানের ওপর চলমান মার্কিন আগ্রাসন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। যেখানে বারবার তেহরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে হামলাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যেখানের ফলাফল অর্থাৎ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব নিয়ে খুব কমই মাথা ঘামাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ঢাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে যবিপ্রবিত…
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬
৬ শতাংশ জমির মালিক মানসুরার আছে সোয়া লাখ টাকার আসবাবপত্র-ইল…
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬
রিফাত-হাসিবের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে স্ক্রিনশট ফাঁ…
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ঢাবিতে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে চবিসাসের …
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬
কোটিপতি জামায়াতের এমপি প্রার্থী সাবিকুন্নাহার মুন্নী, মোট …
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬
জনগণকে ক্ষমতায়ন ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কাজ করবে সরকার: উ…
  • ২৫ এপ্রিল ২০২৬