ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেল, ঢাবি © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত ড. কুদরত-ই-খুদা হোস্টেলে প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ঢাবিতে এ ধরনের অভিযোগ এটিই প্রথম।
অভিযুক্তারা হলেন-লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইন্সটিটিউটের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আল মোসাদ্দেক, খালিদ আব্দুল্লাহ, মোহাম্মদ আনাস, সাবিক ইসলাম, ইব্রাহিম, মনিরুল। তারা সবাই লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গেস্টরুমে উপস্থিত থাকা প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘চার দিন ধরে হলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ওপর নিয়মমাফিক হয়রানি চলছে। প্রতিদিন রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু করে ২টা বা আড়াইটা পর্যন্ত তাদের বসিয়ে রাখা হয়। সিনিয়ররা একে ‘ম্যানার শেখানো’ বললেও, বাস্তবে এটি চরম মানসিক হয়রানি বা র্যাগিংয়ের পর্যায়ে পড়ে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘৪৩তম ব্যাচের মোসাদ্দেক নামের এক শিক্ষার্থী নারী সহপাঠীদের নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের নারী সহপাঠীরা মূলত ‘সিনিয়রদের খাবার’। এ ধরনের বক্তব্য যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মানসিকতার পরিচায়ক। তার এ মন্তব্য আমার কাছে অনেক খারাপ লেগেছে।’
ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীর দাবি, কথা না শুনলে তাদের ৪২তম ব্যাচের সিনিয়র শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়, যেটি আরও ‘ভয়ংকর’ বা ‘সাংঘাতিক’। শিক্ষার্থীদের জোর করে রাত জেগে সিনিয়রদের সামনে সালাম দেওয়া ও আত্মপরিচয় দেওয়ার তথাকথিত শিষ্টাচার পালন করতে বাধ্য করা হয়। সাধারণত ১০০৩ ও ১০০৪ নম্বর রুমে এসব ঘটনা ঘটে। তবে সর্বশেষ গত রাতে হলের ডাইনিং রুমে প্রকাশ্যেই চলে এ কাজ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাত ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এসব হয়রানি চলে। সেখানে ৪৩তম ব্যাচের পাশাপাশি ৪২তম ব্যাচ এবং তারও উপরের ব্যাচের সিনিয়ররা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ছাত্রদলের পরিচয়ধারী ৪ থেকে ৬ জন বড় ভাই উপস্থিত ছিলেন। তারা নবীনদের সমস্যার কথা জানতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান হিসেবে ‘ইমিডিয়েট সিনিয়রদের’ কথা শোনার কথা বলেন।’
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ আনাস বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না, তাই কিছু বলতে পারব না। আমি টিউশন থেকে আসি ১২টার পরে।’
আরেক অভিযুক্ত ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা সবাইকে ডেকে ছিলাম, এটা সত্যি। সবার সঙ্গে সবার পরিচিতি পর্ব হয়েছে। এটা হোস্টেলে আগে থেকেই ছিল। আমরাও আমাদের সিনিয়রদের সঙ্গে বসেছিলাম, কিন্তু সেখানে আমরা গেস্টরুমের কোনো কালচার ব্যবহার করিনি।’
অভিযুক্ত আল মোসাদ্দেকের ফোনে চেষ্টা করা হলেও বন্ধ পাওয়া যায়।
ড. কুদরত-ই-খোদা হোস্টেল শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সঙ্গে সংযুক্ত। এ ঘটনা সম্পর্কে জানেন কি না, প্রশ্ন করা হলে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সহসভাপতি মো. আহসান হাবীব ইমরোজ বলেন, ‘আমি এ ঘটনাটি সম্পর্কে শুনেছি। এ বিষয়ে ডাকসু ও হল সংসদ আজকে ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকার করে জবাবদিহি করবে। আমি নিজে হোস্টেলে গিয়ে খোঁজ নেব। এমন ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে চলতে দেওয়া হবে না।’
এ বিষয়ে ড. কুদরত-ই-খোদা হোস্টেলের ওয়ার্ডেন ড. মো. ফরহাদ আলী বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত নই।
উল্লেখ্য, আওয়ামী সরকারের সময়ে হলগুলো ছাত্রলীগ নেতাদের দখলে ছিল। হলগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ছিল ‘গেস্টরুম কালচার’ (‘ম্যানার’ শেখানোর নামে গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন), ও ‘গণরুম কালচার’। জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে এখন আবাসিক হলে সিট বণ্টনের দায়িত্ব হল প্রশাসনের হাতে। ডাকসু নির্বাচনের সময়ে প্রায় প্রতিটি প্যানেলই ‘গেস্টরুম ও গণরুম সংস্কৃতি’ ক্যাম্পাসে আর ফিরতে দেবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,। তবে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হতে না হতেই আবারো এ ধরনের সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে।