কারিগরি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা © এআই সৃষ্ট ছবি
ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমের সাম্প্রতিক সমাপনী পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের কারিগরি শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে পারেননি অধিকাংশ শিক্ষার্থী। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, পাঁচটি পর্ব মিলিয়ে সামগ্রিক পাসের হার মাত্র ৪০ দশমিক ১ শতাংশ।
ফলাফল অনুযায়ী, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। বিশেষ করে প্রথমদিকের পর্বগুলোতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই এটিকে ‘গণরেফার্ড’ হিসেবে উল্লেখ করছেন। শিক্ষার্থীরা ভুল মূল্যায়নের অভিযোগ করলেও শিক্ষকদের দাবি, ‘মানবিক নম্বর’ কেমেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত ফলাফলে ১ম, ২য়, ৪র্থ, ৬ষ্ঠ ও ৮ম পর্বের পরীক্ষার চিত্র উঠে এসেছে। দেশের ৪৯টি সরকারি ও প্রায় ২০০টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মোট ২ লাখ ১৮ হাজার ৬২২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৮৭ হাজার ৬৪৩ জন। বিপরীতে ১ লাখ ৩০ হাজার ৯৩০ জন শিক্ষার্থী ফেল করেছেন। বিভিন্ন পর্ব মিলিয়ে মোট পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ১ শতাংশ।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ১ম সেমিস্টারে পাসের হার মাত্র ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২য় সেমিস্টারে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, ৪র্থ সেমিস্টারে ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে ৪২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে এর বিপরীতে ৮ম সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, যেখানে পাসের হার প্রায় ৯৯ দশমিক ১ শতাংশ।
ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাদের অভিযোগ, অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশার চেয়ে অস্বাভাবিকভাবে খারাপ ফল পেয়েছেন। বিশেষ করে যেসব পরীক্ষা গ্রেড বাস্তবায়ন আন্দোলনের কারণে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে পিছিয়ে পরে নেওয়া হয়েছিল; সেসব বিষয়েই ফেলের হার বেশি দেখা গেছে বলে দাবি তাদের। ফলের এমন বিপর্যয়ের পর শিক্ষার্থী কয়েক দফা সাক্ষাৎ কারেন কারিগরি বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে। সেখানে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দাবিও জানান তারা।
দাবির মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের উত্তরপত্র বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পুনঃনিরীক্ষণ; পুনঃনিরীক্ষণ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও শিক্ষার্থীবান্ধব করা; প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরীক্ষা অথবা বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতির ব্যবস্থা করা; ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পরীক্ষার সময়সূচি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সমন্বিত ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বিষয়গুলো পুনরায় তদন্ত করে প্রকৃত ফলাফল যাচাই সাপেক্ষে সংশোধিত ফল প্রকাশের জন্য বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের প্রতি অনুরোধও জানান তারা।
১ম সেমিস্টারে পাসের হার মাত্র ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২য় সেমিস্টারে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ, ৪র্থ সেমিস্টারে ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে ৪২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে এর বিপরীতে ৮ম সেমিস্টারে শিক্ষার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, যেখানে পাসের হার প্রায় ৯৯ দশমিক ১ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, পরীক্ষার পর নিজেদের উত্তরপত্র শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে মিলিয়ে তারা পাসের বিষয়ে যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, অনেকেই একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন। একই বিষয়ে একই ব্যাচের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করার ঘটনাও তাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফল বিপর্যয়ের পর পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা দেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। প্রতি বিষয়ের জন্য ৩০০ টাকা ফি দিয়ে শিক্ষার্থীরা বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করছেন। পাশাপাশি যেসব ফলাফলে জিপিএ অনুপস্থিত বা কারিগরি ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোর সংশোধনের জন্য আগামী ১৪ মে পর্যন্ত বিশেষ আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। পুনঃর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়া নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেকের অভিজ্ঞতা, আবেদন করার পরও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে শত শত শিক্ষার্থী হাজারের বেশি বিষয়ে পুনঃর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। কয়েকটি বিষয়ে আবেদন করার পর হয়তো একটি বা দুটি বিষয়ে পরিবর্তন আসে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফল অপরিবর্তিত থাকে।’ তার মতে, ফলাফল নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি সমস্যা।
দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো রাজধানীর ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ফলাফলেও একই ধরনের বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ১১ হাজার ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে পাস করেছে ৪ হাজার ৭৫২ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৬ হাজার ২৮৮ জন। ফলে প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।
বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফেলের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের ঘাটতি দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধরণ ও একাডেমিক পরিবেশ মোটামুটি আগের মতোই ছিল। তবে আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের মানবিক শিথিলতা বা কিছুটা ছাড় দেওয়া হতো, এবার সেটি তুলনামূলক কম হয়েছে।-মো. হাবিবুর রহমান, অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব), ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
আরও পড়ুন: র্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শীর্ষে পৌঁছাতে পারেনি: প্রধানমন্ত্রী
পর্বভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম পর্বে পাসের হার ছিল মাত্র ২১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্বে তা কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ দশমিক ১১ শতাংশে। চতুর্থ পর্বে পাসের হার ৩২ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ষষ্ঠ পর্বে ৪২ দশমিক ৮৪ শতাংশে পৌঁছায়। তবে অষ্টম পর্বে প্রায় শতভাগ সাফল্য দেখা গেছে। এ পর্বে অংশ নেওয়া ১ হাজার ৮৩১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৮২৪ জনই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ফলাফলে এবার তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. হাবিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ফেলের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থী বা শিক্ষকদের ঘাটতি দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ধরণ ও একাডেমিক পরিবেশ মোটামুটি আগের মতোই ছিল।’
আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের মানবিক শিথিলতা বা কিছুটা ছাড় দেওয়া হতো, এবার সেটি তুলনামূলক কম হয়েছে বলে মনে করেন অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার কারণেও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন এসে থাকতে পারে। ফলে মানবিক বিবেচনার জায়গাটি এবার কিছুটা সীমিত ছিল।’
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাবিমুখতা ও শিক্ষকদের ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের বড় কোনো সমস্যা আপাতত আমাদের নজরে আসেনি। বর্তমানে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, ল্যাব সুবিধাও আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। বিশেষ করে গত চার-পাঁচ বছরে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত সুবিধার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাদান পদ্ধতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও আপডেট। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকতে পারে, যদিও সেটি খুব বড় আকারের নয় এবং সংখ্যাও তুলনামূলক কম।’
এ চিত্র শুধু সরকারি পলিটেকনিকগুলোতেই নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই অবস্থা দেখা গেছে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাইভেট পলিটেকনিকগুলোতেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করেছে। তবে সরকারির তুলনায় সেখানে কিছুটা কম সংখ্যক চিত্র রয়েছে ফেলের।
রাজধানীর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে ৭৫৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছে ৪৫৩ জন। শতকরা হিসেবে প্রায় ৬০ শতাংশ পাসের হার। এটি বিগত বছরগুলোতে আরও বেশি ছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম।
তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সাধারণত সরকারি পলিটেকনিকগুলোর তুলনায় আমাদের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজাল্ট ভালো হয়। কারণ আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস, ল্যাব নিয়ে থাকি। সরকারিগুলোতে শিক্ষক-ল্যাব সঙ্কট থাকা শিক্ষার্থীরা সে পরিমাণ শিক্ষা অর্জন করতে পারে না।’
‘কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তি হলো নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে’ -নাম প্রকাশে অনচ্ছুক এক বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা
এ বিষয়ে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থী পলাশ মাহমুদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ব্যাপক হারে ‘রেফার্ড’ আসার মূল কারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাস না করার প্রবণতা। এছাড়া দীর্ঘদিন যাবত কারিগরি সেক্টর নিয়ে আন্দোলন এবং ক্রাফট ইনস্ট্রাক্টরদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত ক্লাস এবং ল্যাবের ঘাটতি তো ছিলই। মূলত বোর্ডের কঠোর মূল্যায়নের কারণেই এই সেমিস্টারে পাসের হার ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট খারাপের পিছনে কারণ জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী হাসিবুর রশীদ বলেন, ‘নিয়মিত ক্লাস না করার কারণে শিক্ষার্থীদের বেসিক বা ভিত্তি দুর্বল থেকে যায়। আর বেসিক দুর্বল থাকলে ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টগুলো পড়া ও বোঝা বেশ কঠিন। এছাড়া ব্যবহারিক ক্লাসে অনুপস্থিতিও ফলাফল খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ।’
তিনি বলেন, ‘যেহেতু এসএসসির পর বিজ্ঞান ও ভোকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াও মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে তাদের ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি ও গণিতে অনেক বেশি দুর্বলতা থাকে। অন্যতম একটি বড় কারণ হলো—আমাদের সেমিস্টারগুলোতে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হয় না। আবার আন্দোলন, বন্যা ইত্যাদি কারণেও ক্লাসের সংখ্যা অনেক কমে যাচ্ছে।’
ফল বিপর্যয় ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগের পর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন নাম প্রকাশে অনচ্ছুক এক বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। তিনি বলেন, কারিগরি শিক্ষার মূল শক্তি হলো নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বিশেষ করে ১৪ সপ্তাহের একটি সেমিস্টারে শুরু থেকেই অনিয়মিত উপস্থিতি দেখা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মিডটার্ম পরীক্ষার পর অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ক্লাসে আসে না। এমনকি ফরম পূরণের পরও অনেককে শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায় না। ফলে প্রয়োজনীয় শিখন ঘাটতি নিয়েই তারা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়।’
বোর্ড কর্মকর্তা আরও বলেন, কারিগরি শিক্ষা সাধারণ শিক্ষার মতো নয়, যেখানে শুধু গাইড বই বা প্রাইভেট পড়ার মাধ্যমে ভালো ফল করা সম্ভব। এ শিক্ষাব্যবস্থায় ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত কয়েক বছরের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করেছে, তাদের মধ্যে অকৃতকার্য হওয়ার হার প্রায় নেই বললেই চলে। তাই এবারের ব্যাপক ফেলকে শুধু খাতা মূল্যায়নের ত্রুটি হিসেবে না দেখে শিক্ষার্থীদের ক্লাসবিমুখতার একটি বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
‘পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলনে যুক্ত থাকায় পরীক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। একপর্যায়ে পরীক্ষা বন্ধ, আবার শুরু এভাবে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সাধারণত এটি এক থেকে দেড় মাসে শেষ হয়। এ দীর্ঘ সময় ও অনিয়মিত ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে’ -মো. আবুল কালাম আজাদ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের শিক্ষার্থী আহসান হাবিব দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে অতিরিক্ত ‘রেফার্ড’ আসার জন্য শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষই দায়ী। নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিতি এবং পড়াশোনায় অনীহা শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ। অন্যদিকে, এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া এবং শিক্ষক স্বল্পতাও বড় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় প্রস্তুতির ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়ার একটি বড় প্রভাব পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সেমিস্টার ফাইনালের খাতা শিক্ষার্থীদের দিয়ে মূল্যায়ন করানো বোর্ডের বড় একটি ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীন আচরণ। এ প্রক্রিয়া মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নষ্ট করছে এবং সরাসরি শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. আবুল কালাম আজাদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গত কয়েকটি পর্বের তুলনায় এবার ফলাফলে রেফার্ডের সংখ্যা বেড়েছে, যার পেছনে পরিস্থিতিগত ও অ্যাকাডেমিক উভয় ধরনের প্রভাব রয়েছে।
‘পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলনে যুক্ত থাকায় পরীক্ষার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। একপর্যায়ে পরীক্ষা বন্ধ, আবার শুরু এভাবে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সাধারণত এটি এক থেকে দেড় মাসে শেষ হয়। এ দীর্ঘ সময় ও অনিয়মিত ধারাবাহিকতা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলেছে’, বলেন তিনি।
আরও পড়ুন: অ্যালামনাইদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতির ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু ডিপ্লোমা পর্যায় নয়, সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের ক্লাস বিমুখতা বাড়ছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষায় নিয়মিত ক্লাস ও ল্যাব প্র্যাকটিস ছাড়া পাস করা কঠিন। যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত ছিল, তাদের পাসের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। আমাদের
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যারা নিয়মিত ক্লাস করেছে, তারা অধিকাংশই পাস করেছে। ফেল করা শিক্ষার্থীদের বড় অংশই অনিয়মিত ছিল বা ক্লাসে উপস্থিতি কম ছিল।
শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ওঠা ‘গণরেফার্ড’ বা পরিকল্পিতভাবে ফেল করানোর অভিযোগকে তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ডিপ্লোমা ও বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত বিতর্ক বা আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। বোর্ডের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কোনো বিরোধ নেই। এটি একই পরিবারের মতো সম্পর্ক।’
শিক্ষক ঘাটতি বা ক্লাস সংকটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষক ঘাটতি আগের মতো নেই। দুই বছর আগে প্রায় তিন হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ফলে ঘাটতির বিষয়টি এখন বড় কোনো সমস্যা নয়।’
যদিও তিনি স্বীকার করেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি কিছুটা রয়েছে। প্রশিক্ষণ আরও উন্নত করা দরকার, এতে শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল দক্ষতা আরও বাড়বে। কিন্তু এই বিষয়টি সরাসরি ফলাফলে ফেল করার সঙ্গে বড় কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।