তানজিদ শুভ্র © টিডিসি সম্পাদিত
আর মাত্র একদিন পরেই পবিত্র ঈদুল ফিতর। এক মাস সিয়াম সাধনার পর উৎসবের এ দিনটি সবার জীবনে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গায় এখন ছুটির আমেজ। পরিবারের সবার সাথে মিলিত হওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে সবার মনে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এই উৎসব আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক মিলনমেলা। তবে উৎসবের এই আনন্দের পাশাপাশি আমাদের চারপাশের প্রতিদিনের আর্থসামাজিক বাস্তবতাও বেশ স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে এই বিশেষ সময়ে। আনন্দ আর সংগ্রামের এক অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা যায় মানুষের চোখে মুখে।
ঈদের প্রস্তুতির অন্যতম বড় অনুষঙ্গ হলো কেনাকাটা। বাজারগুলো এখন ক্রেতায় পরিপূর্ণ। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শপিংমল, সবখানেই মানুষের ভিড়। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের চিত্র। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং পোশাকের দাম সাম্প্রতিক সময়ে বেশ ঊর্ধ্বমুখী। একজন সাধারণ আয়ের মানুষের জন্য পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন একটি কাজ।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্তারা অনেক সময় নিজেদের ব্যক্তিগত প্রয়োজন সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের আবদার মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাসের নির্দিষ্ট আয়ের সাথে উৎসবের বাড়তি খরচের বাজেট মেলাতে গিয়ে অনেকেই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। তারপরও মানুষ নিজের সাধ্যের মধ্যে সেরাটা কেনার চেষ্টা করে। কারণ ঈদের দিনটি অন্তত একটু ভিন্নভাবে, একটু আনন্দের সাথে কাটানোর ইচ্ছা প্রতিটি মানুষেরই থাকে।
ঈদের আগে দেশের আরেকটি বড় দৃশ্যপট হলো লাখো মানুষের শেকড়ের টানে বাড়ি ফেরা। ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহর থেকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চ টার্মিনালে মানুষের উপচে পড়া ভিড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় আপনজনের প্রতি মানুষের কত গভীর টান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা, কাঙ্ক্ষিত টিকিট না পাওয়ার হতাশা এবং দীর্ঘ যাত্রাপথের অবর্ণনীয় ক্লান্তি সবকিছু মানুষ এক নিমিষেই ভুলে যায় যখন তারা পরিবারের সদস্যদের হাসিমুখ দেখতে পায়।
এ বিশালসংখ্যক মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করা প্রশাসনের জন্য সব সময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। উৎসবের এই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা যেন কারও সারা জীবনের কান্না হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে চালক, যাত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সচেতন থাকতে হবে। প্রিয়জনের কাছে ফেরার এই যাত্রা যেন কোনোভাবেই বিপদের কারণ না হয়।
ঈদের এ সময়ে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতেও একটি বড় ধরনের গতির সঞ্চার হয়। এর পেছনের অন্যতম বড় কারিগর হলেন আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এই উৎসবের আগে গ্রামীণ বাজারগুলোকে চাঙ্গা করে তোলে। শহরের পাশাপাশি গ্রামের বিপণিবিতানগুলোতেও কেনা-বেচা বাড়ে। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্থানীয় উৎপাদক সবাই এই সময়টার দিকে তাকিয়ে থাকেন। এই অর্থনৈতিক লেনদেন আমাদের সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ঈদের প্রকৃত আনন্দ আসলে একা নিজের মত করে উপভোগ করার মাঝে নেই। এই আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই উৎসবের সার্থকতা। আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য একটি কঠিন বাস্তবতা। আমাদের আশেপাশেই এমন অনেক মানুষ আছেন যাদের জন্য ঈদের দিন ভালো কিছু রান্না করা বা পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কেনা সম্ভব হয় না। এখানেই আসে আমাদের মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
জাকাত, ফিতরা এবং স্বেচ্ছায় দানের মাধ্যমে আমরা আমাদের সম্পদের একটি অংশ সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের সাথে খুব সহজেই ভাগ করে নিতে পারি। আপনার দেওয়া একটি নতুন পোশাক বা সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য একজন সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ঈদের দিনটিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ একসাথে হাসতে পারে।
সব ধরনের সীমাবদ্ধতা, কষ্ট ও সংগ্রামের পরও ঈদ আমাদের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করে। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি ও ক্লান্তি ভুলে মানুষ নতুন উদ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পায়। আর্থসামাজিক বাস্তবতা আমাদের হয়ত প্রতিনিয়ত অনেক কঠিন হিসাব নিকাশ মনে করিয়ে দেয়, তবে দিন শেষে উৎসবের এই নির্মল আনন্দটুকু বেঁচে থাকার জন্য সবার জীবনেই খুব প্রয়োজন।
আসুন, আমরা শুধু নিজেদের উৎসব নিয়েই ব্যস্ত না থেকে চারপাশের মানুষগুলোর দিকেও একটু খেয়াল রাখি। সবার ঈদযাত্রা নিরাপদ হোক এবং প্রতিটি ঘরে ঈদের আনন্দ সমভাবে ছড়িয়ে পড়ুক।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়