এসএসসি
২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষার পরিসংখ্যান © ব্যানবেইস
বিগত প্রায় দেড় যুগের আওয়ামী লীগের শাসন আমলে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার পাসের হার। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার মান বেড়েছে কিনা, সেই প্রশ্ন বারবার উঠেছিল অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ফল প্রকাশ করায় অতীতে এসএসসি পড়ুয়াদের প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে তখন পাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও বেশি পরিমাণে দেখানো হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজন করে। প্রকাশিত এই ফলাফলে যেন নাটকীয় পতন হয়েছিল। এর আগের বছরের তুলনায় সে বছর কমেছিল পাসের হার, পাশাপাশি কমেছিল জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও। শিক্ষা বিশ্লেষকদের ধারনা, তখন ফল নিম্নমুখীর অন্যতম কারণ ছিল ‘রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অবসান’। শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার জানিয়েছিলেন, এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টে শিক্ষার্থীদের মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ তারা যেভাবে পরীক্ষা দিয়েছে, প্রকৃত মূল্যায়নে সেই ফলাফল দেওয়া হয়েছে। ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অতীতের মতো রেজাল্ট দেওয়া হয়নি।
পরে ফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী; যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। অন্যদিকে, ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে; যা আগের বছরের (২০২৪ সাল) চেয়ে কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭ জন।
২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা দরজায় কড়া নড়ছে। আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরুর আগে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের বিষয়ে কঠোর বার্তার পাশাপাশি নকল নির্মূলেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন একাধিকবার। এরপর নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরাও। এসএসসি পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন প্রসঙ্গে শিক্ষা ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘খাতায় যা-ই লেখা থাকুক, সঠিক উত্তর যাচাই করেই নম্বর দিতে হবে। কোনোভাবেই অতিরিক্ত বা কম নম্বর দেওয়া যাবে না।’
তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। গত দেড় যুগে লাফিয়ে লাফিয়ে পাসের হার বাড়ার নেপথ্যে ছিল সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা। পাশাপাশি এ সময়ে একাধিকবার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাও ছিল নেপথ্যে। তবে পরীক্ষার হলে নকল প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কোনো পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষা প্রশ্ন ফাঁসের কারণে দিনাজপুর বোর্ডের চার বিষয়ের এসএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছিল।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে পাসের হার বৃদ্ধিতে একটি প্রভাব পড়েছে। তবে সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়। তারা বলছে, পাসের হার বাড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তন, নম্বর প্রদানে শিথিলতা এবং নকল—সবকিছু মিলিয়েই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
২০০৮ সালের পর সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে প্রশ্নের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে সহজে উত্তর করতে পারে। এর ফলে পাশের হার বৃদ্ধিতে একটি প্রভাব পড়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতা যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে তা করতে পারছেন—সেটা বড় প্রশ্ন। আমরা প্রায়ই বলি নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষকরা মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপ কতটা ভালোভাবে বুঝছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।— ড. মনিরা জাহান, অধ্যাপক, আইইআর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের শিক্ষার তথ্য নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)। তাদের সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ১৯৯০ সালে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৩১ দশমিক ৭১ শতাংশ। আর ২০২১ সালে এসে তার সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ হয়, যা তিনগুণ বেড়েছে। ব্যানবেইস তাদের পরিসংখ্যাটি সর্বশেষ অর্ন্তভূক্ত করেছে ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান। এই বছরে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
জানা গেছে, ২০০৮ সাল থেকে দেশে এসএসসিতে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই করার লক্ষ্যে সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করেছিল সরকার। যখন এটি চালু করা হয়, তখন বলা হয়েছিল, এই পদ্ধতিতে নোট-গাইড বই থাকবে না, কোচিং-প্রাইভেট বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে ফল হয়েছে উলটো। শিক্ষকরাই বিষয়টি ভালোভাবে না বোঝায় শিক্ষার্থীদের কোচিং-প্রাইভেট বা সহায়ক বইয়ের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে আগের চেয়ে আরো বেশি। অভিভাবকদেরও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভীত রয়েছেন শিক্ষকরাও। প্রায় ৪২ ভাগ শিক্ষকের এ বিষয়ে ধারণা নেই। সৃজনশীল চালুর এক যুগ পর ২০২২ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের অ্যাকাডেমিক সুপারভিশন রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যানবেইসের তথ্য মতে, ২০০৮ সালে পাসের হার ছিল ৭০.