মতিঝিল আইডিয়ালে ফি বাণিজ্য
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ © ফাইল ছবি
রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। মতিঝিল ছাড়া স্বনামধন্য এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আরও দুটি শাখা রয়েছে রাজধানীতে। বর্তমান এই তিন শাখায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ২০২৬ সালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ভর্তি ও পুনঃভর্তিতে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে শিক্ষার্থী প্রতি ৩ হাজার ৬৯৫ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে। ফলে ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের থেকে অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে ১১ কোটি ৮২ লাখেরও বেশি। বিষয় নিয়ে সম্প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একদল অভিভাবক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জানানোর পর তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরকে এ নিয়ে একটি চিঠি দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিবার (১৯ এপ্রিল) মতিঝিল আইডিয়াল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রওশান জাহান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি গত মার্চের ৯ তারিখ যোগদান করি। গত তিন বছর ধরে এভাবে বেতন ও অন্যান্য খাতে টাকা নেওয়া হচ্ছে। আমাদের চেয়ারম্যান স্যার অনেক ব্যস্ত রয়েছেন। অভিভাবকরা বিষয়টি জানালে স্যারের সঙ্গে একটি মতবিনিময় করার চিন্তাভাবনা ছিল, তাদেরকে অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। তার আগেই যেহেতু মন্ত্রণালয়ে একটা অভিযোগ দেওয়া হয়ে গেল, তাহলে এখন কিভাবে বসব বলেন, তারপরও উনারা চাইলে আমরা বসতে পারি। মাউশি যেহেতু আমাদের বিষয়টা তদন্ত করবে, আমরা সেখানে বিষয়টি নিয়ে জবাব দেব।
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান একটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান। চাকরি জীবন শেষে একটা আর্থিক নিরাপত্তা দরকার। সেজন্য গ্র্যাচুয়িটি বাবদ টাকা নেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষকদের ধরে রাখতে হলে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার। তা না হলে ভালো শিক্ষকরা থাকবেন না। আমাদের প্রায় ৭০০ শিক্ষক রয়েছেন।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তার রবিবার (১৯ এপ্রিল) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) একটি চিঠি দিয়েছি। আগে তারা তদন্ত করুক, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব বরাবর দেওয়া একটি অভিযোগ থেকে জানা গেছে, হাইকোর্টে পুনঃভর্তির ক্ষেত্রে সেশন ফি বাতিলের রায় থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট থেকে সেশন ফি আদায় করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কোমলমতি সন্তানেরা এই বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করছে। ২০২৫ সাল থেকে নিয়মিত ছাত্র/ছাত্রীদের নিকট থেকে প্রতিবছর সেশন ফি নেওয়া যাবে না বলে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন। শুধুমাত্র নতুন ছাত্র/ছাত্রীদের নিকট থেকে সেশন ফি নেওয়া যাবে।
বিষয়টি তদন্ত করতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে (মাউশি) একটি চিঠি দিয়েছি। আগে তারা তদন্ত করুক, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।— শিরীন আক্তার, সিনিয়র সহকারী সচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়
কিন্তু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টের এই রায় মানছে না। উল্টো ছাত্র/ছাত্রীদের সেশন ফিসহ বেতন জমা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি আসন্ন প্রথম সাময়িক পরীক্ষা দিতে দিবে না বলা হচ্ছে—যা শুনে কোমলমতি ছাত্র/ছাত্রীদের মনোবল ভেঙে পড়ছে এবং বিষয়টি শুনে অভিভাবকরা অপমানবোধ করছেন। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ অধ্যক্ষকে অবগত করলেও কোনো কর্ণপাত করছেন না। বিষয়টি নিয়ে একটি সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর নিকট দ্বারস্থ হয়েছেন বলে অভিযোগ পত্রে বলা হয়।
আবেদনে অভিভাবকরা বলেন, ‘আমরা অধিকাংশ অভিভাবক সীমিত আয়ের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ইতোমধ্যে প্রায় ৪ মাসের বেতন বকেয়া হয়ে গেছে। একসাথে এতগুলো টাকা দেওয়া আমাদের জন্য খুবই কষ্টসাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আবেদনপত্রে তারা বলেন, ‘মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ফান্ডে প্রায় ২৫২ কোটি টাকা জমা রয়েছে। যার একটি বিরাট অংশ প্রতিবছর সেশন ফি এবং বেতনের অযাচিত খাত থেকে জমা হয়ে থাকে। প্রতিমাসে বেতনের সাথে যে খাতগুলোতে টাকা নেয়া হয় তা যুক্তিযুক্ত নয়। খরচের চেয়ে অনেক বেশি টাকা নেয়া হচ্ছে বলে আমরা সচেতন অভিভাবক মহল মনে করি। শিক্ষামন্ত্রীর অধীনে একটি অডিট টিম করে বেতনের খাতের টাকা এবং খরচের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এতে বেতন আরো কমানো যাবে বলে আমরা মনে করি।’
