৫০ লাখ টাকা দেনমোহর, স্ত্রী-২ সন্তানের ভরণপোষণ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্ত্রীর মামলা © এআই সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফলিত গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. এ বি এম শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর এবং নিজের ও দুই সন্তানের ভরণপোষণ আদায়ের দাবিতে পারিবারিক আদালতে মামলা করেছেন তার স্ত্রী রোজিনা সুলতানা। গত ২৮ অক্টোবর তিনি এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার বাদী রোজিনা সুলতানা পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সবুজনগর এলাকার বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন।
রোজিনা সুলতানা ওই অধ্যাপকের তৃতীয় স্ত্রী বলে জানা গেছে। এর আগে ড. এ বি এম শাহাদাত হোসেন ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়। পরে একজন এয়ার হোস্টেসকে বিয়ে করেছিলেন। তার সঙ্গেও বিচ্ছেদ হয়েছিল বলে জানা যায়।
মামলার আরজিতে বাদি উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর রেজিস্ট্রিকৃত কাবিননামার মাধ্যমে ড. এ বি এম শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে তার প্রথম বিয়ে হয়। বিয়ের আগে অভিযুক্ত শিক্ষক তার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ এবং ওই সংসারে দুই সন্তান থাকার তথ্য গোপন করেন। পাশাপাশি অন্য এক নারীর সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টিও গোপন রেখে তাকে বিয়ে করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি জানাজানি হলে অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে তালাক দেন। পরে আবারও সংসার করার প্রস্তাব দেন।
আরজির বিবরণ অনুযায়ী, পূর্বের দুই স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাবিননামার সাক্ষীদের মধ্যস্থতায় ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট তাদের পুনরায় বিয়ে হয়। এ সংসারে ২০২৩ সালের ৪ মে প্রথম সন্তান সামিন আবদুল্লাহ বিন শাহাদাত এবং ২০২৫ সালের ২২ জুন দ্বিতীয় সন্তান সোহরাব আয়াতুল্লাহ বিন শাহাদাত জন্মগ্রহণ করে। তবে সন্তানদের জন্মের সময় হাসপাতাল ও অস্ত্রোপচারের যাবতীয় ব্যয় বাদী নিজেই বহন করেন। অভিযুক্ত শিক্ষক কোনো আর্থিক সহযোগিতা করেননি এবং সন্তানদের প্রতিও দায়িত্ব পালন করেননি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার আরজিতে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষক একটি তালাকনামার ফটোকপি বাদীর কাছে পাঠান। ওই তালাকনামার হলফনামায় দ্বিতীয় কাবিননামায় জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ করা হলেও তা মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন বাদী। তার ভাষ্য, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে তিনি পুনরায় বিয়েতে সম্মত হয়েছিলেন। এ ছাড়া তাকে তালাক দেওয়ার পর অভিযুক্ত শিক্ষক তাছিন বিভা নামের এক নারীকে চতুর্থবারের মতো বিয়ে করেছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই পর্যন্ত ৪৬ মাসে বাদী ও তার দুই সন্তানের ভরণপোষণ বাবদ মোট ২৭ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বাদী নিজে ৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। আদালতে দায়ের করা পিটিশনে ৫০ লাখ টাকা দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোশ বাবদ ৯০ হাজার টাকা, ৪৬ মাসের ভরণপোষণ বাবদ ১৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং দুই নাবালক সন্তানের বকেয়া ও চলমান ভরণপোষণ আদায়ের আবেদন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোজিনা সুলতানা বলেন, আমার বাবাও একজন শিক্ষক ছিলেন। একজন শিক্ষককে আমি নৈতিকতাসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর তার কাছ থেকে সেই আচরণ পাইনি। বারবার আমাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আমার কথা বাদই দিলাম, আমার সন্তানদের কী অপরাধ? তাদের বাবাকে বাবা বলে ডাকার অধিকারটুকুও কি নেই? আজ পর্যন্ত তিনি সন্তানদের দেখতে পর্যন্ত আসেননি। এমনকি আমার ছোট সন্তান জন্ম নেওয়ার সময়ও তিনি দেখতে আসেননি।
নিজের ও সন্তানদের ভরণপোষণ নিয়ে তিনি বলেন, দুই সন্তানের খরচ, বাসাভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলতে হচ্ছে। তিনি সন্তানদের কোনো দায়িত্ব নিচ্ছেন না। অথচ সন্তানদের ভরণপোষণ ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব নেওয়া তার কর্তব্য।
রোজিনা সুলতানা জানান, প্রথম বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, অভিযুক্ত শিক্ষকের আগের স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া তখনো সম্পূর্ণ হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে তালাক দেওয়া হয়। এর প্রায় বছর দেড়েক পর ৫০ লাখ টাকা দেনমোহরে পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব দেন অভিযুক্ত শিক্ষক। পরে হলফনামার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়। পুনরায় বিয়ের পর অভিযুক্ত শিক্ষক তাকে একটি বাসায় নিয়ে গেলেও সংসারের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতেন না বলে অভিযোগ তার।
মামলার বিষয়ে রোজিনা সুলতানা জানান, গত ২৮ অক্টোবর আদালতে মামলা দায়েরের পাশাপাশি পিটিশন জমা দিয়েছেন তিনি। চলতি সপ্তাহের মধ্যে মামলার সার্টিফাইড কপি পাওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুন্সী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এ ধরনের একটি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি আইনি হওয়ায় সিদ্ধান্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়েছে। তার মতামত পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হবে। তদন্তে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফলিত গণিত বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এ বি এম শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।