ঢাবির শতবার্ষিক স্মৃতিস্তম্ভ
ব্যাবসায় শিক্ষা অনুষদের সামনে মনুমেন্ট তৈরি করতে গিয়ে গাছের শেকড় কাটা যাচ্ছে © সংগৃহীত
প্রচলিত একটা কথা আছে, গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢেলে লাভ কী? এই কথার কথাটিই যেন বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে দেশসেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। উন্নয়ন কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা নির্মাণের অযুহাতে সবসময়ই ধ্বংসের মুখে পড়ে প্রাণ প্রকৃতি। সেটাই আবার হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় মানুষ ও পরিবেশের জন্য। বিভিন্ন সময় গাছ উপড়ে বা ভেঙ্গে ক্যাম্পাস এলাকায় বেশ কিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহতের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। তারপরও টনক নড়েনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়নি বড় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৭০ ফুট দৈর্ঘ্য, ৩০ ফুট প্রস্থ এবং ২৫ ফুট উচ্চতার ঢাবির শতবার্ষিক মনুমেন্টের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ২১ কোটি টাকা। এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিশাল এলাকা নিয়ে এক কর্মযজ্ঞ চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে।

শতবার্ষিক স্মৃতিস্তম্ভ কাজের উদ্বোধন করছেন সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান
পশ্চিমে প্রশাসনিক ভবন এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, পূর্বে কলা ভবনের প্রাঙ্গণ ও ব্যবসা শিক্ষা অনুষদ প্রাঙ্গণ, উত্তরে মাস্টার দ্যা সূর্যসেন আবাসিক হল প্রাঙ্গণ, দক্ষিণে ভিসি চত্বর সুবিশাল ফাঁকা-খোলা ও সবুজ মাঠকে চারদিক থেকে ঘিরে চলছে কাজ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীদের আপত্তি সত্ত্বেও নান্দনিকতা আর সৌন্দর্যবর্ধনের নামে এ যেন প্রকৃতি ধ্বংসেরই মহাযজ্ঞ। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজটির উদ্বোধন হয়। এ বছর জুনের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। যদিও নতুন করে ডিজাইন পরিবর্তন করায় কাজ কখন শেষ হবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শতবর্ষী এ বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই নানা সংকটে জর্জরিত। তার মধ্যে অন্যতম আবাসন সংকট। ৪ জনের কক্ষে ৩৫ জন শিক্ষার্থী বসবাসের নজিরও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে। সেখানে শিক্ষার্থীদের জীবন মান নিয়ে না ভেবে প্রশাসন ব্যস্ত সৌন্দর্যবর্ধন নিয়ে। সে কাজেও আবার উঠেছে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ।

অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র ভবন নির্মাণে ক্যাম্পাসে খোলা জায়গা আগের চেয়ে কমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি খোলা মাঠ। তার মধ্যে একটি মল চত্বর। যেখানে প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করে আর বিকেলে সবুজ মাঠে আড্ডা দেয়। দূরদূরান্ত অনেকে ঘুরতে আসে। চারপাশে থাকা বড় বৃক্ষের কারণে এক কথায় পাখিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এ মাঠ। যানজটের শহরে যে মাঠ যে চত্বর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আনন্দের খোরাক আজ সেটিই পথচারীদের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যে অংশজুড়ে স্থাপনা নির্মাণের করা চলছে সেখানে গাছ আছে কমপক্ষে ৫৫৫টি। এর মধ্যে বড় গাছ অন্তত ২০০টি। দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার কাজে এই গাছগুলোর পাশ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য বড় করে ড্রেন কাটা হয়েছে। এটি করতে গিয়ে এরইমধ্যে কাটা পড়েছে অনেক গাছের শিকড়। যে পাশটাতে ড্রেন করা হয়েছে সেই পাশে গাছের কাটা শিকড় আর বৃদ্ধি পাবে না। ফলে গাছগুলো একপাশে হেলে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শিকড় বা গাছ কাটা পড়বে এবং তাতে পরিবেশের ক্ষতি হবে এমন অভিযোগে শুরুতেই কাজ বন্ধের দাবি জানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পরিবেশবাদীরা। কিন্তু তাদের প্রতিবাদ আর দাবিকে উপেক্ষা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু মাঝামাঝি সময়ে এসে চোখে পড়ছে উল্টো চিত্র। কাটা পড়েছে অনেক গাছ। আবার শিকড় কাটার জন্য এরইমধ্যে মরে গেছে অনেকগুলো। এছাড়া ধীরে ধীরে হেলেও পড়ছে বেশ কিছু গাছ।

