ডঃ মোঃ আতিয়ার রহমান © টিডিসি ফটো
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দী জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং অভাবনীয় পরিবর্তনের শতাব্দী। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় যেকোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার হলো তার মানবসম্পদ। আর এই মানবসম্পদকে দক্ষ, যোগ্য এবং যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার প্রধান ক্ষেত্র হলো উচ্চশিক্ষা। উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের চিন্তাভাবনা, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের সর্বোচ্চ স্তর।
বর্তমান চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (Fourth Industrial Revolution - 4IR) যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা, অটোমেশন এবং ইন্টারনেট অব থিংসের (IoT) মতো প্রযুক্তিগুলো প্রচলিত কর্মবাজারকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে।১ এই পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সনাতন রূপ ধরে রাখা আর সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে উচ্চশিক্ষায় ‘উৎকর্ষ’ (Excellence) এবং ‘পেশাদারিত্ব’ (Professionalism) নিশ্চিত করার। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের এক অনিবার্য অপরিহার্যতা। এই প্রবন্ধের লক্ষ্য উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্বের স্বরূপ, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োজনীয়তা, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসমূহ এবং তা উত্তরণের উপায়গুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা।
উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ: ধারণা ও বহুমাত্রিকতা
উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষ বা ‘একাডেমিক এক্সেলেন্স’ বলতে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা জিপিএ-৫ অর্জনকে বোঝায় না। এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া, যা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, মানসম্মত শিক্ষাদান, বিশ্বমানের গবেষণা এবং নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়কে নির্দেশ করে। উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষের প্রধান দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. যুগোপযোগী কারিকুলাম ও শিক্ষাদান পদ্ধতি
শিক্ষার উৎকর্ষের প্রথম শর্ত হলো একটি গতিশীল ও আধুনিক পাঠ্যক্রম (Curriculum)। বর্তমান যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে কারিকুলাম নিয়মিত পরিমার্জন করতে হবে। তত্ত্বীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান, সমস্যা সমাধান শৈলী (Problem-solving skills) এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার (Critical thinking) ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষাদান পদ্ধতি হতে হবে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক (Learner-centric), যেখানে মুখস্থবিদ্যার চেয়ে অনুধাবন এবং প্রয়োগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
যুগোপযোগী কারিকুলাম কেবল উন্নত কোনো দেশের সিলেবাস কপি-পেস্ট করা নয়; এটি স্থানীয় সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক চাহিদা এবং বৈশ্বিক মানের একটি চমৎকার ভারসাম্য। বৈশ্বিক মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বাস্তবমুখী মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তির সমন্বয় নিশ্চিত করতে পারলে একটি টেকসই ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
মৌলিকভাবে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদেরকে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। আর সেটি করতে হলে শক্তভাবে ধারণ করতে হয় কারিকুলামের মূল উপাদানগুলোকে বিশেষ করে:
ক. 'ফোর সিজ' (The 4 Cs) স্কিল ডেভেলপমেন্ট: বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা কাঠামো যেমন Partnership for 21st Century Skills (P21)২ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য ১৩টি দক্ষতার কথা বলে, যার মধ্যে এই ৪টি দক্ষতাকে ভিত্তি ধরা হয়: Critical Thinking বা সমালোচনামূলক চিন্তন যেখানে সমস্যা বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমত; Creativity বা সৃজনশীলতা যেখানে গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা; Collaboration বা সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব যেখানে দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা তৈরি হয়; Communication বা যোগাযোগ দক্ষতা যেখানে কার্যকরভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করা।
খ. হ্যান্ডস-অন ও প্রজেক্ট-বেসড লার্নিং (PBL): যেখানে তত্ত্বীয় জ্ঞানের চেয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে প্রজেক্টের মাধ্যমে শেখে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতিতে জ্ঞান ধরে রাখতে সাহায্য করে।
গ. ব্লেন্ডেড ও টেকনোলজি-নির্ভর লার্নিং: যেখানে শিক্ষাক্লাসরুমের বাইরে বা ভেতরে ডিজিটাল মাধ্যম, এআই (AI) এবং সিমুলেশন ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এটি শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজলভ্য করে তোলে।
