পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের অনীহা বাড়ছে যেসব কারণে

০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ PM
মো. মারুফ কবির, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা

মো. মারুফ কবির, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা © ফাইল ছবি

বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা সংক্রান্ত নীতির মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন এবং সক্রিয় তদারকি অংশীদার হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহ। দেশে পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সমমান) সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধান করে থাকে এই শিক্ষা বোর্ডগুলো। সম্প্রতি একটি দৈনিকের মাধ্যমে ‘খাতা নিচ্ছেন না শিক্ষকরা, ফল পেতে দেরির ভয়’- শিরোনামে রিপোর্টটি অনেকের নজরে এসেছে। রিপোর্টটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার এবারের এসএসসি পরীক্ষা-২০২৬ এর খাতা মূল্যায়ন সম্পর্কে। এধরণের সমস্যা এবারই প্রথম এমন নয়, বিগত বছরগুলোতেও একই সমস্যা আমরা দেখে এসেছি। উক্ত রিপোর্টটি দেশের ১১টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অব্যবস্থাপনাজনিত সৃষ্ট সমস্যাকে ইঙ্গিত করে।

এ ধরনের সমস্যার মূল কোথায়, তা আগে উদঘাটন করতে হবে
প্রথমত, পাবলিক পরীক্ষার (মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক) খাতা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধিত শিক্ষকগণ মূল্যায়ন করে থাকেন। এসএসসি পর্যায়ে মাধ্যমিকের শিক্ষকগণ এবং এইচএসসি লেভেলে অধিকাংশ বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তাগণের পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষকগণ খাতা মূল্যায়ন করে থাকেন। বোর্ডে সহজে নিবন্ধিত হওয়া যায়, কিন্তু একজন সক্রিয় পরীক্ষক হিসেবে খাতা মূল্যায়নকারী হতে হলে প্রয়োজন উচ্চ পর্যায়ের লবিং। যার জন্য অসংখ্য যোগ্য শিক্ষক খাতা মূল্যায়নে অংশ নিতে পারেন না।

দ্বিতীয়ত, পাবলিক পরীক্ষার খাতা বণ্টনের পদ্ধতি অত্যন্ত হতাশাজনক। নির্ধারিত শিক্ষাবোর্ডে উপস্থিত হয়ে লাইনে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে একজন শিক্ষককে খাতা সংগ্রহ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে এমন ঘটনাও ঘটে যে একজন শিক্ষককে নির্দিষ্ট ফ্লোর থেকে খাতা ভর্তি থলে নিজের মাথায় করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামাতে হয়েছে। যা একজন শিক্ষকের জন্য চরম অসম্মানের।

তৃতীয়ত, খাতা মূল্যায়নের জন্য বোর্ড থেকে সীমিত সময় বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমরা জানি অল্প সময়ে ন্যায়ভিত্তিক মূল্যায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একজন পরীক্ষককে ২০০-৪০০ টি খাতা দেওয়া হয়, সময় বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৫-২০ দিন। এই স্বল্প সময়ে স্বচ্ছতার সাথে খাতা মূল্যায়ন একটা দুরূহ ব্যাপার। কারণ, শিক্ষককে শুধু খাতা মূল্যায়নই নয়, খাতায় নির্ধারিত অংশে (ওএমআর) পূরণ করতে হয়। যা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং একাধারে সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। 

চতুর্থত, খাতা মূল্যায়ন শেষে পরীক্ষককে নিজ দায়িত্বে মূল্যায়িত খাতা প্রধান পরীক্ষকের নিকট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হয়। বিশেষ করে যে পরীক্ষকগণ অপেক্ষাকৃত দূরে অবস্থান করেন তাদের জন্য বিষয়টি অতিরিক্ত ঝামেলার। ঢাকা শহরসহ অন্যান্য জ্যামের শহরে প্রত্যেকে এ ধরনের ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চায়।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এইচএসসি পর্যায়ে খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধান পরীক্ষকদের একটা বড় অংশ থাকেন বেসরকারি কলেজের শিক্ষক, আত্মীকৃত শিক্ষকগণ। যাদের অধীনে প্রফেশনালিজমের পর্যাপ্ত চর্চা না থাকায় বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ কাজ করে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। 

