বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
ববি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম © সংগৃহীত
পদোন্নতির দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যে শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষায় না ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষা চালু রাখার আহ্বান জানিয়ে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখবেন না। আমি শিক্ষকদের অনুরোধ করব, এই কর্মকাণ্ড থেকে তারা যেন বিরত থাকে এবং ক্লাস-পরীক্ষা চালু করে। যদি এই ধরনের কার্যক্রম চলমান থাকে, তাহলে আইনে যেভাবে লেখা আছে সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপাচার্য বলেন, সরকার কর্তৃক পাসকৃত অভিন্ন নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রায় ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করেছে। তারা এই নীতিমালাকে নিজেদের মতো করে আরও শক্তিশালী করেছে, কিন্তু কোনো ধরনের ছাড় দেয়নি। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এখনো তা গ্রহণ করেনি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘এই সংকট থেকে বের হতে হলে আমাদের অভিন্ন নীতিমালা যেকোনো উপায়ে গ্রহণ করতেই হবে। আমরা যদি এটি না করি, তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আন্দোলনে নামবে এবং তারাও ছাড় চাইবে।’
পদোন্নতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু পদ না থাকায় সরাসরি পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে ইউজিসি থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যেসব অধ্যাপক পদ নেই সেগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং সেই পদে নিয়োগের মাধ্যমে পদোন্নতি কার্যকর করা হবে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণে সময় লাগবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান, সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, অভিন্ন নীতিমালার আলোকে এক মাসের মধ্যে সংবিধি প্রণয়ন করা হবে। সেই সংবিধির ভিত্তিতেই পরবর্তীতে পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হবে।
শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, তিনি ডিনদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছেন এবং সংবাদ সম্মেলনের আগে বসে সমাধান খুঁজতে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু শিক্ষকরা সে আলোচনায় অংশ না নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এখনো আলোচনার সুযোগ আছে এবং শিক্ষকরা চাইলে প্রতিনিধি দল নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে আলোচনার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।
অতিরিক্ত ক্লাসের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। প্রয়োজনে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিভাগগুলোকে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সে অনুযায়ী ইউজিসিতে আবেদন পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
উপাচার্য বলেন, ‘অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আমি দেইনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী কিছু অতিরিক্ত ক্লাস সবাইকেই নিতে হয়। খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে।’
আইনগত অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, যদি তার বিরুদ্ধে কোনো আইন পরিপন্থী কাজের অভিযোগ থাকে, তাহলে শিক্ষকরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারেন। ‘কোন জায়গায় আমি অসত্য তথ্য দিয়েছি, তা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এভাবে সাধারণ অভিযোগ তোলা ঠিক নয়,’—বলেন তিনি।
চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রকল্প, ফিজিবিলিটি স্টাডি ও নতুন উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে, যা আন্দোলনের কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়ছে বলে তিনি মনে করেন।
অসহযোগ আন্দোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের প্রতি আমার আহ্বান, তারা যেন এই কর্মসূচি থেকে সরে এসে ক্লাস-পরীক্ষা চালু করেন। এরপরও যদি তারা অসহযোগিতা অব্যাহত রাখেন, তাহলে আমার পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে পদোন্নতির দাবিতে ‘কম্পিলিট শাটডাউন’ কর্মসূচির পর উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’-এর ঘোষণা দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষকরা। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ ঘোষণা দেন।
গত বুধবার (২২ এপ্রিল) থেকে শুরু হওয়া পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও শাটডাউনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানান শিক্ষকরা।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বিদ্যমান আপগ্রেডেশন নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যতা অর্জন সত্ত্বেও পদোন্নতি কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে। তারা দাবি করেন, উপাচার্য বিভিন্ন টালবাহানার মাধ্যমে বিষয়টি বিলম্বিত করছেন এবং ইউজিসির দোহাই দিয়ে পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন, যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
তারা আরও বলেন, ইউজিসির সাম্প্রতিক নির্দেশনার কারণে শুধু পদোন্নতি নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক কার্যক্রমও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চ্যান্সেলরের অনুমোদিত সংবিধি ছাড়া পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও ডিগ্রি প্রদান বৈধ না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কথাও তুলে ধরেন আন্দোলনরত শিক্ষকরা। তাদের মতে, বহু বিভাগে শিক্ষক সংখ্যা অত্যন্ত কম, অথচ দীর্ঘদিন ধরে শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষা পরিবেশ রক্ষায় উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষকরা। একই সঙ্গে সংকট সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।