সিসমোফোবিয়া কী, কম্পন শেষেও কেন হয় ভূমিকম্পের আতঙ্ক?

০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:০৯ AM
ভূমিকম্প হলে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন

ভূমিকম্প হলে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন © বিবিসি বাংলা

কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন অথবা অফিসের চেয়ারে বসে কাজ করছেন। হঠাৎই মনে হলো, আশপাশের সবকিছু কাঁপছে কিংবা পায়ের নিচে দুলুনি অনুভব হচ্ছে। ভূমিকম্প ভেবে আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন, অথচ আশপাশে সবাই নীরব। পরে বুঝলেন ভূমিকম্প নয়। বাংলাদেশে সম্প্রতি ধারাবাহিক ভূমিকম্পের ঘটনায় অনেকের এমন অভিজ্ঞতা হচ্ছে।

ভূমিকম্প না হলেও মাঝেমধ্যেই যেন মনে হয় সবকিছু দুলছে। ক্লিনিক্যাল ভাষায় এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘সিসমোফোবিয়া’ বা ভূমিকম্প ভীতি। ঢাকার কারওয়ান বাজার এলাকার একটি বহুতল ভবনের ১২তলায় অফিস করেন বেসরকারি চাকরিজীবী তাসলিম তৌহিদ। তিনি বলছিলেন, ‘ওই দিনের আতঙ্ক আমাকে আজও ছাড়েনি। অফিসে থাকলে মাঝেমধ্যেই মনে হয় যেন পায়ের নিচে কেপে উঠল।’

ধারাবাহিক ভূমিকম্পের ঘটনায় কিছুটা মানসিক ট্রমার মধ্যেই দিন কাটছে রামপুরার বাসিন্দা প্রিয়াংকা শিকদারের। তিনিও মাঝেমধ্যেই কম্পন অনুভব করেন। তার ভাষ্য, ‘বাসায় যখন ছোট বাচ্চাটা নিয়ে একা থাকি, তখন বেশি আতঙ্ক কাজ করে।’

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীরা এ পরিস্থিতিকে বলছেন পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি। এ পরিস্থিতিতে চেয়ার একটু নড়লে কিংবা দূর থেকে ভারী ট্রাকের আওয়াজ এলেও আক্রান্ত ব্যক্তির বুক ধড়ফড় করে, মনে হয় সবকিছু ভেঙে পড়তে চলেছে।

অর্থাৎ কম্পন শেষেও মনের মধ্যে কম্পন অনুভব করার এক কঠিন মানসিক অবস্থা। এর মাধ্যমে এক ধরনের পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডি প্রকাশ হতে পারে। সিসমোফোবিয়া হলো ভূমিকম্পের প্রতি মানুষের এক তীব্র, অযৌক্তিক এবং অনিয়ন্ত্রিত আতঙ্ক বা ভীতি। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ক্লিনিক্যাল ফোবিয়া বা উদ্বেগজনিত ব্যাধি হিসেবেই বর্ণনা করছেন।

সহজ ভাষায়, এটি শুধু ভূমিকম্পের স্বাভাবিক ভয় নয়, বরং এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে একজন ব্যক্তি অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগে ভোগে। যখন ভূমিকম্প হয় না, তখনও ক্রমাগত ভূমিকম্পের আশঙ্কা মনের অজান্তেই কাজ করতে। চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানিরা বলছেন, এ ভয়ের কারণে দৈনন্দিন ব্যক্তি জীবনের স্বাভাবিক কাজ বা ঘুম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

তাদের মতে, সামান্য নড়াচড়া বা জোরে শব্দেও ব্যক্তির হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, কাঁপুনি, শ্বাসকষ্ট বা প্যানিক অ্যাটাকের মতো শারীরিক উপসর্গ তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের কারণে মস্তিষ্কের গভীরে ভয়ের উৎপত্তি হয়। চরম অসহায়ত্বের এ অভিজ্ঞতা মানুষের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা অংশটিকে (যা ভয় ও আবেগের কেন্দ্র) অতি-সক্রিয় করে তোলে। ফলে সামান্য ট্রিগারেও শরীর বড় বিপদের জন্য প্রস্তুত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ তানভীর রহমান বলছেন, ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট ট্রমা মস্তিষ্কে স্থায়ী বিপদ সংকেত তৈরি করে। এর ফলে সামান্য শব্দ বা নড়াচড়াকেও অনেক সময় জীবন-বিপন্নকারী হুমকি হিসেবে ধরে নেয় মস্তিষ্ক।

