প্রতিকী ছবি © সংগৃহীত
শরীরের পেশি গঠন, ক্ষয় পূরণ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রোটিনের প্রয়োজন। তবে প্রতিদিন কত গ্রাম প্রোটিন খাওয়া হচ্ছে, শুধু সেটি হিসাব করলেই সুষম খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত হয় না। প্রোটিনের উৎস, গুণগত মান, হজমের সক্ষমতা এবং খাদ্যতালিকায় আঁশের উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসক সিদ্ধার্থ ভার্গবের মতে, খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর সময় অনেকেই আঁশযুক্ত খাবারের বিষয়টি উপেক্ষা করেন। অথচ প্রোটিন ও আঁশ শরীরে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে। তাই সুস্থ থাকতে এই দুই পুষ্টি উপাদানের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।
প্রোটিনের পরিমাণের পাশাপাশি মানও জরুরি
প্রোটিন শরীরের পেশি ধরে রাখা, ক্ষয় পূরণ এবং স্বাভাবিক শারীরিক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করে। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর নির্ভর করে একজনের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা। তবে প্রোটিনের উৎস বাছাইয়ের সময় শুধু পরিমাণ দেখলে হবে না, এর গুণগত মানও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রোটিনে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের উপস্থিতি এবং শরীর কতটা সহজে তা হজম ও শোষণ করতে পারে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে প্রোটিনের মান যাচাইয়ে পিডিসিএএএস পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
প্রোটিনের উৎস হতে পারে নানা ধরনের
প্রাণিজ খাবারের পাশাপাশি উদ্ভিজ্জ খাবার থেকেও প্রোটিন পাওয়া যায়। ডিম, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, ডাল, শিমজাতীয় খাবার, সয়া, টোফু, বাদাম, মাছ ও মাংস প্রোটিনের উৎস হতে পারে। এ ছাড়া গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি ইস্ট প্রোটিনও একটি বিকল্প উৎস। ভালোভাবে প্রক্রিয়াজাত ইস্ট প্রোটিনে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড থাকতে পারে এবং এটি হজমের ক্ষেত্রেও ভালো ফল দেখাতে পারে। তাই প্রোটিন গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎস, অ্যামিনো অ্যাসিডের ধরন ও হজমযোগ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রোটিনের সঙ্গে আঁশ কেন প্রয়োজন
প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাড়াতে গিয়ে অনেকেই ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণশস্য ও বাদামের মতো আঁশযুক্ত খাবার কম খেয়ে ফেলেন। এতে খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। প্রোটিন পেশির গঠন ও ক্ষয় পূরণে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, আঁশ অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে। ইনুলিনের মতো কিছু গাঁজনযোগ্য আঁশ অন্ত্রের জীবাণুর মাধ্যমে ভেঙে শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড (এসসিএফএ) তৈরি করতে সাহায্য করে। এসব উপাদান অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ ও কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
খাদ্যের কিছু প্রোটিন বৃহদান্ত্রে পৌঁছানোর পর অন্ত্রের জীবাণু তা ভেঙে ফেলে। এ প্রক্রিয়ায় খাদ্যে থাকা অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, গাঁজনযোগ্য আঁশের উপস্থিতি এসসিএফএ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে এবং প্রোটিন ভাঙার ওপর অন্ত্রের জীবাণুর নির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রোটিন গ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত আঁশ খাওয়াও জরুরি। ফল, শাকসবজি, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
হজমের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে
প্রোটিনের গুণগত মানের সঙ্গে এটি শরীরে কতটা সহজে হজম হয়, তার সম্পর্ক রয়েছে। গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি ইস্ট প্রোটিন নিয়ে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। গাঁজন প্রক্রিয়াটি প্রোটিন তৈরির পদ্ধতির অংশ; এর অর্থ এই নয় যে প্রোটিনটি আগে থেকেই হজম করা অবস্থায় রয়েছে। শরীরের পরিপাকতন্ত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এটি ভাঙে।
হজমের সময় বিভিন্ন এনজাইম প্রোটিনকে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলে। প্যাপেইন এমন একটি এনজাইম, যা প্রোটিন ভাঙতে সহায়তা করে। তাই খাবারের প্রোটিনের উৎস, গুণগত মান ও হজমযোগ্যতা সবকিছুই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
খাদ্যাভ্যাস হতে হবে বাস্তবসম্মত
সকালের নাশতায় তাড়াহুড়া, কাজের চাপে দুপুরের খাবার দেরিতে খাওয়া কিংবা ভ্রমণের কারণে নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তাই এমন খাদ্যতালিকা তৈরি করা দরকার, যা পুষ্টিকর হওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলাও সহজ। প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনের ভালো উৎসের সঙ্গে পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে। নিয়মিত খাবার খাওয়ার সুযোগ না থাকলে সুবিধাজনক বিকল্প খাবারও বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত, সারা দিনের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো খাদ্যাভ্যাস মানে শুধু প্রতিদিন কত গ্রাম প্রোটিন খাওয়া হলো, তা হিসাব করা নয়। বরং প্রোটিনের মান, আঁশের পরিমাণ, হজমের সুবিধা এবং সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ভারসাম্য নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।