এইচএসসিতে বোর্ডসেরা, জবিতে সেরা বিভাগে—১৮তম বিজেএসে জজ হলেন শান্তু

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ AM
মোস্তাফা আহমেদ শান্তু

মোস্তাফা আহমেদ শান্তু © টিডিসি ফটো

নীলফামারীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক পরিবারের সন্তান মোস্তাফা আহমেদ শান্তু। বাবা কৃষক, মা গৃহিণী। সেই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে শিক্ষাজীবনে একের পর এক সাফল্য অর্জন করে এবার বিচারক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের এই শিক্ষার্থী। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর বুধবার ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবর পান শান্তু। তবে এই সাফল্যের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন তিনি।

নীলফামারীর প্রত্যন্ত অঞ্চলেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন শান্তু। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। প্রায় প্রতিটি শ্রেণিতেই প্রথম হওয়ার ধারাবাহিকতা ছিল তার। পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধাতালিকায় ১৪তম স্থান অর্জন করেন তিনি।

এরপর এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন শান্তু। সেখান থেকেই আসে তার শিক্ষাজীবনের অন্যতম বড় সাফল্য। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।

এই ফলাফল শুধু একাডেমিক অর্জনই ছিল না, বরং তার সামনে নতুন একটি স্বপ্নের দরজাও খুলে দেয়। শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা এবং আইন বিষয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া আগ্রহ থেকেই আইন পড়ার স্বপ্ন দেখেন শান্তু।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তবে লক্ষ্য ছিল আইন পড়া। সেই লক্ষ্য থেকেই শেষ পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আরও পড়ুন: ডাক্তার হবার ব্যর্থতা থেকে বিচারকের স্বপ্ন, বিজেএসের প্রথম ভাইভাতেই সফল আয়েশা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগেও নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন শান্তু। অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় এবং মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে চলে আসা মেধার ধারাবাহিকতা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও ধরে রাখেন।

একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি তার সামনে তখন আরেকটি বড় স্বপ্ন বিচারক হওয়া। সেই স্বপ্ন থেকেই জুডিশিয়ারির প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। শখের বশে ১৭তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিলেও তখন মাস্টার্সের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার চাপ ছিল। ফলে জুডিশিয়ারির প্রস্তুতির চেয়ে মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষায় বেশি মনোযোগ দেওয়ায় ১৭তম জুডিশিয়ারিতে ব্যর্থ হন তিনি।

তবে এখানেই থেমে থাকেননি শান্তু। পরবর্তীতে নতুন উদ্যমে শুরু করেন প্রস্তুতি এবং ১৮তম জুডিশিয়ারির জন্য আরও পরিকল্পিত ও গভীরভাবে প্রস্তুতি নেন। এবার লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি রাখা যাবে না।

কিন্তু ঠিক তখনই সামনে আসে সবচেয়ে কঠিন বাধা। ১৮তম জুডিশিয়ারির প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মাত্র ২০ দিন আগে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন শান্তু। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। শারীরিক দুর্বলতা, অসুস্থতা ও সামনে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

তবে অসুস্থতার মধ্যেও প্রস্তুতি চালিয়ে যান তিনি। শান্তু বলেন, ‘রিটেনের আগের দুই মাস দিনে গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি। আর স্টুডেন্ট লাইফে আমার কখনোই বিকালে ঘুমানোর সুযোগ হয়নি, হয়তো দুপুরের খাওয়ার পর মসজিদে ৩০ মিনিট শুয়ে থেকেছি কোনোদিন।’

নিজের আত্মবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে পরীক্ষায় অংশ নেন শান্তু এবং প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর শুরু হয় আরও কঠিন অধ্যায়। সামনে ছিল টানা প্রায় ১০ দিনের পরীক্ষা। ডেঙ্গুর ধকল তখনো পুরোপুরি কাটেনি। শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় একের পর এক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় তাকে। তবুও লক্ষ্য থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে যাননি।