ঘ. নিরবচ্ছিন্ন মূল্যায়ন (Continuous Assessment): এই প্রক্রিয়ায় মুখস্থনির্ভর বার্ষিক পরীক্ষার পরিবর্তে শিক্ষার্থীর সার্বিক পারফরম্যান্স, প্রজেক্টের কাজ, এবং প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের কারিকুলামে যুগোপযোগী পরিবর্তন এনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। মোটাদাগে আমার যদি ফিনল্যান্ডের 'ফেনোমেনন-বেসড লার্নিং'৩ (Phenomenon-Based Learning) মডেল, সিঙ্গাপুরের 'আউটকাম-বেসড' এবং 'স্মার্ট নেশন' মডেল, আইবি (IB - International Baccalaureate) মডেলকে উদাহরন হিসাবে গ্রহণ করি তাহলে দেখা যাবে ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় আলাদা কোনো বিষয় (যেমন- পদার্থ বা ইতিহাস) পড়ানো হয় না। বরং কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় বা ঘটনা (যেমন- জলবায়ু পরিবর্তন) কেন্দ্র করে সব বিষয় একীভূত করে শেখানো হয় এবং সেটি বাস্তব জীবনের সাথে শিক্ষার গভীর সংযোগ স্থাপন করে। সিঙ্গাপুরের 'আউটকাম-বেসড' এবং 'স্মার্ট নেশন' মডেল সিঙ্গাপুরের কারিকুলামে সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং আইসিটি (ICT) দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং শিক্ষার্থীদের কর্মক্ষেত্রের সরাসরি চাহিদার সাথে মিলিয়ে কারিকুলাম ডিজাইন করা হয়। আইবি (IB - International Baccalaureate) মডেল 8বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক কারিকুলাম। এটি শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পাশাপাশি 'গ্লোবাল সিটিজেনশিপ' বা বিশ্ব নাগরিক হওয়ার গুণাবলি তৈরি করে।
বিশ্বমডেলগুলো চমৎকার হলেও এগুলো বাস্তবায়নে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে যেমন বাস্তবায়নের জন্য কাঠামো সংকট একটি বড় ইস্যু। আবার অনেক দেশ নতুন কারিকুলাম গ্রহণ করলেও পুরোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি (যেমন- কেবল মার্কস বা জিপিএ-ভিত্তিক পরীক্ষা) থেকে বের হতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ বাড়ে। আবার শিক্ষক সংকট ও প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ন যেখানে আধুনিক কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ভূমিকা গাইড বা মেন্টরের মতো। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের অভাব একটি বড় বাধা। ডিজিটাল বৈষম্য: অনলাইন ও প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষার জন্য যে লজিস্টিক সাপোর্ট বা ইন্টারনেট সুবিধা প্রয়োজন, তা সব শিক্ষার্থীর জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
২. বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবন
বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবন আধুনিক সভ্যতার মেরুদণ্ড, যা মানবজীবনের গুণগত মান উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, জটিল সমস্যার বৈজ্ঞানিক সমাধান এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে এটি বিশ্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। বৈশ্বিক অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, আধুনিক অবকাঠামো এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো ক্ষেত্রগুলোয় যুগান্তকারী উদ্ভাবন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে হলে শিল্প-কারখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে বাংলাদেশও বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম।
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান বিতরণের জায়গা নয়, জ্ঞান সৃষ্টিরও ক্ষেত্র। উচ্চশিক্ষায় উৎকর্ষের প্রধান সূচক হলো গবেষণার মান। গবেষণা ও উদ্ভাবনের মান যাচাইয়ে বিভিন্নরকম বৈশ্বিক সূচক নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কিছু কথা থাকলেও এটা মোটামুটি স্বীকৃত এবং চর্চার অংশ হয়ে দাড়িয়েছে যে, আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনা, মেধাস্বত্ত্ব লাভ এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক সমস্যার সৃজনশীল সমাধান উদ্ভাবনই শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারণ করে। অন্যদিকে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি (Plagiarism) রোধ এবং মৌলিকত্ব নিশ্চিত করা উৎকর্ষের অন্যতম অংশ। আর এসব নিশ্চিতে বেশ কিছু মডেল পচলিত থাকলেও বিশ্বমানের গবেষণা ও উদ্ভাবন নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত 'ট্রিপল হেলিক্স' মডেল অত্যন্ত কার্যকর। এই মডেলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (Academia), শিল্প খাত (Industry) এবং সরকার (Government) একত্রে কাজ করবে এমন ধারনাও অনেক দেশ এবং প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্টিত। আর এ মডেলের কম্পোনেন্টগুলোর সংযোগ এবং পরিধি অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা প্রয়োজন:

ছবি -১: ট্রিপল হেলিক্স মডেল (Etzkowitz, H., & Leydesdorff, L. (Eds.). (1997))৪
ক. মেধা ও অবকাঠামো (শিক্ষা প্রতিষ্ঠান): মৌলিক গবেষণার জন্য উন্নত ল্যাব এবং আন্তঃবিষয়ক (Interdisciplinary) শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা।
