মো. সাজিদ
মো. সাজিদের ওপর হামলা © ভিডিও থেকে নেওয়া
শাহবাগ তখন রণক্ষেত্র। পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড ও গ্যাসের ঝাঁজে দ্বিগ্বিদিক ছুটোছুটি করছিল আন্দোলনকারীদের সবাই। কেউ ব্যস্ত ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায়, কেউবা ইট-পাটকেল ছুড়তে। পুলিশের লাঠির আঘাতে একের পর এক আন্দোলনকারীরাও মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, ধোঁয়া আর লাঠির আড়ালে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন এক যুবক; যার মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে, পিঠ-পায়েও আঘাত, তবুও একচুল নড়ছেন না। ভয়ের ছাপ নয়, চোখে-মুখে নীরব প্রতিবাদ। লাঠির আঘাতের মাঝেও অটল দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্য মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
ভাইরাল হওয়া সেই যুবকের পরিচয় জানা গেছে। নাম মো. সাজিদ। সরকারি কবি নজরুল কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র। শাহবাগে পুলিশের দফায় দফায় হামলার মধ্যেও যিনি হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের এক নীরব প্রতীক।
শুক্রবার জাতিসংঘের অধীনে ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল বের করে সংগঠনটি। মিছিলটি শাহবাগ মোড়ে পৌঁছালে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ বাঁধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর বেধড়ক লাঠিপেটা করেন।
‘আমি দাঁড়িয়েছিলাম, পুলিশ ক্রমাগত আঘাত করছিল। পরে একজন পুলিশ এসে আমাকে বাঁচানোর জন্য জড়িয়ে ধরতে চাইলে আমি রাগে তাকে সরিয়ে দিই। আমি বলেছি, আপনারা আগে মারার অর্ডার দিয়ে পরে আবার মায়া দেখাবেন; এটা একটা হাস্যকর বিষয়।’
হামলার সময় দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্য সাজিদকে ঘিরে ধরে লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন। মাথায় মারাত্মক চোট এবং পিঠ ও পায়ে আঘাত নিয়েও তিনি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে একজন পুলিশ সদস্য তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে তিনি ক্ষোভ ও অভিমানে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
পরবর্তীতে এ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মো. সাজিদ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমি দাঁড়িয়েছিলাম, পুলিশ ক্রমাগত আঘাত করছিল। পরে একজন পুলিশ এসে আমাকে বাঁচানোর জন্য জড়িয়ে ধরতে চাইলে আমি রাগে তাকে সরিয়ে দিই। আমি বলেছি, আপনারা আগে মারার অর্ডার দিয়ে পরে আবার মায়া দেখাবেন; এটা একটা হাস্যকর বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘সহযোদ্ধারা আমাকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান, যেখানে তার মাথায় সেলাই দিতে হয়েছে। বর্তমানে আমি আগের চেয়ে কিছুটা সুস্থ আছি।’
এদিকে সাজিদকে নিয়ে অনেকের মত স্মৃতিচারণ করেছেন তার প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র শিক্ষার্থী কবি জিয়া হক। লিখেছেন, মো. সাজিদকে নিয়ে কিছুই বলার নেই। সাজিদ ও আমি একই প্রতিষ্ঠানে পড়েছি। সাজিদ আলিম করেছে ছারছীনা আলিয়া থেকে। জাহিদ আহসানের সহপাঠি সাজিদ। রাষ্ট্র নির্বিকার থাকলে সাজিদদের কিছুই করার থাকে না। সাজিদরা তখন এভারেস্ট হয়ে যায়। সংশপ্তক হয়ে যায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায় কেবল সাজিদের মতো ‘অসহায়’ সন্তান। যে পুলিশ সদস্য সাজিদকে এই জাহান্নামের করুণ দশায় পাঠালো, তার শাস্তি কি হবে? হবে না, সম্ভবত।
জিয়া লেখেন, সাজিদের সাথে কথা হলো মাত্রই। মাথায় আঘাত পেয়েছে। এক্সরে করিয়েছে। ডাক্টার বিকালে রিপোর্ট দিবেন। সাজিদের রিপোর্ট যেন ভালো আসে, সেই দোয়া করি। দিনশেষে সাজিদরা একা, বড় একা। রিপোর্ট খারাপ আসলে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে সাজিদকে। সাজিদকে কেউ শিবির বানাবে। ছাত্রদল/এনসিপি বানাবে। মানুষের কাতারে রাখবে না। আমাদের এটাই বড় সমস্যা। আমরা মানুষ হই না কখনো। সাজিদরা আগুনে পুড়ে পুড়ে হিরা হয়ে যায়। আমরা মানুষ হই না। মানুষ হওয়া সবচেয়ে জরুরি।
জিয়ার ভাষ্য, ‘সাজিদ, তুমি আমাদের কালের মহাবিদ্রোহী। অন্যায়কে আমৃত্যু অন্যায় বলে যাও। মাথা নত করো না। মাথা নত হবে কেবল মহান রবের সামনে। কোনো দানবের সামনে না।’
দিনশেষে সাজিদরা একা, বড় একা। রিপোর্ট খারাপ আসলে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে সাজিদকে। সাজিদকে কেউ শিবির বানাবে। ছাত্রদল/এনসিপি বানাবে। মানুষের কাতারে রাখবে না। আমাদের এটাই বড় সমস্যা। আমরা মানুষ হই না কখনো। সাজিদরা আগুনে পুড়ে পুড়ে হিরা হয়ে যায়। আমরা মানুষ হই না। মানুষ হওয়া সবচেয়ে জরুরি। -কবি জিয়া হক
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীদের পরিচালিত পেজ পুসাবে লেখা হয়েছে, ‘মাইরের একটা পর্যায়ে তিনি অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে একজন পুলিশ বাকিদের সরিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে তিনি তাকে দু'হাত দিয়ে শক্তভাবে সরিয়ে দেন। কী প্রচন্ড অভিমান আর ক্ষোভ জমে থাকলে এমন ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায় ভাবছি! গাইরত কতখানি শক্তিশালী হলে ওভাবে আলিঙ্গনের আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়া যায়! জানিনা তিনি তখন কি ভাবছিলেন, হাদির কথা ভাবছিলেন কি? তার নাম মো: সাজিদ। তার আইডির বায়োতে লেখা ‘শাহাদাতের জন্যই মায়ের উদর থেকে পৃথিবীতে পা রেখেছি’।
এদিন পুলিশের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা এবং সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরসহ শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী এ প্রসঙ্গে জানান, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করলে তাদের বাধা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও এবি পার্টি। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে যান জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি এই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।