ফুল বিক্রেতা বৃষ্টি রাণী © টিডিসি ফটো
আজ মহান বিজয় দিবস। ঘড়ির কাঁটায় বাজে সকাল দশটা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহিদ মিনার চত্বরে ঢুকতেই চোখে পড়লো বেগুনি কালারের শাড়ি পরিহিতা মাঝ বয়সী এক নারী। হাতে আছে এক বালতি তাজা গোলাপ। শহিদ মিনারে আসা দর্শনার্থীদের মাঝে বিক্রি করছেন ফুলগুলো। বালতির ভিতরে আছে লিমেনেটিং করা একটি কাগজ। তাতে লেখা ‘লিঙ্গের কোনো ভেদাভেদ নাই, আমরাও কারো সন্তান। কর্ম করে বেঁচে থাকার সুযোগ চাই, তাই সুযোগ করো আমাদের দান।’
কথা বলে জানা যায়, এই নারীর নাম বৃষ্টি রানী। দেখতে নারী হলেও তিনি অন্য দশজন নারীর মতো স্বাভাবিক নন। তিনি একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। জোরজবরদস্তি করে মানুষের কাছে টাকা আদায় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। তবে এখন সেই কাজ ছেড়ে দিয়ে বেছে নিয়েছেন ফুল বিক্রির পেশাকে।
রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর টি-বাঁধ এলাকার মৃত জব্বার শেখের সন্তান বৃষ্টি রানী। চার ভাই বোনের মধ্যে বৃষ্টি মেজো। রাজশাহী পুলিশ লাইনস্ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করার সুযোগ হয়েছিল তার। হাই স্কুলে পড়াশোনার ইচ্ছে থাকলেও সহপাঠীদের বিরূপ আচরণে শিক্ষার আলো থেকে ছিটকে পড়েন বৃষ্টি।
আরও পড়ুন: ঘুমের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক, না ফেরার দেশে জবি শিক্ষার্থী
বৃষ্টি জানান, ১০ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারেন নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মেয়েলি আচরণের কথা। এ নিয়ে স্কুলে ছেলেদের বেঞ্চে বসতে গিয়ে কটু কথা শুনতে হতো তাকে। ছেলেরা পাশে বসতে দিতো না। এসব ঘটনা শিক্ষকদের জানালেও লাভ হয়নি। উল্টো লাঞ্ছনা-বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে তাদের কাছে। তাই কটু কথার তিক্ততায় বিদ্যাপীঠ ছাড়তে হয় তাকে। নিজের নারীসুলভ আচরণের কথা জানার পর জড়িয়ে পড়েন হিজড়া গোষ্ঠীর সাথে। তারপর তাদের সঙ্গেই ভালো-মন্দ কাজে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
জানতে চাইলে বৃষ্টি আরও জানান, আগে কারো কাছে হাত পাতলে কিংবা জোরপূর্বক টাকা নিলে তারা ভালো চোখে দেখতো না। তাতে আমার খারাপও লাগতো। এখন ফুল বিক্রি করে অনেক সম্মানের সাথে জীবন-যাপন করছি। প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টা ফুল বাজার থেকে দুপুর বেলা কিনে আনি। এরপর সেগুলোকে বাড়িতে ঠিকঠাক করে একটি কালো বালতিতে নিয়ে বিকেলে বের হই। প্রতিটা ফুলের দাম ১০ টাকা করে বিক্রি করে এখন ভালোই আছি।
ছুটি কিংবা উৎসবের দিনগুলো পদ্মাপাড় থাকে আনন্দে উৎসব মুখর। এসব দিনগুলোতে বৃষ্টি শ’খানেক ফুল নিয়ে বের হন। দিন শেষে শ’পাঁচেক টাকার লাভ থাকলে তাতেই খুশি হন তিনি।