এমনকি লাইনে দাঁড়িয়ে খাতা সংগ্রহের মত অবমাননাকর পরিস্থিতিকে এড়িয়ে চলতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের খাতা মূল্যায়নে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তাগণ নিরুৎসাহিত বোধ করেন। যার প্রভাব খাতা মূল্যায়নে প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হচ্ছে।

সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ব্যবস্থাপনার (Management) প্রেষণা তত্ত্বের আলোকে (Motivation Theory) একজন কর্মী কাজের বিনিময়ে যোগ্য/ ন্যায়ভিত্তিক পারিশ্রমিক পেলে নিজ কাজে আরও বেশি উৎসাহিত হয়। কিন্তু, শিক্ষা বোর্ডের খাতা মূল্যায়নে একজন শিক্ষক যে পরিমাণ পারিশ্রমিক (খাতাপ্রতি) পেয়ে থাকেন তা অত্যন্ত হতাশাজনক। এরপর খাতা মূল্যায়নের পরে পেমেন্ট হাতে পেতে দীর্ঘ ৮-১০ মাস অপেক্ষা করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অপেক্ষার প্রহর আরও দীর্ঘ হয়। প্রত্যেক শিক্ষকের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকার পরেও পেমেন্ট দেওয়া হয় মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে। 

নিতান্ত স্বল্প পারিশ্রমিক, তার উপর ১০% উৎসকর কর্তন, মোবাইল ব্যাংকিং চার্জ কর্তনের পরে যে অ্যামাউন্ট একজন শিক্ষক দীর্ঘকাল অপেক্ষা করার পরে হাতে পান Time Value of Money বিবেচনায় ধরে হিসাব করলে তার ভ্যালু হিমাঙ্কের নিচে অবস্থান করে। অথচ একজন পরীক্ষককে তার কর্মস্পৃহা বাড়ানোর জন্য ন্যায়ভিত্তিক এবং কার্যকর পারিশ্রমিক দেওয়াটা বাঞ্ছনীয়।

এখন শিক্ষা বোর্ডসমূহে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন পরিপন্থি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এসব অচলাবস্থার সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। নতুবা যতদিন অতিবাহিত হবে সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

প্রথমত, শিক্ষা বোর্ডগুলোর উচিত একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার পরীক্ষক নিয়োগ করা। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে আরও বেশি যোগ্য করে তুলতে হবে। দেশের অন্যতম একটি জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে শিক্ষা, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয় ঠিকই, কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই নবাগত শিক্ষকগণ ক্লাস নেওয়া, খাতা মূল্যায়ন করার মত কঠিন কাজে যুক্ত হন। বিশেষ করে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ (Foundation Training) পেতে একজন শিক্ষককে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়। শিক্ষা বোর্ডগুলো প্রতিবছর নির্দিষ্ট সংখ্যক পরীক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে যোগ্য এবং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পরীক্ষক তৈরি করে পরীক্ষক খুঁজে না পাওয়া সমস্যার সমাধান করতে পারে। সর্বোপরি, মূল্যায়নকারী শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখতে হবে। যাতে খাতা মূল্যায়ন অভিন্ন এবং ফলাফল আরও নির্ভুল হয়। 

দ্বিতীয়ত, পাবলিক পরীক্ষার হতাশাজনক খাতা বণ্টন সমস্যার সমাধানে শিক্ষা বোর্ডসমূহ জেলাভিত্তিক পরীক্ষক তালিকা প্রণয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানে পরীক্ষকগণকে একত্রিত করে খাতা বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে। একই প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত সময়ে মূল্যায়িত খাতা সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ সামনে আসে- প্রধান পরীক্ষকের নিকট মূল্যায়িত খাতা বছর ধরে ফেলে রাখা হয়, যার জন্য প্রধান পরীক্ষকের একটা স্টোর রুমের প্রয়োজন হয়। এধরনের বিড়ম্বনা থেকে পরীক্ষকদের মুক্ত করতে বোর্ড রেজাল্ট পরবর্তী সময়ে দ্রুততার সাথে মূল্যায়িত খাতাসমূহ সংগ্রহ করতে পারে।

তৃতীয়ত, ন্যায়ভিত্তিক ফলাফল পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। আর তা নির্ভর করে একজন পরীক্ষকের উপর। অসংখ্য পরীক্ষক আছেন যারা এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেন, আবার এমন পরীক্ষকের সংখ্যাও নেহাত কম নেই যারা ২০০ খাতা ৫ দিনে মূল্যায়ন করেন। বোর্ডের উচিত এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন, অযোগ্য পরীক্ষকদের খুঁজে বের করে পরীক্ষক তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। শুধু বাদ দেওয়া যথেষ্ট নয়, যারা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করে বোর্ড তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। 
অন্যদিকে, খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সময় পাওয়া পরীক্ষকদের অধিকার। শিক্ষা বোর্ডের উচিত পরীক্ষকদের ন্যায়ভিত্তিক সময় বরাদ্দ দেওয়া, যাতে তারা প্রতিটা খাতায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে।

সর্বশেষ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডসমূহ আমলে নিতে পারে- খাতা মূল্যায়নের পারিশ্রমিক শ্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমতায়ন করা। খাতা মূল্যায়ন একটি শারীরিক এবং একই সাথে মানসিক পীড়াদায়ক শ্রম। এ ধরনের শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। এবং পেমেন্ট পলিসি হওয়া প্রয়োজন আরও যুগোপযোগী, সহজ ও দ্রুত। জান-প্রাণ দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করার পর (ঐ সময়টাতে একজন পরীক্ষক পরিবারকে সময় পর্যন্ত দিতে পারেন না) পেমেন্ট পাওয়ার জন্য এক বছর অপেক্ষা করা শুধু কঠিনই নয় কষ্টসাধ্যও বটে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, শিক্ষা বোর্ড কেন্দ্রীক যেকোনো কাজের পেমেন্ট পরিশোধে এমন দীর্ঘসূত্রিতার রীতি প্রচলিত রয়েছে।

পাবলিক পরীক্ষার পেমেন্টের ক্ষেত্রে খাতা মূল্যায়ন পরবর্তী সময় থেকে ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের সময় পর্যন্ত সীমায় রাখা প্রয়োজন। পুনর্মূল্যায়নের ১৫-২০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্দিষ্ট পেমেন্ট পরিশোধের ব্যবস্থা করা যায়। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা আমাদেরকে শিক্ষা দেয়- উপযুক্ত পারিশ্রমিক কর্মে সর্বোচ্চ উৎসাহ (Motivation) হিসেবে কাজ করে। 

আরেকটি বিষয় এখানে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে পেমেন্ট পরিশোধের রীতি পরিহার করে ব্যাংকিং চ্যানেলে পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। কারণ, বর্তমানে প্রচলিত পেমেন্ট প্রসেসে দীর্ঘসূত্রিতা, স্বল্প পারিশ্রমিকের উপর হতে উৎসকর ১০% কর্তন, এর উপর মোবাইল ব্যাংকিং চার্জ প্রভৃতি খাতা মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রেষণা (Negative Motivation) হিসেবে কাজ করে। যার ফলাফল হিসেবে এখন খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরীক্ষক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।

সর্বোপরি, রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নে শিক্ষা পদ্ধতির মান সর্বোচ্চকরণের বিকল্প নেই। আর প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষা সম্পর্কিত নীতি বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসমূহ। পাবলিক পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নকরণ, খাতা মূল্যায়ন, ফলাফল প্রদানের মত জটিল কাজসমূহে শিক্ষা বোর্ডের নিকট সারথি হয়ে কাজ করে থাকে- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ। অতএব, শিক্ষা বোর্ডের রুটিন দায়িত্ব সফলতার সাথে সম্পন্ন করতে শিক্ষকদের মত সক্রিয় অংশীদারদের সম্মানজনক মূল্যায়ন করা শিক্ষা বোর্ডের জন্য অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা আশা রাখি শিক্ষা বোর্ডসমূহ প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ ধরনের অচলাবস্থার আশু সমাধান ঘটাবে। 

লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কর্মকর্তা

ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে যুবকের মৃত্যু
  • ০৮ জুন ২০২৬
গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্লান্ট পরিদর্শন করলেন স্থানীয় সরক…
  • ০৮ জুন ২০২৬
বালু ভরাট করতে যুবদল নেতাকে দিতে হবে ১০ লাখ, স্থানীয়রা দিলে…
  • ০৮ জুন ২০২৬
বগুড়ায় ইয়াবাসহ আটক নারীর ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি, ‘সৌন্দর্য দেখ…
  • ০৮ জুন ২০২৬
যুক্তরাজ্যে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ, দ্রুত আ…
  • ০৮ জুন ২০২৬
শেরপুরে নিখোঁজ ৫ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর ৩ জনকে পাওয়া গেল মসজি…
  • ০৮ জুন ২০২৬