খ. বাণিজ্যিকীকরণ (শিল্প খাত): গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব পণ্য ও প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে স্টার্ট-আপ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।
গ. নীতি ও তহবিল (সরকার): গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে জিডিপির একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ এবং মেধাস্বত্ব (IP) সুরক্ষার আধুনিক নীতিমালা প্রণয়ন.এই মডেলটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক জ্ঞান অর্থনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
৩. যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজ
শিক্ষকদের মেধা, যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার ওপরই শিক্ষার মান নির্ভর করে। উৎকর্ষ অর্জনের জন্য শিক্ষকদের নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশগ্রহণ এবং আধুনিক শিক্ষণ প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে হবে। শিক্ষকদের মূল্যায়ন কেবল তাদের জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নয়, বরং তাদের গবেষণা ও শিক্ষাদানের দক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রখ্যাত লেখক ও বুদ্ধিজীবি আহমেদ ছফা ‘যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজ’ বিষয়ক ভাবনা তার একাধিক লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরেছেন যেগুলো মূলত বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক তীক্ষ্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ ব্যবচ্ছেদ। ছফা সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকাকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তাঁর লেখায় সমকালীন শিক্ষক সমাজের প্রতি অন্ধ স্তুতি নয়, বরং গভীর চাবুক ও গঠনমূলক সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে।
ছফার মতে, একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদানকারী নন, বরং তিনি সমাজের বিবেক এবং আলোকবর্তিকা। কিন্তু স্বাধীনতোত্তর বাংলাদেশে ছফা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে লক্ষ্য করেছেন যে, শিক্ষক সমাজ তাঁদের সেই মহান নৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। শিক্ষকেরা যখন জ্ঞানচর্চা ও আদর্শিক লড়াই ছেড়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তি, উপদলীয় কোন্দল, উপাচার্য পদের লোভ এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে পড়েন, তখন গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা ধসে পড়ে। তিনি দেখিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যখন গবেষণার চেয়ে দলীয় প্রমোশনের পেছনে ছোটেন, তখন তাঁরা শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো নৈতিক উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন না।'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস'৫ গ্রন্থে ছফা দেখিয়েছেন কীভাবে এ দেশের বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকেরা জাতীয় সংকটে মেরুদণ্ডহীন ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, আমাদের শিক্ষকেরা মূলত বস্তুগত সুবিধা ও ক্ষমতার লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত। ছফার মতে, প্রকৃত শিক্ষক সমাজ হবেন সমাজের বিবেক। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষকেরা নিজেদের জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশ বাদ দিয়ে দলীয় রাজনীতি ও বৈষয়িক চিন্তায় মগ্ন হয়েছেন। ফলে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক তৈরির প্রক্রিয়াটিই ব্যাহত হয়েছে।
আহমেদ ছফা তাঁর তীক্ষ্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী এবং শিক্ষক সমাজের সুবিধাবাদী চরিত্র ও নৈতিক স্খলনকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। বিশেষ করে 'গাভী বিত্তান্ত'৬ উপন্যাস এবং 'বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' প্রবন্ধগ্রন্থে তিনি যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক সমাজের অনুপস্থিতি এবং এর বিপরীতে গড়ে ওঠা এক পচনশীল শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। এই চিন্তারই এক চরম ব্যঙ্গাত্মক ও সাহিত্যিক রূপান্তর আমরা দেখি 'গাভী বিত্তান্ত' উপন্যাসে। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির এক নগ্ন দলিল। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র উপাচার্য আবু জুনায়েদ একজন মেরুদণ্ডহীন এবং অতি সাধারণ শিক্ষক, যিনি কোনো যোগ্যতার বলে নয়, বরং নানামুখী চাটুকারিতা ও সমীকরণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ পদে আসীন হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এখানে জ্ঞানচর্চা ছেড়ে উপাচার্যের সুনজরে থাকা এবং নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। ছফা এখানে দেখিয়েছেন, যেখানে শিক্ষকেরা হবেন মানুষ গড়ার কারিগর, সেখানে তারা ব্যস্ত গরুর দুধের ব্যবসার মতো সংকীর্ণ স্বার্থ নিয়ে।
তবে ছফার এই সমালোচনা কেবল একপাক্ষিক ক্ষোভ নয়, এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক সহমর্মিতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্র নিজেই শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষক সমাজকে যখন পেটের দায়ে বা রাজনৈতিক প্রভাবে আপস করতে হয়, তখন তাঁদের পক্ষে ‘নিবেদিতপ্রাণ’ হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ছফা তাঁর লেখনীতে এটাই ফুটিয়ে তুলেছেন যে, উপযুক্ত বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়া কেবল মুখের কথায় যোগ্য শিক্ষক সমাজ তৈরি সম্ভব নয়।