তিনি বলেন, ‘মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, আমাদের সব ভয়ই আসলে মৃত্যুর ভয় থেকেই আসে। ভূমিকম্পের সময় ভবন ভেঙে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত একদিকে এই চিন্তা, অন্যদিকে বারবার ভূমিকম্পের বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষের মনে একটা ফোবিয়া বা স্থায়ী আতঙ্কের রূপ নেয়।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের পর এমন হওয়াটা কারো ক্ষেত্রে মানসিক আবার কারো ক্ষেত্রে শারীরিক। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ অবস্থাকে পোস্ট আর্থকোয়েক ডিজিনেস সিনড্রোম বা পিইডিএস বলেও উল্লেখ করা হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলছেন, সিসমোফোবিয়া শারীরিক দুর্বল অবস্থার কারণেও হতে পারে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং ভূমিকম্প নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রচারণার কারণে অনেকের মনেই এর প্রভাব স্থায়ী হয়।

চিকিৎসকদের অনেকেই বলছেন, যাদের শারীরিক কারণে এমন হয়, তাদের ক্ষেত্রে এর বড় কারণ হতে পারে কানের ভেতরে থাকা এন্ডোলিম্ফ নামক তরল, যা মানুষের শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

ভূমিকম্পের কারণে ঝাঁকুনি হওয়ার পর এ তরল কিছু সময়ের জন্য অস্থির অবস্থায় থাকে। কখনও কখনও এ তরলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য হারিয়ে যায়। ফলে কিছুটা বেশি সময়ে জন্য শরীরে দুলুনি অনুভূত হতে পারে। এছাড়াও মিডিয়ার বারবার এবং গ্রাফিক্যাল কভারেজ, বিশেষ করে দুর্বল ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এ ভীতিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

সিসমোফোবিয়ার কারণে অনেকেই বড় সময়ের জন্য আতঙ্কিত সময় পার করেন। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির রাতের ঘুমও হারাম হতে পারে। এমনকি সামান্য ট্রিগারেই অনেকের মধ্যে প্যানিক অ্যাটাক, অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দনের গতি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। আশার কথা হলো, বেশিরভাগ ব্যাক্তির ক্ষেত্রেই এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

মনোবিজ্ঞানী সৈয়দ তানভীর রহমান বলছেন, সিসমোফোবিয়া সম্পূর্ণরূপে নিরাময়যোগ্য এবং এ জন্য চিকিৎসা প্রয়োজন। কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপি বা সিবিটি থেরাপির মাধ্যমে অযৌক্তিক এবং ভয় সৃষ্টিকারী চিন্তাভাবনাগুলো ধীরে ধীরে যৌক্তিক চিন্তাভাবনা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন: জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুতে স্থগিত হচ্ছে এক আসনের নির্বাচন

সিসমোফোবিয়ার চিকিৎসায় এক্সপোজার থেরাপির কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। যেখানে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশে ভূমিকম্পের শব্দ বা ভিডিওর মতো ভয়ের ট্রিগারের মুখোমুখি করানো হয়, যাতে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে এ সংকেতগুলো নিরাপদ।

তানভীর রহমান বলছেন, ‘প্রস্তুতিমূলক জ্ঞান ভূমিকম্পের সতর্কতা ও সুরক্ষার জন্য একটি সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি (যেমন, একটি সেফটি কিট তৈরি করা এবং ড্রিল) ভয়ের মূল কারণ, অর্থাৎ অনিশ্চয়তা, কমাতে সাহায্য করে।’

বারবার ভূমিকম্পের কারণে সিসমোফোবিয়া বা ভূমিকম্প ভীতি যেমন তৈরি হয়, তেমনি অনেকের মধ্যে ভয় কমিয়ে কিছুটা স্বাভাবিক অভ্যস্থতার মধ্যেও চলে আসতে পারে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলছেন, জাপানের মতো দেশগুলোয় ভূমিকম্প অনেক বেশি হওয়ায় সেখানকার মানুষ এর সঙ্গে বেঁচে থাকা রপ্ত করেছে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতি অধিকাংশ মানুষের কাছে ভয়ের হলেও স্থায়ী ট্রমা তৈরি করতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য ভূমিকম্পের প্রস্তুতি, ভূমিকম্পের সময় করণীয় এমন বিষয়গুলো ড্রিল বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষকে যত বেশি পরিচিত বা অভ্যস্থতায় পরিণত করা যাবে, মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মাত্রা কমে আসবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা।

কুয়াকাটায় ঘুরতে গিয়ে প্রাণ হারালেন সলিমুল্লাহ মেডিকেলের চিক…
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন, আহত শিক্ষার…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
‎জাবিতে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে,…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
নিউগিনি প্রপার্টিজে হামলা-ভাঙচুর, গ্রেফতার ১৪
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
মেডিসিন ক্লাবের ‘সংবিধান’ লঙ্ঘন করে পদ পেলেন ছাত্রদল ও নিষি…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
রাজধানীতে এক দিনের ব্যবধানে ফের বাসে আগুন
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950