ইরানি রাষ্ট্রদূত © সংগৃহীত
আটকেপড়া বাংলাদেশের ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইরানের নিরাপত্তা কাউন্সিল। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মাঝে জাহাজগুলো ফেরত আনার বিষয়ে ঢাকা ও তেহরান উভয়পক্ষই এখন যৌথভাবে কাজ করছে।
বুধবার (১ এপ্রিল) ঢাকায় অবস্থিত ইরানের দূতাবাসে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদী এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত জানান, আটকেপড়া এই বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে সার্বিক সাহায্য করায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটি ধন্যবাদপত্র বা চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে চলমান যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতি নিয়ে ইরানের কিছুটা দুঃখ ও অসন্তুষ্টি রয়েছে। রাষ্ট্রদূত জলিল রহীমি জাহানাবাদী এই বিষয়ে বলেন, 'যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ প্রকাশের সঙ্গে নিন্দা জানানো প্রয়োজন।' তবে যুদ্ধ নিয়ে ঢাকার এই বিবৃতির বিষয়ে অসন্তুষ্টির কারণে ইরান আনুষ্ঠানিক বা দাপ্তরিক কোনো চিঠি দেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ হলো ইরানের ভাই। দুর্দিনে এক ভাই আরেক ভাইয়ের পাশে থাকবে, এটাই আশা করি।'
চলমান এই সংঘাতের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জলিল রহীমি জাহানাবাদী বলেন, 'এটি মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ।' তিনি আরও বলেন, 'আমেরিকার আগ্রাসনের সময় একমাসের বেশি অতিবাহিত হচ্ছে। যুদ্ধটা তখনই তারা শুরু করে, যখন ওমানের মধ্যস্থতায় ভালোভাবে আলোচনা চলছিল। ইসরায়লের উসকানিতে এ যুদ্ধ আমেরিকা শুরু করেছে। পুরো মধ্যপাচ্যকে যুদ্ধে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্প ইসরায়লের প্ররোচনায় যুদ্ধে পা দিয়েছে এবং এখন পালানোর পথ খুঁজছে।'
যুদ্ধের নীতি ও সাধারণ নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইরানের রাষ্ট্রদূত বলেন, 'যুদ্ধের একটা নীতি থাকে। যুদ্ধের নামে স্কুল-কলেজে শিশুদের ওপর আক্রমণ করবে, এটা হতে পারে না। তারা যুদ্ধের নামে কীভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের ওপর হামলা করছে? এখানে কি ইরান অস্ত্র তৈরি করেছিল? এটা কি সামরিক ঘাঁটি ছিল? শিশুরা কি আমেরিকা-ইসরায়লের জন্য হুমকি ছিল? আমেরিকা-ইসরায়েল যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা বলে, তার মধ্যে কি এটা পড়ে না? মুসলমান হওয়া কি অপরাধ? আমাদের মসজিদগুলোকে তারা মনে করে উগ্রবাদের আখড়া। তারা মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস করে দিতে চায়।'
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত আমেরিকার ১৪টি ঘাঁটি তেহরান পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমরা কোনো প্রতিবেশি দেশে আক্রমণ করছি না, আমরা মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ করছি। দোষ ওইসব দেশের, যারা মার্কিন ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। প্রতিবেশি আরব দেশগুলোর ঘাঁটি থেকে বিমানে করে ইরানে বোমা বর্ষণ করা হচ্ছে, তাতে নারী-শিশু মারা যাচ্ছেন।'
রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, ইরানের উন্নত প্রযুক্তি ধ্বংস করা এবং ইউরেনিয়াম উদ্ধারের নামে আমেরিকা যে অভিযান শুরু করেছিল, তাতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং পারস্য উপসাগর ছেড়ে পালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'এখন ট্রাম্প সুযোগ খুঁজছে... তারা বিজয়ী হয়েছে। বলতে চাইলে বলুক, আসলে কি আমাদের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে পেরেছে? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একশবারের বেশি নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেছে। দুঃখের বিষয় হলো, আমেরিকায় এখন এমন প্রেসিডেন্ট, যে নিজেকেও বোঝে না, মধ্যপ্রাচ্যকেও বোঝে না। সে সবার জন্য চরম বিপদ ডেকে এনেছে। আমেরিকা-ইসরায়েল বুঝবে না, তারপরও বলি, বিশ্ব এখন আর আমেরিকার কথায় চলবে না। এখন ইরানকে হুমকি দেয়া হচ্ছে, পারমাণবিক বোমাবর্ষনের। কিন্তু ইরান এতে ভিত নয়।'
সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে জানান যে, হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বজায় রাখতে ইরান সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, 'জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শক্তিশালী দেশগুলোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত তারা কি কোনো প্রস্তাব পাশস করতে পেরেছে? জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোকে আমরা সঠিক মনে করি না। অনেক দেশই তা মনে করে না। অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখেছি, বিপদে জাতিসংঘের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না।'