কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় গড়ে উঠেছে বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র © টিডিসি
জ্বালানি সংকটের চাপে থাকা সময়ে কক্সবাজারের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্বস্তি দিচ্ছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। উপকূলের বাতাসকে কাজে লাগিয়ে নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় গড়ে ওঠা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অন্যতম বড় উদ্যোগ। ২০২৪ সালের ৮ মার্চ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এটি পূর্ণ উৎপাদনে যায়। এই প্রকল্পে ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২২টি টারবাইন বসানো হয়েছে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ মেগাওয়াট। সরকারি তথ্যমতে, ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ করেছে এই কেন্দ্র।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, গড়ে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে এটি সন্তোষজনক অগ্রগতি। কারণ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন হারও প্রায় একই মাত্রায় থাকে।
প্রকল্পটিতে প্রায় ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরকার উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ সেন্ট দরে কিনছে। হিসাব অনুযায়ী, ইতোমধ্যে কয়েক কোটি ডলারের বিদ্যুৎ জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বায়ুবিদ্যুতের বড় সুবিধা হলো এটি সূর্যালোকের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাতাস থাকলে দিন কিংবা রাত যেকোনো সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন কক্সবাজার উপকূলে বাতাসও তুলনামূলক বেশি থাকে।
এ ছাড়া জমির ব্যবহারেও এটি লাভজনক। সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে অনেক কম জমি প্রয়োজন হয়। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা আরও বেশি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পটি এলাকায় থাকলেও আশপাশে লোডশেডিং পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গরমের সময় এখনো অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাট দেখা যায়।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের বড় অংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। সেই লক্ষ্য পূরণে কক্সবাজারের এই বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্রকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেন, উপকূলীয় এলাকায় বায়ু বিদ্যুতের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি খরচ না থাকায় এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী। এটি পরিবেশবান্ধব, কার্বন নিঃসরণ কমায় এবং বৈশ্বিক কার্বন বাজারেও ভূমিকা রাখতে পারে।
একসময় যে বাতাস শুধু প্রকৃতির ছোঁয়া ছিল, আজ সেই বাতাসই আলো জ্বালাচ্ছে দেশের ঘরে ঘরে। কক্সবাজারের ঘূর্ণমান টারবাইনগুলো তাই শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।