অনতিবিলম্বে ছাত্র/ছাত্রীদের পুনঃভর্তি ক্ষেত্রে সেশন ফি বাতিলের বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তসহ বেতন নিয়ে আসন্ন সাময়িক পরীক্ষাদানের সুব্যবস্থা করার দাবি জানান অভিভাবকরা।
ভর্তি ফরম থেকে জানা গেছে, প্রতিবছর টিউশন ফি নীতিমালা অনুযায়ী ‘দালান, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ’ খাতে কোনো টাকা না নেওয়ার কথা থাকলেও মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ শিক্ষার্থী প্রতি ৭০০ টাকা করে নিচ্ছে। বিজলী/বিদ্যুৎ খাতে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৩০০ টাকা; বিবিধ/গ্র্যাচুয়িটি/আনুষঙ্গিক তিনটি মিলে ৫০ টাকা নেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি বিবিধে ১৬৫ টাকা ও গ্র্যাচুয়িটিতে ৮৫০টাকা নিচ্ছে। আর বেনাভোলেন্ট/কল্যাণ/আর্থিক সাহায্য তিনটি মিলে ২৫ টাকার পরিবর্তে বেনাভোলেন্ট-৫০০ ও আর্থিক সাহায্যে ২০০ টাকা নিচ্ছে আইডিয়াল স্কুল।
আরও পড়ুন: ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের সুযোগ শেষ আজ
তবে ২০২৬ সালে খেলাধুলা, গ্রন্থাগার, আইন ও পরামর্শসহ ১৭ খাতে শিক্ষার্থী প্রতি (নতুন+পুরাতন) ৫ হাজার ২০০ টাকা, আর জানুয়ারি মাসের বেতনসহ ৮ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে পুরাতনদের ক্ষেত্রে ১৭ খাতসহ আর্থিক সাহায্য, জেনারেটর, ওয়াসা, পৌরকর ও গ্যাস, ডায়েরি-সিলেবাস-বর্ষপঞ্জি খাত দেখানো হয়েছে। আর নতুনদের ক্ষেত্রে ১৭ খাতসহ ভর্তি ফি ১৩৫০ টাকা দেখানো হয়েছে।
এভাবে প্রতিবছর শিক্ষার্থী প্রতি ৩ হাজার ৬৯৫ টাকা বেশি নিচ্ছে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। তবে মন্ত্রণালয় বরাবর দেওয়া আবেদনে বছরপ্রতি ২ হাজার ১১৫ টাকা নেওয়ার দাবি অভিভাবকদের।
জানা গেছে, ‘টিউশন ফি নীতিমালা-২০২৪’ অনুযায়ী মোট ১১ খাতে ২ হাজার ৬৫০ টাকা নেওয়ার কথা শিক্ষার্থীদের। কিন্তু এর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি মোট ১৭টি খাতে সর্বমোট ৬ হাজার ৩৪৫ টাকা নিচ্ছে। এই অতিরিক্ত ফি নেওয়ার কারণে অভিযোগ জানায় অভিভবকরা।
এদিকে তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৫ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের (বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখা) সিনিয়র সহকারী সচিব শিরীন আক্তারের সই করা নোটিশে বিষয়টি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মাউশিকে দেওয়া ওই তদন্তের নোটিশে বলা হয়, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অনিয়মের বিষয়ে প্রাপ্ত আবেদন পত্রটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
এ বিষয়ে অভিভাবক ঐক্য ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফাহিম উদ্দীন আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া এক বিবৃতিতে বলেন, সারাদেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়নের জন্য ২০২৪ সালে টিউশন ফি নীতিমালা জারি করে সরকার। কিন্তু মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতিরা এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করছেন না। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দুটির সভাপতি সাবেক সচিব ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা। সরকারি দলের নীতিনির্ধারক হয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নীতিমালার কোনটিই বাস্তবায়ন না করায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনালগ্ন থেকেই সভাপতিদ্বয় বার বার কমিটির সভাপতি হয়ে আসছেন। পরবর্তীতেও সভাপতি থাকার জন্য তারা তদবির করছেন। অথচ তারা সাবেক সচিব ও সরকারি দলের উপদেষ্টা হয়েও সরকারের সিদ্ধান্ত মানছেন না এবং বাস্তবায়ন করছেন না। অভিভাবকদের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে শিক্ষার উন্নয়নে তাদের কোনো ভূমিকা দেখছি না। আমরা অবিলম্বে সরকারের জারি করা ‘টিউশন ফি নীতিমালা’র বাস্তবায়ন চাই এবং ইতঃপূর্বে শিক্ষার্থীদের থেকে আদায় করা অতিরিক্ত টাকা দ্রুত ফেরত চাই। আর যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘টিউশন ফি নীতিমালা’ অমান্য করে অতিরিক্ত টিউশন ফি আদায় করেছে সেসব প্রতিষ্ঠানের কমিটি বাতিল করে নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানাই।