প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
কোরবানির ঈদে উৎসবের আমেজ আর ভোজনরসিকদের পাতে নানাপদের মাংসের আয়োজন—এ যেন দেশের প্রতিটি মুসলিম পরিবারের সংস্কৃতি। তবে উৎসবের আনন্দ বিষাদে রূপ নিতে বেশি সময় লাগে না, যখন অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার পর হুট করেই শুরু হয় পেটের গোলযোগ। পেট ব্যথা, গ্যাস কিংবা ডায়রিয়াকে অনেকেই উৎসবের মৌসুমে ‘স্বাভাবিক বদহজম’ ভেবে উড়িয়ে দেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই সাধারণ সমস্যার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে শরীরের অভ্যন্তরীণ কিছু জটিল কারণ।
অনেকের শরীর লাল মাংসের নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘আলফা-গাল সিন্ড্রোম’। এটি মূলত এক ধরণের মাংসের গোপন অ্যালার্জি। মাংস খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর যদি আপনার হঠাৎ ডায়রিয়া, তীব্র পেট ব্যথা, বমিভাব, ত্বকে লালচে র্যাশ কিংবা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, তবে তা এই সিন্ড্রোমের লক্ষণ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অসতর্কতায় এই অ্যালার্জি কখনো কখনো জীবন ঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়ায়।
এর বাইরে গরু বা খাসির মাংসে থাকে উচ্চমাত্রার চর্বি এবং জটিল প্রোটিন, যা সবার পরিপাকতন্ত্র সহজে গ্রহণ করতে পারে না। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই যদি আপনার পেট ফাঁপা, গ্যাস বা অস্বস্তি শুরু হয়, তবে বুঝবেন আপনার শরীর এই ভারী খাবার হজম করতে হিমশিম খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকদিন মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে নরম ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত।
কোরবানির ঈদে একসঙ্গে অনেক মাংস ঘরে আসায় সংরক্ষণ এবং রান্নায় কিছুটা অসতর্কতা দেখা দেওয়াও আরেকটি বড় কারণ। অপর্যাপ্ত তাপে রান্না করা কিংবা সঠিকভাবে ফ্রিজিং না করা মাংসে খুব দ্রুত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধে। এই জীবাণুযুক্ত মাংস খাওয়ার ফলে ফুড পয়জনিং হয়ে বমি, ডায়রিয়া ও শরীর দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সাধারণত কয়েক দিনে এটি ঠিক হয়ে গেলেও দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, উচ্চ জ্বর বা পানিশূন্যতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
পাশাপাশি আপনার কি চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়ার পর প্রায়ই হজমের সমস্যা হয়? চিকিৎসকরা বলছেন, পিত্তথলি কিংবা অগ্ন্যাশয়ের কার্যকারিতায় কোনো সমস্যা থাকলেও চর্বি জাতীয় খাবার পরিপাক হতে পারে না। এর লক্ষণ হিসেবে পাতলা ও তৈলাক্ত মল, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস কিংবা চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এই লক্ষণগুলোকে সাধারণ পেটের সমস্যা ভেবে ভুল করা বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
ঈদের খুশি ও নিজের সুস্বাস্থ্য—দুটোই একসাথে বজায় রাখা সম্ভব যদি আমরা ছোট্ট কিছু নিয়ম মেনে চলি।
প্রথমত, ঈদে মাংসের হরেক পদ সামনে থাকলেও একবারে অতিরিক্ত মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পাতের এক পাশে পর্যাপ্ত সালাদ ও সবজি রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মাংস কাটার পর দ্রুত তা ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হবে এবং রান্নার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মাংসের ভেতরের অংশটুকুও ভালোভাবে সেদ্ধ হয়।
উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন শরীর থাকে সতেজ ও রোগমুক্ত। তাই এবারের ঈদে রসনা বিলাসের পাশাপাশি সচেতনতা হোক আপনার সুস্থতার চাবিকাঠি।
পাশাপাশি,ঈদের কোনো এক বেলায় বেশি ভারী খাওয়া হয়ে গেলে পরবর্তী খাবার হালকা রাখুন। এক্ষেত্রে রাখতে পারেন স্যুপ, সালাদ, ফল বা সবজি, দুধ বা টকদই।
প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। এটি শরীরকে হাইড্রেট রাখবে এমনকি অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গ্যাসের সমস্যা থাকলেও অনেকটাই আরামবোধ হবে।
ঈদের দিন অতিরিক্ত মাংস গ্রহণ করা হয়ে গেলেও পরের দিনগুলোতে মাংস গ্রহণ কমিয়ে দিন। এক্ষেত্রে মাংসের আইটেম রাখলেও তা রান্না করুন সবজির সঙ্গে বা ছোট টুকরা দিয়ে পাতলা ঝোল।
ঈদের আনন্দে অতিরিক্ত খাওয়ার পাশাপাশি রাত জাগা হয়ে যায় অনেক সময়ই, তবে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে না পারলে দেখা দেয় নানা সমস্যা।
অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ করে ফেললে একটু কুসুম গরম পানি বা লেবু পানি পান করুন। কিছুটা স্বস্তিবোধ হবে। এছাড়া কোল্ড ড্রিংকসের পরিবর্তে পানীয় হিসেবে নিতে পারেন টকদই দিয়ে তৈরি বোরহানি।
খাওয়ার পর অন্তত ১০-২০ মিনিট হাঁটুন।