ইসরায়েলের পার্লামেন্ট © সংগৃহীত
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট সোমবার একটি বিতর্কিত আইন পাস করেছে। এই আইনের মাধ্যমে প্রাণঘাতী হামলার দায়ে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্ধারিত শাস্তি হিসেবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই পদক্ষেপের পর বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
দখলকৃত ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার কট্টর ডানপন্থি মিত্রদের দেওয়া একটি পুরনো প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে।
পাস হওয়া এই নতুন আইনটি শুধু হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ইসরায়েলি নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যাদের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ‘ইসরায়েলের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করা’। তবে সমালোচকরা বলছেন, এর মূল অর্থ হলো এই আইনটি কেবল ফিলিস্তিনিদেরই মৃত্যুদণ্ড দেবে, অথচ একই ধরনের অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ইহুদি ইসরায়েলিকে এই সাজার আওতায় আনবে না। আইনের এই বৈষম্যমূলক ধারাটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রটিকে ইসরায়েলের ২০ শতাংশ আরব সংখ্যালঘুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়, যাদের অনেকেই নিজেদের ফিলিস্তিনি হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন।
এই আইনে সাজা ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে কার্যকরে বিলম্বের ক্ষেত্রে কিছু সুযোগ দেওয়া হলেও এই আইনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এতে সর্বোচ্চ সাজার বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হলেও তা শুধুমাত্র অনির্দিষ্ট কিছু ‘বিশেষ পরিস্থিতির’ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েল হত্যাকাণ্ডের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ১৯৫৪ সালে বিলুপ্ত করেছিল। এরপর ১৯৬২ সালে বেসামরিক আদালতে বিচারের পর শুধু একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। অ্যাডলফ আইখম্যান নামের এই ব্যক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে নাৎসি গণহত্যার একজন অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন। এর আগে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি সামরিক আদালতগুলোর দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইনগত অধিকার থাকলেও বাস্তবে তারা কখনো এমন সাজা দেয়নি।
ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির নির্বাচনের আগে জোরেশোরে প্রচারণা চলাকালে এই আইন করার কঠোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি ও তার কট্টর সমর্থকরা ফাঁসির দড়ির আকৃতির ল্যাপেল পিন পরে ঘুরে বেড়াতেন। শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ক্লেসেটের ১২০ জন সদস্যের মধ্যে ৬২ জনের সরাসরি সমর্থন পেয়ে বহুল আলোচিত প্রস্তাবিত এই আইনটি পাস হয়।
আইনটি পাস হওয়ার পর স্বয়ং পাার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বেন গভির বলেন, 'আজ হত্যাকারীদের জন্য ন্যায়বিচারের একটি দিন, শত্রুদের জন্য প্রতিরোধের একটি দিন। যে সন্ত্রাস বেছে নেয় সে মৃত্যু বেছে নেয়।'
এদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এই বিধানকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। পুরো বিষয়টিকে ফিলিস্তিনের 'ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা' বলে সরাসরি বর্ণনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এই কঠোর আইনের চরম প্রতিশোধ হিসেবে নতুন করে হামলা শুরু করার জন্য সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এই চূড়ান্ত ভোটের আগেই প্রস্তাবিত এই বিতর্কিত আইনটির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এই আইন ফিলিস্তিনিদের জন্য সম্পূর্ণ 'বৈষম্যমূলক' বলে মন্তব্য করার পাশাপাশি এটি ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক নীতিকে চরমভাবে খর্ব করে বলে তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের একদল বিশেষজ্ঞ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, এই আইনে 'সন্ত্রাসবাদীর' সংজ্ঞা একদম পরিষ্কার না, ফলে সত্যিকারভাবে 'সন্ত্রাসী' না এমন সাধারণ লোকজনও এই আইনের কালো ধারায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ও ইসরায়েলের কিছু প্রথম সারির মানবাধিকার সংগঠনও এই আইন পাসের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই চরম আইন আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে—এমন জোরালো ধারণা থেকে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আইনের কিছু ধারা নমনীয় করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সেই আবেদন পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা হলেও জোট রক্ষার স্বার্থে তিনি প্রস্তাবিত আইনের পক্ষেই শেষ পর্যন্ত ভোট দেন।