মাসুদ করিম © টিডিসি সম্পাদিত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় সনদ প্রদানের নামে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অর্থ আদায়ের একটি চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এক কর্মচারী হাতেনাতে আটক হওয়ার পর ওই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নাম সামনে আসতে শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে, ট্রান্সক্রিপ্ট শাখার সহকারী মাসুদ করিম এই চক্রের মূল সংগঠক।
একাধিক সূত্রের দাবি, শাখাটিতে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বিতভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায় করতেন। তবে সিন্ডিকেট পদ্ধতিতে কাজ হওয়ায় এতদিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ৩১০ (খ) নম্বর কক্ষে কর্মরত ট্রান্সক্রিপ্ট শাখার অস্থায়ী কর্মচারী শামসুন্নাহার এক মেডিকেল শিক্ষার্থীর কাছে জরুরি সনদ দেওয়ার নামে ৫ হাজার টাকা দাবি করেন—এমন অভিযোগ ওঠে। হোয়াটসঅ্যাপে অর্থ দাবির একাধিক কথোপকথনের স্ক্রিনশটও সামনে এসেছে বলে জানা গেছে।ওই দিন বিকেলে ডাকসুর সদস্য সর্বমিত্র চাকমাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী এবং প্রক্টরিয়াল টিম শামসুন্নাহারকে হাতেনাতে আটক করেন। পরে তাকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে কথা বলে প্রক্টর অফিসে নেওয়া হয়। সেখানে দেওয়া জবানবন্দিতে শামসুন্নাহার দাবি করেন, তিনি একা নন—এই কার্যক্রম একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং এতে শাখার সহকারী মাসুদ করিমের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ট্রান্সক্রিপ্ট শাখায় প্রতিদিন দুই থেকে তিনজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো। দৈনিক এই অর্থের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থের একটি অংশ নিয়মিতভাবে মাসুদ করিমের কাছে পৌঁছাত, যদিও তিনি সরাসরি সামনে আসতেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিয়মিত অফিসে আসেন না সেই সুযোগে মাসুদ করিম তার এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করে। দীর্ঘদিন ধরেই মাসুদ করিমের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। তবে এবার হাতেনাতে ধরার ঘটনায় বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
ট্রান্সক্রিপ্ট শাখার অস্থায়ী কর্মচারী অভিযুক্ত মো. সজিব ঘুষ নেয়ার কথা স্বীকার করে দ্য ডেইলি ক্যম্পাস কে জানান, মাঝে মাঝে অফিসে প্রিন্টার নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন প্রিন্টার আনতে হলে বিল অনুমোদন আনতে হয় যেখানে সময় অনেক লাগে। তখন নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে সেটা ঠিক করতে হয়।
শামসুন্নাহার আপুর একবার নষ্ট হয়ে যায় তখন সাবেক ডেপুটি আমাদের বলেন, যে শিক্ষার্থীর দ্রুত ট্রান্সক্রিপ্ট লাগবে তাদের অতিরিক্ত টাকা দিতে বলবে। পরে অনেক শিক্ষার্থী রাজি হয়। আমি শুধু একবার টাকা নিয়েছি পরে আমি সেই টাকা দিয়ে একটা কিবোর্ড কিনেছি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মেহজাবিন সুরভী অভিযোগ করে বলেন, সার্টিফিকেট সংক্রান্ত কাজে কয়েকদিন ধরে তাকে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘোরানো হয়। কখনো অনলাইন আবেদন ভুল বলা হয়, কখনো অফলাইন ফর্ম পূরণ করতে বলা হয়। পরে জরুরি সেবার নামে সরকারি ফি পরিশোধের পরও সনদ পেতে দেরির কথা জানানো হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর অতিরিক্ত ‘সম্মানী’ দাবি করা হয় এবং শামসুন্নাহার তাকে জানান, দ্রুত সার্টিফিকেট পেতে হলে ৫ হাজার টাকা দিতে হবে। দরকষাকষির চেষ্টা করলে তাকে অপমান করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমা দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, শামসুন্নাহারের সাথে কথা বলে আরও কয়েকজনকে পাই পরে ট্রান্সক্রিপ্ট শাখার অস্থায়ী কর্মচারী মো. সজিবের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৪ জানুয়ারি ডাকসু ভবনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে আরও চারজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। আমরা প্রাথমিকভাবে প্রমাণ পেয়েছি যে এই সিন্ডিকেটের মূলহোতা মাসুদ করিম। তবে তদন্ত করলে আরও অনেকের নাম বের হয়ে আসতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাসুদ করিম বলেন, আমি এসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত নই। তবে অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কয়েকজনের সাথে কথা বলে তাদের সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে একটি কমিটি গঠন করবে। সেই অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্র শেখর চক্রবর্তী দ্য ডেইলি ক্যম্পাসকে বলেন, তদন্তের পর যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, তাই কার্যকর করা হবে। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।