এই কঠিন সময়ে তার প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল পরিকল্পনা। শান্তু বলেন, প্রতিদিনের পাশাপাশি মাসভিত্তিক পড়াশোনার লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন তিনি। লাইব্রেরিতে যাওয়ার আগেই ঠিক করে রাখতেন সেদিন কী কী পড়বেন। এরপর নির্ধারিত বিষয়গুলো শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। পড়া শেষ হলে কোন কোন লক্ষ্য পূরণ হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে রাখতেন।

তার কাছে এই ছোট ছোট লক্ষ্যই বড় প্রস্তুতিকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম ছিল। একদিনে কতটা পড়া হলো, মাস শেষে কোথায় পৌঁছানো গেল সবকিছুর হিসাব রাখতেন তিনি।

১৮তম বিজেএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার খবরটি নিশ্চিত হতেই প্রথমে মাকে ফোন করেন শান্তু। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, পরিশ্রম ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে পাওয়া এই সাফল্যের খবরটি মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তটি তার কাছে হয়ে ওঠে বিশেষ এক অনুভূতির।

ফোনের ওপাশে মাকে খবরটি জানাতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শান্তু নিজেও তখন আনন্দের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি। জীবনের সবচেয়ে সুখকর মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে শান্তু বলেন, মাকে ফোন করে যখন জানিয়েছিলেন, ‘আমি জজ হয়েছি’, তখন তার নিজের চোখে যেমন আনন্দের অশ্রু ছিল, তেমনি মায়ের চোখেও ছিল আনন্দের কান্না। তার কাছে সেই মুহূর্তটিই জীবনের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত।

শান্তুর এই সাফল্যের পেছনে শুধু তার নিজের পরিশ্রম নয়, রয়েছে পরিবার, শিক্ষক, স্বজন ও এলাকাবাসীর দোয়া ও প্রত্যাশা। শান্তু বলেন, মা-বাবা, ভাই-বোন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এবং এলাকার মানুষ সবসময় তাকে দোয়া করেছেন, যেন তিনি সফল হতে পারেন। তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরে এবং তার প্রতি তাদের বিশ্বাসের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

জজ হওয়ার স্বপ্ন অবশ্য তার নিজেরও ছিল। দীর্ঘদিনের সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ায় মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন শান্তু। জুনিয়রদের পরামর্শ দিয়ে শান্তু বলেন, ‘প্রতিদিন পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়তে হবে। শুধু আইন পড়লেই হবে না, আইনকে বুঝতে হবে। প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে বোঝার পাশাপাশি Bare Act-এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’ আইন শিক্ষার্থীদের Bare Act বারবার পড়ার পাশাপাশি নিজের হাতে হ্যান্ডনোট তৈরি করে নিয়মিত রিভিশন দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

শুধু আইন নয়, সাধারণ বিষয়গুলোও গুছিয়ে পড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শান্তু। তিনি বলেন, জুডিশিয়ারির মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রস্তুতিকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া এবং নিয়মিত অনুশীলন ও রিভিশন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক পরিবারের সেই ছেলেটি এখন সিভিল জজ হিসেবে নতুন দায়িত্বের সামনে দাঁড়িয়ে। তবে সাফল্যের এই জায়গায় পৌঁছেও থেমে যেতে চান না শান্তু। তার পরবর্তী স্বপ্ন একজন ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করা।

আরও দুই বিভাগ চালুর অনুমোদন পেল নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়লেন সাদমান, ওপেনিংয়ে নাঈম; শুরুতেই বিপাকে…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
পাঁচটি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে ফাইফার, অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তির …
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে নিয়োগ, আবেদন ২ ডিসেম্বর প…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
গোবিপ্রবিতে প্রথমবারের মতো জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াড আয়োজন
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
টেকনাফে পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জিম্মিকে থানায় হস্তান্তর,…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950