এ জাতীয় সমালোচনা শুনতে যত তিক্তই হোকনা কেন, বস্তুত এটি আমাদের চোখ খুলে দেয়। তিনি শিক্ষক সমাজের অবক্ষয়কে নির্মমভাবে তুলে ধরেছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকদের ভেতরের আত্মবিবেককে জাগিয়ে তোলা। তাঁর চোখে, একটি মেরুদণ্ডসম্পন্ন স্বাধীনচেতা ও জ্ঞানতপস্বী শিক্ষক সমাজই পারে একটি পরাধীন মানসিকতার জাতিকে প্রকৃত মুক্তির পথ দেখাতে।
তবে ছফার লেখা যত রুড়ই হোক না কেন, আমরা আজও এরকম শত শত শিক্ষক দেখি এবং এরকম শিক্ষকদের প্ররোরচনাতেই বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী শাসনের কিংবদন্তী শেখ হাসিনা ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ তৈরিতে উদ্যত হয়েছিলেন। ক্লাস ছেড়ে রাজনীতির মঞ্চে, উপাচার্যের পরিবর্তে দলীয় সভাপতির পদকে প্রাধান্য দেওয়া, মানহীন ক্লাসের ব্যঞ্জনায় শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা, কালেভদ্রে বিভাগের বারান্দায় দেখা পাওয়া শিক্ষকদের সংখ্যা আজও নেহায়েত কম নয়। ফলে অবস্থা বদলাবার অভিপ্রায়ে এ আলোচনার তীক্ষ্ণ অংশটুকুকে এ লেখনীতে সামগ্রিকতার বিচারে অন্তর্ভূক্ত করার মধ্যে সমাজের চোখ খুলে দেবার প্রয়াসকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
৪. উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো
একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের অবকাঠামোগত পরিচয় পুনর্কল্পনা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রযুক্তির নিরলস অগ্রগতির সাথে সাথে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জগতে কোর্সেরা (Coursera), এডএক্স (edX) এবং ইউডাসিটির (Udacity) মতো ম্যাসিভ ওপেন অনলাইন কোর্স (MOOCs) প্ল্যাটফর্মের আবির্ভাব ঘটে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো মানসম্মত শিক্ষার সুযোগকে গণতান্ত্রিক করেছে, যার ফলে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন স্থানের শিক্ষার্থীরা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কোর্সগুলোতে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছে। এগুলো এক ধরনের অবকাঠামোগত রুপান্তরের ফলাফল। যখন Massachusetts institute of technology (MIT)’র OpenCourseWare (OCW) initiative, University of Melbourn ‘র digital learning hub, এবং Stanford university’র The virtual human interaction lab (VHIL) এর কথা বিবেচনায় আসে এবং তার ইম্প্যাক্ট পরিমাপ করা হয়, তখনই বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত রূপান্তরমূলক পরিবর্তনগুলোকে নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা শুরু হয়। ভৌত অবকাঠামো এবং ডিজিটাল বিবর্তনের প্রসারিত বিশ্বের মধ্যে সমন্বয়কে ভীষণ অগ্রগন্য করা হয়। কারন, ভৌত ও ডিজিটাল অবকাঠামোর সমন্বিত প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ বৃদ্ধি করে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও পথচলার ক্ষেত্রে প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি সংবেদনশীল, টেকসই ও দূরদর্শী শিক্ষাগত রূপরেখা তৈরিতেও সাহায্য করে। সুতরাং, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত একটি সামগ্রিক, অভিযোজনযোগ্য ও সমৃদ্ধ শিক্ষাঙ্গনের জন্য ভৌত অবকাঠামো ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের মধ্যকার মিথোস্ক্রিয় সম্পর্ককে আলোকিত করবার মাধ্যমে অর্থনৈতিক গতিপথের উপর এর সম্মিলিত প্রভাব সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদানই হতে পারে এ সময়ের তাৎপর্যপূর্ণ চাহিদা। উপাদান হিসাবে আধুনিক লাইব্রেরি, ই-রিসোর্স, সুসজ্জিত ল্যাবরেটরি, উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের (Co-curricular activities) পর্যাপ্ত সুযোগ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষের পরিবেশ তৈরি করে যেখানে একটি সমৃদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।
উচ্চশিক্ষায় পেশাদারিত্ব: অর্থ ও পরিধি
পেশাদারিত্ব বা ‘প্রফেশনালিজম (professionalism)৭’ হলো কর্মক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নৈতিকতা, দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা এবং জবাবদিহিতা প্রদর্শন করা। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব মূলত দুটি স্তরে বিভক্ত: প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রশাসনিক স্তরে পেশাদারিত্ব এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে পেশাদারি দক্ষতার বিকাশ।
১. প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়মকানুনের কঠোর প্রয়োগই হলো প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব। এর মধ্যে রয়েছে:
২. শিক্ষার্থীদের পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা
উচ্চ শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, তখন তাদের মধ্যে যেন পেশাদারি আচরণ প্রতিফলিত হয়, তা নিশ্চিত করা উচ্চ শিক্ষার অন্যতম দায়িত্ব। এর মধ্যে রয়েছে:
কেন এটি সময়ের অনিবার্য অপরিহার্যতা?
বর্তমান সময়ে উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্বের দাবি কোনো আকস্মিক বিষয় নয়। এটি বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ নানা পরিবর্তনের যৌক্তিক পরিণতি। এর প্রধান কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স এবং ডেটা সায়েন্স মানুষের বহু প্রচলিত চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। প্রথাগত কেরানি বা সাধারণ দক্ষতার কাজগুলো দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এই যুগে টিকে থাকতে হলে মানুষের এমন কিছু দক্ষতার প্রয়োজন যা মেশিন প্রতিস্থাপন করতে পারে না—যেমন জটিল সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (Emotional Intelligence) । উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ না থাকলে আমরা এই নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করতে পারব না।
২. ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সদ্ব্যবহার
যখন একটি দেশে কর্মক্ষম (working-age) মানুষ (১৫-৫৯ বছর) বাকিদের (non-working age people) চেয়ে বেশি হয়, তখন দেশটির জন্যে সূচিত হয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা। এই অবস্থাকে বলা হয় হয় 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'৮। বাংলাদেশে এখন এই বয়স শ্রেণির মানুষ জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ; উপরন্তু জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। ফলে বাংলাদেশের জন্যে সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অনন্য সাধারণ সুযোগ। একারনেই বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বর্তমান সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তরুণ (Demographic Dividend) । কিন্তু এই তরুণ সমাজ যদি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও পেশাদারি দক্ষতায় বলীয়ান হতে না পারে, তবে এই লভ্যাংশ দেশের জন্য একটি বিশাল বোঝা বা 'ডেমোগ্রাফিক ডিজাস্টার'-এ পরিণত হতে পারে। তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে এবং তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে উচ্চ শিক্ষায় পেশাদারিত্বের কোনো বিকল্প নেই। আর পেশাদারি চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে গতানুগতিকতার বাক্স-বন্দি ক্যারিয়ার প্ল্যানের জায়গায় নতুন করে সাথান পাবে 'আউট অফ দ্য বক্স' ভাবনা; প্রযুক্তি ও ভাষাগত দক্ষতার ভিত্তিতে তৈরি হবে নতুন মার্কেটপ্লেস।
৩. বিশ্বায়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা
বিশ্বায়নের এই যুগে শ্রমবাজার এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশের ভেতরের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেমন বিশ্বমানের কর্মী খুঁজছে, তেমনি আমাদের গ্র্যাজুয়েটদেরও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং আমাদের ডিগ্রির বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে উচ্চ শিক্ষার মানকে আন্তর্জাতিক স্তরে (যেমন: Washington Accord বা ঢাকা ঘোষণার মানদণ্ড অনুযায়ী) উন্নীত করা জরুরি। আমাদের দেশের এ্যাক্রিডিটেশন প্রক্রিয়া চলছে খুবই ঢিমে তালে অথচ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট কোর্স এবং ডিগ্রিগুলো যখন কোনো অনুমোদিত অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল (যেমন—বাংলাদেশের বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল – BAC৯) দ্বারা স্বীকৃত হয়, কেবল তখনই প্রমাণিত হয় যে প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার মানদণ্ড, দক্ষ শিক্ষক মণ্ডলী, উন্নত অবকাঠামো এবং আধুনিক কারিকুলাম বজায় রাখছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এই স্বীকৃতি একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে; এটি তাদের নিশ্চিত করে যে তারা যে ডিগ্রি বা কোর্সটি সম্পন্ন করছে, তার বাজারমূল্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। চাকুরির বাজারে নিয়োগকর্তারা অ্যাক্রিডিটেড ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের বেশি অগ্রাধিকার দেন, কারণ এটি প্রার্থীর যোগ্যতার একটি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। এছাড়া, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ক্রেডিট ট্রান্সফার বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাক্রিডিটেশন থাকা একটি আবশ্যিক শর্ত। সংক্ষেপে, অ্যাক্রিডিটেশন ছাড়া একটি ডিগ্রীর আন্তর্জাতিক বা জাতীয় বাজারে গ্রহণযোগ্যতা থাকে না, যা শিক্ষার্থীর সময় ও অর্থ দুটোই ঝুঁকিতে ফেলে।
৪. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জন হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্য মুক্তি, জেন্ডার সমতা, মানসম্মত শিক্ষা ও জলবায়ু সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে একটি উন্নত ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার ১৭টি বৈশ্বিক লক্ষ্যের সমষ্টি । জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৪ নম্বর লক্ষ্যটি হলো ‘মানসম্মত শিক্ষা’ (Quality Education) । মানসম্মত উচ্চ শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG 8), শিল্প ও উদ্ভাবন (SDG 9), এবং অসমতা হ্রাস (SDG 10) অর্জন করা অসম্ভব। তাই রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের স্বার্থেই উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ আনা সময়ের দাবি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে "কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না" এই মূলমন্ত্র বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ অর্থাৎ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও সাধারণ মানুষের যৌথ প্রচেষ্টা যুক্ত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ পর্যাপ্ত অর্থায়ন সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
বর্তমান উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জসমূহ
উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা সর্বজনস্বীকৃত হলেও আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ কিছু গভীর সংকট ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোকে চিহ্নিত না করে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

ছবি-২: উচ্চ শিক্ষায় চ্যালেঞ্জসমুহ (লেখকের নিজস্ব তৈরি)।
১. একাডেমিক ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব (Academia-Industry Mismatch)
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে তাত্ত্বিক জ্ঞান বা ডিগ্রি দিচ্ছে, তার সাথে বর্তমান কর্মবাজারের বাস্তব চাহিদার একটি বড় অমিল রয়েছে কারন কাজের জন্য সনদের তুলনায় দক্ষতার প্রয়োজন অধিকতর। কিন্তু সেকেলে পাঠ্যক্রম, বাস্তব অভিজ্ঞতার ঘাটতি, এবং সর্বোপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধিদের সাথে শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সাথে যোগাযোগের অভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদার সম্পর্কে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে গ্যাপ তৈরি হয়। কাজেই জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে মেলবন্ধন না থাকায় তরুণরা কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ফলস্বরূপ, প্রতি বছর হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট উচ্চ ডিগ্রি নিয়েও বেকার থাকছেন, অথচ দেশের ব্যবসায়িক ও শিল্প খাতগুলো দক্ষ লোকবলের অভাবে বিদেশ থেকে উচ্চ বেতনে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করছে। এই সমন্বয়হীনতা উচ্চ শিক্ষার পেশাদারিত্বের সবচেয়ে বড় ঘাটতি।
২. গবেষণা খাতের অবহেলা ও ফান্ডের স্বল্পতা
আমাদের জাতীয় বাজেটের দিকে তাকালে গবেষণা খাতের প্রতি অবহেলার স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। উন্নত দেশগুলো যেখানে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ২ থেকে ৪ শতাংশ গবেষণায় ব্যয় করে, সেখানে আমাদের দেশে এই হার ১ শতাংশেরও নিচে। ফলে দেশের চাহিদার আলোকে গবেষণা প্রয়োজন এবং অর্থায়ন না হওয়াতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত তাত্ত্বিক শিক্ষাদানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ খুবই সীমিত। আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় বাজেটের খুব সামান্য অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। যেটুকু বরাদ্দ থাকে, তারও সঠিক ব্যবহার অনেক সময় হয় না। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগারের অভাব, জার্নাল সাবস্ক্রিপশনের সীমাবদ্ধতা এবং গবেষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা না থাকায় মেধা পাচার (Brain Drain) বাড়ছে।
৩. মুখস্থনির্ভর মূল্যায়ন পদ্ধতি
আমাদের পরীক্ষা পদ্ধতি এখনো বহুলাংশে তথ্য মুখস্থ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। আপাত দৃষ্টিতে স্কুল ও কলেজ লেভেলে কিছু কম্প্রিহেনসিভ এবং ক্রিয়েটিভ প্রশ্ন করবার অপশন চালু হলেও সামগ্রিকভাবে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষা পদ্ধতির গুণগত পরিবর্তন না হওয়াতে শিক্ষার্থীরা সাময়িকভাবে ভালো সিজিপিএ (CGPA) পেলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে গিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision making) বা জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় (Critical analysis and problem solution) ব্যর্থ হয়। সফট স্কিলস (Soft skills) যেমন—নেতৃত্ব (leadership), দলগত কাজ (Team work), এবং উপস্থাপনা (presentation) দক্ষতার মূল্যায়নের সুযোগ এখানে সীমিত। শিক্ষার্থীরা স্টান্ডার্ড এটিকেট (শিষ্টাচার) এবং ম্যানার (আচরণ) এর দিক থেকে সারা দুনিয়ার চাইতে অনেক পিছনে। ফলে আধুনিক চাকুরীর বাজারে সেলফ মোটিভেশন, এমপ্যাথি, কঠোর পরিশ্রম ইত্যাকার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের চাহিদার তুলনায় আমাদের ছাত্রছাত্রীরা অনেকাংশে পিছিয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন
১. সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় অন্যদিকে ;
২. বিশাল সিলেবাস হুবহু মনে রাখার চাপ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র মানসিক চাপ ও পরীক্ষার ভীতি তৈরি করে;
৩. তৈরি হয় বাস্তবমুখী দক্ষতার অভাব; ও
৪. ছাত্রছাত্রীরা সিনিয়রদের নোট কিংবা কখনও কখনও নির্দিষ্ট ফটোকপির দোকানের উপর নির্ভর করে।
আমরা মনে করি, আধুনিক শিক্ষায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলো মুখস্থনির্ভর পরীক্ষা থেকে সরে এসে মূল্যায়নের যে বিকল্প ধারণা অর্থাৎ 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' (Competency-based Assessment), ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment), সারা বছর ধরে ক্লাসের কাজ, প্রজেক্ট, উপস্থাপনা, এবং সমস্যা সমাধানমূলক পরীক্ষা (Problem-solving Tests) মাধ্যমে মূল্যায়ন করার পদ্ধতি চালু করেছে তার প্রায়োগিকতা যাচাই করা প্রয়োজন ।
৪. রাজনীতিকীকরণ এবং সুশাসনের অভাব
উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক সময়ই মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রাধান্য পায়। শিক্ষক নিয়োগ, উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তে পেশাদারিত্বের চেয়ে দলীয় বিবেচনা মুখ্য হয়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক পরিবেশ ধ্বংস হয়। ছাত্ররাজনীতির নেতিবাচক রূপ এবং সেশনজট শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে। সুতরাং জাতীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তির পরিবর্তে কল্যাণমূলক কাজের প্রতিযোগিতা (competition for welfare work), সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ এবং তার স্বীকৃতি, অধিকার-ভিত্তিক সংগঠন চালু করা, সবক্ষেত্রে আধুনিক স্কেলিং পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে সকল নিয়োগ, পদোন্নতি, নমিনেশন, দায়িত্বপ্রদানের সংস্কৃতি চালু করা গেলে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে নিশ্চিত শৃঙ্খলা ফেরা সহজ।
উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণের কৌশল
বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠে উচ্চ শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট, দীর্ঘমেয়াদি এবং সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নিচে কিছু কার্যকর কৌশল প্রস্তাব করা হলো:
১. আউটকাম বেসড এডুকেশন (OBE) ও কারিকুলাম আধুনিকায়ন
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সনাতন শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বের হয়ে 'আউটকাম বেসড এডুকেশন' বা ফলাফল-ভিত্তিক শিক্ষা মডেল পুরোপুরি গ্রহণ করতে হবে। এই পদ্ধতিতে একজন শিক্ষার্থী কোর্স শেষে ঠিক কী কী দক্ষতা অর্জন করবে, তা আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট থাকে। কারিকুলাম প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের (Industry Experts) যুক্ত করতে হবে, যাতে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি তৈরি হয়।
২. ইন্টার্নশিপ ও ব্যবহারিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা
প্রতিটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সে অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের প্রাতিষ্ঠানিক ইন্টার্নশিপ বা ফিল্ডওয়ার্ক বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার মাঝেই বাস্তব কর্ম পরিবেশের অভিজ্ঞতা লাভ করবে। 'কো-অপারেটিভ এডুকেশন' মডেলের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানার মধ্যে যৌথ চুক্তি করা যেতে পারে।
ছবি-৩: কো অপারেটিভ এডুকেশন মডেল (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি)
৩. গবেষণা ও উদ্ভাবন পরিবেম তৈরি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি
একদিকে গবেষণা গুলো যেমন জাতীয় প্রয়োজন-ভিত্তিক হতে হবে, তেমনি গবেষণা ফলাফলগুলো মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের জন্য সেগুলোর প্যাটেন্ট এবং আইপি প্রক্রিয়া সহজতর হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেডিকেটেড অফিস প্রয়োজন যারা গবেষকদের উদ্ভাবনগুলোর স্বত্তাধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্টার্টআপ, ইনকিউবেশনের সুযোগ এবং জাতীয় বাজেটে উচু মাত্রার গবেষণা করা এবং সেগুলোর প্রকাশনা ব্যয় নির্বাহ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাজেটে গবেষণার জন্য বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতকে (Corporate Sector) গবেষণায় অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ করতে কর রেয়াত বা অন্য কোনো সুবিধার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'ইনকিউবেশন সেন্টার' ও 'স্টার্টআপ ল্যাব' স্থাপন করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণা ব্যবসায়িক রূপ পেতে পারে।

ছবি-৪: গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মেধাস্বত্ত্ব সমন্বয় মডেল (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি) ।
৪. শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন (Faculty Development)
উচ্চশিক্ষায় পেশাগত উন্নয়ন একটি কৌশলগত এবং গতিশীল প্রক্রিয়া যা প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য এবং শিক্ষকের ব্যক্তিগত দক্ষতার মধ্যে সমন্বয় ঘটায়। তবে উচ্চতর স্তরে শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং তার প্রতিফলন প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক মডেলে ধারাবহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে যেগুলোকে কয়েকেটি আলাদা আলাদা উপভাগে আলোচনা করা যেতে পারে।:
১. বহুমাত্রিক পরিধি (The Four Pillars):
পেশাগত উন্নয়ন: শিক্ষণ পদ্ধতি, মূল্যায়ন কৌশল এবং প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার শেখা।
ব্যক্তিগত উন্নয়ন: কাজের চাপ সামলানো, নেতৃত্ব গুণ এবং ক্যারিয়ারের লক্ষ্য নির্ধারণ।
প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি, নীতি নির্ধারণ এবং সাংগঠনিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
গবেষণা উন্নয়ন: অনুদান পাওয়ার কৌশল, গবেষণা পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
২. আধুনিক শিক্ষণ মডেল (Pedagogical Shifts):
বক্তৃতা পদ্ধতি (Lecturette method) থেকে বের হওয়া: উচ্চতর ধারণায় শিক্ষকগণকে প্রথাগত 'বক্তৃতা পদ্ধতি (Lecturette method) ' থেকে বের হয়ে ইন্টার্যাকটিভ পদ্ধতির দিকে শিফট করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক শিক্ষা (student-centered): শ্রেণিকক্ষকে শিক্ষক-নিয়ন্ত্রিত না রেখে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক করে তোলা।
প্রযুক্তির একীকরণ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) দক্ষতার সাথে ব্যবহার করা।
ফ্লিপড ক্লাসরুম: তাত্ত্বিক বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা বাড়িতে পড়বে এবং ক্লাসে সমস্যা সমাধান করবে।
৩. ধারাবাহিক প্রতিফলন (Reflective Practice):
আত্ম-মূল্যায়ন: নিজের ক্লাসের রেকর্ডিং দেখে বা ডায়েরি লিখে নিজের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করা।
সহকর্মী মূল্যায়ন: অন্য অভিজ্ঞ শিক্ষকদের ক্লাসে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের গঠনমূলক মতামত নেওয়া।
শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক: সেমিস্টার শেষে শিক্ষার্থীদের সৎ মতামত বিশ্লেষণ করে শিক্ষণ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব (Institutional Impact):
