রাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে ইউজিসি’র তদন্ত

মেয়ে-জামাতাকে শিক্ষক করতেই রদবদল নীতিমালায়

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৩৭ AM
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান © টিডিসি ফটো

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিবর্তন করে যোগ্যতা কমিয়ে দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান ও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসন। এর ফলে সায়ত্তশাসিত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী) মধ্যে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। এর মাধ্যমে কম যোগ্যতায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক হন উপাচার্যের কন্যা ও জামাতা।

শুধু নিজের কন্যা ও জামাতাই নন বরং এভাবে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য ৩৪ জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। আগের নীতিমালা অনুযায়ী যাঁদের আবেদনের যোগ্যতা ছিল না। শুধু তাই নয়, বাদ দিয়েছেন বিভাগে ও অনুষদে প্রথম হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পাওয়া, এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রথম বিভাগ বা শ্রেণি থাকা আবেদনকারীকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ তদন্ত করে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিবেদন দিয়েছে ইউজিসি।

তদন্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এ রকম আরও কিছু অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এ জন্য উপাচার্যকে দায়ী করে কমিটি বলেছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড উপাচার্যের মতো সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল পদের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। এ কারণে উপাচার্যের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছ কমিটি।

প্রতিবেদন জমার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ও ইউজিসির সদস্য দিল আফরোজা বেগম। তবে এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাননি তিনি।

কমিটি বলছে, উপাচার্যের নৈতিকতা বিবর্জিত এই ধরনের কর্মকাণ্ড জরুরি ভিত্তিতে বন্ধে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যাতে প্রাচীন ও এতিহ্যবাহী এই উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও গবেষণার সার্বিক পরিবেশের উন্নয় সাধিত হয়। এ ছাড়া নীতিমালা পরিবর্তনের সুযোগে নিয়োগ পাওয়া ৩৪ জনের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

গণশুনানিসহ বিভিন্নভাবে তদন্তকাজটি করেন ইউজিসির দুই সদস্য। তবে উপাচার্য গণশুনানিতে হাজির হননি, বরং ইউজিসি চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতে উপাচার্য তাঁর বিরুদ্ধে ইউজিসির তদন্ত কমিটি গঠনের এখতিয়ার নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তদন্ত প্রতিবেদন জমার পর বক্তব্য জানতে গতকাল বুধবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

আবদুস সোবহান ২০১৭ সালের মে থেকে দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর প্রথম মেয়াদেও (২০০৯-২০১৩) তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। মাঝে এক মেয়াদে উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপাচার্য আবদুস সোবহান ২০১৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করে যোগ্যতা কমান। আগের নীতিমালায় আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল সনাতন পদ্ধতিতে এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত চারটি স্তরেই প্রথম শ্রেণি বা গ্রেড পদ্ধতিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে ন্যূনতম জিপিএ-৪.৫০, স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম সিজিপিএ-৩.৫০। এ ছাড়া স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মেধাক্রম প্রথম থেকে সপ্তমের মধ্যে থাকতে হবে। পরিবর্তিত নীতিমালায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ মোটাদাগে ৩.২৫-এ নামিয়ে আনা হয় এবং মেধাক্রমে থাকার শর্তও তুলে দেওয়া হয়।

তদন্ত কমিটি বলেছে, নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে ১৯৭৩-এর অধ্যাদেশে চলা চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়) মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা এখন সর্বনিম্ন।

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় যোগ্যতা কমিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের করা ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের চেতনার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন উপাচার্য।

তদন্ত কমিটি বলেছে, যোগ্যতা কমানোর একটাই উদ্দেশ্য, ২০১৭ সালের আগে যাঁদের আবেদন করার যোগ্যতা ছিল না, তাঁদের নিয়োগের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

এই সুযোগেই মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করা উপাচার্যের কন্যা সানজানা সোবহান নিয়োগ পান টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে এবং জামাতা এ টি এম শাহেদ পারভেজ নিয়োগ পান ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে (আইবিএ)।

আগের নীতিমালা অনুযায়ী তাঁদের আবেদন করারই যোগ্যতা ছিল না। কারণ বিভাগে সানজানা সোবহানের মেধাক্রম ছিল ২১ তম, আর জামাতার এমবিএ পরীক্ষায় মেধাক্রম ছিল ৬৭ তম এবং তাঁর ফল ছিল সিজিপিএ-৩.৪৭। অথচ অন্য আবেদনকারীদের অধিকাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি ছিল।

এছাড়া নতুন প্রতিষ্ঠিত টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে সাধারণত প্রথমে টুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয় থেকে পাস করা প্রার্থী নেওয়ার কথা। কিন্তু সেটি না করে মার্কেটিং ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে উপাচার্য কন্যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

উপাচার্য তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, নিয়োগ বোর্ড এই নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু তদন্ত কমিটি দেখেছে, বোর্ডে পাঠদানের দক্ষতা যাচাই হয়েছে— এমন কোনো দালিলিক প্রমাণও নেই। এমন নিয়োগে বোর্ডেরও দোষ দেখেছে কমিটি।

আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগেও নিয়মের ব্যত্যয় দেখেছে তদন্ত কমিটি। অনুষদে প্রথম হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক পাওয়া, এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত প্রথম বিভাগ বা শ্রেণি থাকা আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে একজন পরে সহ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়ার মেয়েকে বিয়ে করেন। তদন্ত কমিটির মূল্যায়ন ‘লক্ষ্য করেই’ এটি করা হয়েছে।

উপাচার্যের বাসভবনে ওঠার পরও আগের বরাদ্দ করা বাড়িটি কাগজপত্রে ছেড়ে দিলেও আসবাব রাখার জন্য প্রায় দেড় বছর নিজের দখলে রেখেছিলেন উপাচার্য। এরও সত্যতা পেয়েছে কমিটি।

তবে বিচারাধীন থাকায় উপাচার্যের নিজ বিভাগ থেকে অবসর এবং তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে ঠিকভাবে না জানানোর বিষয়ে তদন্ত কমিটি কিছু বলেনি।

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশিন। প্রতিবেদনটি এখনো আমাদের হাতে আসেনি। হাতে পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

একটা দল পরিস্থিতি উত্তপ্ত করছে: জামায়াত
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
বোরকা পরে ভুয়া ভোট দেওয়ার চেষ্টা করা হলে প্রতিহত করা হবে: ম…
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
জার্মানিতে এসেই যে কাজগুলো করবেন
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
আমরা কখনো জালিম হব না, মজলুমের দুঃখ আমরা বুঝি: জামায়াত আমির
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
বাগেরহাটে নির্বাচনী প্রচারে বাধা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া উৎসব ভাতা নিয়ে নতুন নির্দেশনা
  • ৩১ জানুয়ারি ২০২৬