পাশ দিয়ে ড্রেন কাটতে গিয়ে অনেক গাছের শেকড় কাটা পড়েছে
গণমাধ্যম ও পরিবেশবাদীদের তথ্যমতে, বৃষ্টি হলে ঢাকার মাটি নরম হয়ে যাওয়ায় মাটির সঙ্গে গাছের শেকড়গুলো শক্তভাবে আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না। গাছের শিকড় গভীরে না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই উপড়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও সে ঘটনাই ঘটছে হরহামেশা। গেল সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় একটি বড় গাছ ভেঙে এক রিকশাচালক মারা যান। ওই ঘটনায় আহত হন আরও দুই শিক্ষার্থী।
এর আগে আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় দুটি চলন্ত গাড়ি এবং একটি যাত্রীবাহী রিকশার ওপর ভেঙে পড়ে বিশাল আকৃতির কৃষ্ণচূড়া। ওই দুর্ঘটনায় প্রকৌশলীসহ চারজন আহত হয়। এত দুর্ঘটনাও টনক নড়েনি ঢাবি প্রশাসনের।
ঐতিহাসিক স্থাপনার নামে কাটা হচ্ছে মল চত্বরের গাছের শিকড়। ভারি বৃষ্টি বা ঝড়ো বাতাসে এসব গাছ পড়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এসব কারণে পরিবেশের প্রতি সহানুভূতি আর শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা বিবেচনায় কাজটি বন্ধের দাবি শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইখ আল তমাল বলেন, ভোরে কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে চোখ ঢলতে ঢলতে মলচত্বর দিয়ে ক্লাসে যাওয়ার সময় সবুজে সতেজ হয়ে যেত মনটা। সে আমেজ থাকতো সারাদিন। মনুমেন্ট তৈরির নামে সে প্রশান্তিটুকু কেড়ে নেয়া হয়েছে। দূষিত এই শহরে নির্মল ও সুন্দর ছিল ক্যাম্পাসের এই জায়গাটুকু। বসন্তে যেখানে সারি সারি জারুল ফুটতো। কৃষ্ণচূড়া ছড়ানো মাটিকে মনে হত কোন লাল গালিচা। হালকা বৃষ্টিতে স্বর্গীয় পরিবেশের দেখা মিলত। নির্মাণ কাজ চলায় গাছগুলোর বেশ ক্ষতি হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর প্রতিবাদ জানাই।

পূর্বের মল চত্বরের একটি দৃশ্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক লুৎফর রহমান বলেন, এখানকার পরিবেশ নিয়ে এর আগেও কথা বলেছি। শতবর্ষী মনুমেন্ট দৃষ্টিনন্দন হবে সেটি নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে মল চত্বরে যেভাবে কাটাকাটি হচ্ছে, কংক্রিটের স্থাপনাটি শেষ পর্যন্ত পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভালো হবে সেটি দেখার বিষয়।

সবুজায়ন বাড়াতে মলচত্বরের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। ভাঙা পড়ছে পূর্বের কিছু স্থাপনা
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রকৃত প্রেমী হলে এ কাজ করতে পারত না। এখন আমাদের দাবি গাছগুলোর গোড়ায় আলাদাভাবে মাটি দেওয়ার। যাতে সেগুলো উপড়ে না পড়ে এবং হতাহতের ঘটনা না ঘটে। যেসব স্থানে ড্রেন করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় সেসব জায়গা বাদ দিয়ে বিকল্প কিছু ভেবে দেখুক। যাতে গাছগুলো আগের মতো বাঁচার সুযোগ পায় তার অনুরোধ থাকবে।
যদিও এ কাজের উদ্বোধন করেছেন সদ্য বিদায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।
এ বিষয়ে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মল চত্বরে বর্তমানে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন বা ল্যান্ডস্ক্যাপ এটি ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব একটা জানা ছিল না। উপাচার্য হওয়ার পর আমি জানার চেষ্টা করেছি। আমি, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং ট্রেজারারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশনকে নিয়ে ইতোমধ্যে স্থানটি পরিদর্শন করেছি।
আগের যে সবুজায়ন যেন থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন ঘুরে বেড়াতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে। আমার ধারণা পরিবর্তিত যে নকশা হবে সেখানে নতুন বৃক্ষলতা রোপণ করা হবে, আমাদের আরবারি কালচার সেন্টার এটা দেখবে।
মল চত্বরের এই কাজে বস্তুত কোনো গাছ কাটা হয়নি দাবি করে উপাচার্য আরও বলেন, আমরা মল চত্বরকে আরও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করবো।

শতবার্ষিক স্মৃতিস্তম্ভের একটি দৃশ্য
কেন এই শতবার্ষিক স্মৃতিস্তম্ভ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মলচত্বরে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শতবার্ষিক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ স্থাপনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবান্বিত শতবর্ষের প্রকাশ হিসেবে ১০০টি বাতি থাকবে এবং ২০টি হিস্ট্রি প্যানেল নির্মাণ করা হবে। এখানে শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা, সাইকেল স্ট্যান্ড, রিসাইকেল বিন, চার্জিং পয়েন্টসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকবে।