ড. তৈয়েবুর রহমান, মো. মেহেদী হাসান খান ও ড. মুহাম্মদ মইনুল ইসলাম © সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন নিয়োগকে ঘিরে বুধবার (২২ এপ্রিল) দিনভর ঘটে গেছে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা। পদত্যাগ, নতুন নিয়োগ, সেই নিয়োগ প্রত্যাখ্যান এবং পরবর্তীতে নতুন করে আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনা ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) সকালে ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ-এর কাছে আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। তবে তিনি এ বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত জানাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
পদত্যাগের বিষয় জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি রেজিস্ট্রার অফিসে ফরমাল পদত্যাগপত্র দিয়েছি। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু মেক থিংস ডিফিকাল্ট (আমি বিষয়টা জটিল করতে চাই না)। ইউ ক্যান কালেক্ট দিস ইনফরমেশন ফ্রম দ্য রেজিস্ট্রার অফিস।
এরপর উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিএনপিপন্থী শিক্ষক মো. মেহেদী হাসান খানকে ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে নিয়োগ দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ সাক্ষরিত এক নিয়োগপত্রে বলা হয়, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান ডিনের পদ হতে পদত্যাগ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ এর প্রথম সংবিধির ১৭ (২) ধারা অনুযায়ী ২২ এপ্রিল হতে অনধিক ৯০ (নব্বই) দিন অথবা নির্বাচিত ডিন কাজে যোগদান না করা পর্যন্ত উপাচার্য পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খানকে উক্ত অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন নিয়োগ করেছেন।
চিঠি পাওয়ার পরপরই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করে রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি পাঠান সহযোগী অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খান।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, প্রশা-৪/৭০০১৮ বরাতে জানতে পেরেছি আমাকে ২২ এপ্রিল থেকে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি আমার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করছি।
ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের অপরাগতা কারণ জানতে চাইলে মো মেহেদী হাসান দ্যা ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, আমি এগু্লো নিয়ে কোনো কমেন্টস ( মন্তব্য) করতে পারব না। আমি যা বলার আমার চিঠিতে বলেছি। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই। অথরিটি ভালো বলতে পারবে।
পরবর্তীতে ঘণ্টাখানেকের মধ্য একই বিভাগের আরেক বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য ( প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশার স্বামী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিনের অপরাগতা প্রকাশ ও তাকে নিয়োগ দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটা আমি জানি না। উনি অপরাগতা প্রকাশ করেছেন এবং তারপর আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেওয়া হয়েছে। আমি তো জয়েন করেছি। কিন্তু কেন অপরাগতা করেছেন, এটা ওনাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদগুলোতে ডিন নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব আছে কি না জানতে চাইলে কলা অনুষদের (ভারপ্রাপ্ত) ডিন অধ্যাপক ড. মো আবুল কালাম সরকার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডিন পদগুলো সাধারণত বিভিন্ন শিক্ষক-রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়—যেমন সাদা দল বা নীল দল। এটি সম্পূর্ণ নির্দলীয় কোনো পদ নয়; ফলে দলীয় প্রার্থীদের মধ্য থেকেই ডিন নির্বাচিত হওয়া স্বাভাবিক। অতীতেও অধিকাংশ ডিন নীল দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তবে ডিন নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতাও বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, নিয়মিত নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা ভারপ্রাপ্ত ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সাধারণত ডিনরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন এবং বিধি অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় না, ফলে বিলম্ব ঘটে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমে তিন মাসের জন্য ভারপ্রাপ্ত ডিন নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা হলে, সেখান থেকে আরও তিন মাসের জন্য সময় বৃদ্ধি করা হয়।
ডিন নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে সহযোগী অধ্যাপককে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, নীতিগতভাবে নির্বাচিত ডিন দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত উপাচার্য ভারপ্রাপ্ত ডিন নিয়োগ দিতে পারেন। এক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপকও ডিনের দায়িত্ব পেতে পারেন, যদি তিনি যোগ্য হন। একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখতে যিনি পদত্যাগ করেছেন তার জায়গায় দ্রুত কাউকে নিয়োগ দেওয়া জরুরি ছিল।
ডিন নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল, নীল দল এগুলো থাকেই। কিন্তু যখন কেউ চেয়ারে বসে, তাকে সবার জন্য কাজ করতে হয়। আমি দেখব তিনি তার কাজে কতটুকু সফল ও নিরপেক্ষ।