অ্যাক্রেডিটেশন: আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি (যেমন- AACSB, ABET) পেতে সাহায্য করে।
শিক্ষার্থীদের সাফল্য: দক্ষ শিক্ষকের ছোঁয়ায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ে।
গবেষণা সংস্কৃতি: বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন জ্ঞান তৈরি এবং উদ্ভাবনের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
তবে মোটাদাগে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ‘পেডাগোজি’ (Pedagogy বা শিক্ষাদান পদ্ধতি) এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, শিক্ষকদের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নের জন্য শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক (Student Feedback System) চালু করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবী। মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি এবং গবেষণার জন্য বিশেষ বোনাস বা পুরস্কারের ব্যবস্থা করে পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরী।
৫. উচ্চ শিক্ষা মান নিশ্চিতকরণ সেল (IQAC)-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধি
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল' (IQAC)-কে শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত সেলফ-অ্যাসেসমেন্ট বা আত্ম-মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার মান তদারকি এবং ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হবে।
অগ্রযাত্রার রোডম্যাপ: একটি তুলনামূলক চিত্র
উচ্চ শিক্ষায় সনাতন ধারা থেকে আধুনিক ও পেশাদার ধারায় রূপান্তরের জন্য কী কী পরিবর্তন প্রয়োজন, তা নিচের সারণির মাধ্যমে সংক্ষেপে দেখা যেতে পারে:
টেবিল-১: উচ্চ শিক্ষায় সনাতন বনাম আধুনিক ও পেশাদারী ধারা।
|
সূচক |
প্রচলিত বা সনাতন ধারা |
উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্বের আধুনিক ধারা |
|
শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু |
শিক্ষক ও মুখস্থনির্ভর পাঠদান |
শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক শিখন |
|
কারিকুলাম |
তত্ত্বীয় ও বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত |
গতিশীল, আধুনিক এবং ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার সাথে সংগতিপূর্ণ |
|
গবেষণা |
নামমাত্র বা কেবল পদোন্নতির জন্য |
মৌলিক, আন্তর্জাতিক মানের এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানকারী |
|
শিক্ষকদের বেতন ভাতা |
গতানুগতিক |
আলাদা স্কেল করা/ইনসেনটিভ প্রদান করা |
|
মূল্যায়ন পদ্ধতি |
বার্ষিক/সেমিস্টার শেষে লিখিত পরীক্ষা |
অবিরত মূল্যায়ন (Continuous Assessment) ও ব্যবহারিক প্রয়োগ |
|
লক্ষ্য |
শুধু একটি সনদের (Degree) অর্জন |
দক্ষ, নৈতিক এবং বৈশ্বিক কর্মক্ষম মানবসম্পদ তৈরি |
উপসংহার
উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্ব অর্জন কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক সমাজ, শিক্ষার্থী এবং কর্পোরেট খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
আমরা যদি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র (Knowledge-based Economy) গঠন করতে চাই, তবে উচ্চ শিক্ষাকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতেই হবে। সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে; চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জোয়ার অলস বসে থাকার সুযোগ দিচ্ছে না। আজ যদি আমরা উচ্চ শিক্ষায় উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক বিশাল মেধা-শূন্যতা তৈরি হবে। তাই বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ জয় করে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে উচ্চ শিক্ষার খোলনলচে বদলে একে উৎকর্ষ ও পেশাদারিত্বের আলোকবর্তিকায় রূপান্তর করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় এবং অনিবার্য অপরিহার্যতা।
লেখক: অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক উপাচার্য, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
তথ্যসূত্র:
১. Anthea Mulakala. The Fourth Industrial Revolution and the Future of Work: Implications for Asian Development Cooperation. 2019 Asian Approaches to Development Cooperation. KDI School of Public Policy and Management, 263, Namsejong-ro, Sejong-si, 30149, Korea।
২. Partnership for 21st Century Skills (P21), ন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন (NEA) এবং P21 এর গাইডলাইন ও পলিসি পেপার, ২০০২।
৩. Viviana Nielsen and Anna Davies. The What, Why, and How of Phenomenon Based Learning. Educator Insights, Curriculum Development, October 30, 2018.
৪. Etzkowitz, H., & Leydesdorff, L. (Eds.). (1997). Universities and the Global Knowledge Economy: A Triple Helix of University-Industry-Government Relations. Pinter.
৫. আহমদ ছফা, বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস' (সাম্প্রতিক বিবেচনা:বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস), মূল ১৯৭২. খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানী।
৬. আহমদ ছফা, গাভী বৃত্তান্ত, সন্দেশ প্রকাশনী, ১৯৯৫।
৭. ব্রিটানিকা বিশ্বকোষ (Encyclopædia Britannica)।
৮. https://article.quantummethod.org.bd/bn/detail/c0e6cae6-0996-11ec-b830-7559b4ea6c1c ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' সৃষ্টি করেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সমূহ সম্ভাবনা; এর সদ্ব্যবহারে আপনি তৈরি তো?
৯. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৭-এর ধারা ও নির্দেশনাবলী।