৮১ শতাংশ, ২০০৯ সালে ৬৭.৪১ শতাংশ, ২০১০ সালে ৭৮.১৯ শতাংশ, ২০১১ সালে ৮২.১৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬.৩২ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯.২৮ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৯২.৬৭ শতাংশ। এরপর ২০১৫ সালে পাসের হার দাঁড়ায় ৮৬.৭২ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮.৭০ শতাংশ, ২০১৭ সালে ৮১.২১ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৯.৪০ শতাংশ, ২০১৯ সালে ৮২.৮০ শতাংশ এবং ২০২০ সালে ৮৩.৭৫ শতাংশ। পরবর্তী বছর ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ৯৪.০৮ শতাংশ পাসের হার রেকর্ড হয়। এরপর ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৮.১০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০.৯৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৩.৭৭ শতাংশ।
ব্যানবেইস প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এসএসসিতে পাসের বৃদ্ধির প্রবণতা ১৯৯০ সালের পর পাঁচ বছর অব্যাহত ছিল। ১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল ৩১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ১৯৯১ সালে পাসের হার দ্বিগুণ (প্রায় ৬৫ শতাংশ) হয়ে যায়। ১৯৯৫ সালে এসে পাস দাঁড়ায় ৭৩ শতাংশের বেশি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (এমসিকিউ) পদ্ধতি চালু হয়। ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এর পর থেকেই মূলত পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ১৯৯৫ সালেও এসএসসিতে একটি বিষয়ে নির্ধারিত ৫০০ (প্রশ্নব্যাংক) এমসিকিউ প্রশ্ন মুখস্থ করতে পারলেই ৫০ নম্বর পাওয়া নিশ্চিত ছিল। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯৬ সাল থেকে ৫০০ প্রশ্নব্যাংকের ব্যবস্থা উঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে এমসিকিউ ছিল, কিন্তু নির্ধারিত ছিল না। দেখা গেল, ওই বছর পাসের হার রাতারাতি কমে যায়। তখন পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৪২ দশমিক ৬১। ওই সময় প্রশ্নব্যাংক রাখার জন্য শিক্ষার্থীরা দাবি করলেও তা মানা হয়নি। তবে এমসিকিউ রাখা হয়, কিন্তু নির্ধারিত প্রশ্নব্যাংক ছিল না।
শুরুর দিকে মোট নম্বরের মধ্যে অর্ধেক এমসিকিউ এবং অর্ধেক ছিল রচনামূলক প্রশ্ন। এখন রচনামূলক প্রশ্নের জায়গায় সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি প্রশ্ন চালু হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষায় প্রতিটি বিষয়ে মোট নম্বরের মধ্যে ৭০ শতাংশ নম্বরের প্রশ্ন সৃজনশীলে এবং ৩০ নম্বরের প্রশ্ন করা হয় এমসিকিউ।
আমরা একটা সময় ভালো করে টেক্সট বই পড়তাম। এখন এর বাহিরে গাইডসহ অনেককিছু পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। তাছাড়া এখনকার টেক্সট বইও প্রশ্নবিদ্ধ। তাই মূল্যায়ন পদ্ধতিকে দায়ী করছি। পরীক্ষার মূল্যায়ননীতির কারণে পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা নির্ভর, পারিবারিক চাপে শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ পেতেই হবে এমন একটি ধারণা চালু আছে।— মোহাম্মদ মজিবর রহমান, অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ২০০৮ সাল থেকে আবার পাসের হার বাড়তে শুরু করে। ওই বছর পাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ৭১ শতাংশে। এরপর ২০১১ সাল থেকে পাস সব সময়ই ৮০ শতাংশের বেশি ছিল, যা ২০২১ সালে ৯৪.৮৮ শতাংশ হয়। এদিকে, ২০০৮ সালে সৃজনশীল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর ঘোষণার পর ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় এটি প্রথম প্রয়োগ করা হয়।
২০১০ সালের পর কয়েক বছর কেউ কেউ বলতেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে নমনীয়তা পাসের হার বৃদ্ধির একটি কারণ। তবে এ ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রশ্নের ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ। সৃজনশীল পদ্ধতিতে (কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন) একটি বিষয়কে ৪ ভাগে ভাগ করে প্রশ্ন করা হয়। প্রতিটি অংশের জন্য আলাদা নম্বর আছে। চারটি অংশের একটি অংশ সঠিক হলে ওই অংশের জন্য নম্বর পাওয়া যায়, যা আগের রচনামূলক প্রশ্নে এ সুযোগ ছিল না। তখন একটি প্রশ্নের উত্তরে কোনো ভুল হলে পুরো প্রশ্নের নম্বর কাটা যেত।
এর মধ্যে ২০০১ সালে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে সনাতন পদ্ধতিতে নম্বর দেওয়ার পরিবর্তে গ্রেড পদ্ধতি চালু করা হয়। ২০০৩ সালে সর্বোচ্চ ৫ সূচকের (পয়েন্ট বা স্কেল) ভিত্তিতে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেখা যায়, প্রথম দিকে জিপিএ-৫ খুব কম থাকলেও পরে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে সব রেকর্ড ভেঙে জিপিএ-৫ পায় ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন। এ নিয়ে আছে নানা কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি অনেকগুলো কারণে ২০২৫ সালে এসএসসির ফল ও জিপিএ-৫ এ বিপর্যয় হয়েছে। আগে এই অভিযোগটা আমাদের কানে আসতো যে, শিক্ষায় বিগত সরকার উন্নয়ন করছে সেটার দৃশ্যমান কিছু একটা দেখাতে পরীক্ষায় নাম্বার বাড়িয়ে দেওয়া হতো।
‘‘তবে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যেমন-জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের অবস্থা স্থিতিশীল না। এই আন্দোলনে এসএসসি পরীক্ষার্থী অনেকেই অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তারা তো স্বাভাবিক ছিলেন না। তারা শকড ছিলেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষায় খারাপ ফল করবেন।’’—তিনি আরও যোগ করেন।
অধ্যাপক মজিব বলেন, আমরা একটা সময় ভালো করে টেক্সট বই পড়তাম। এখন এর বাহিরে গাইডসহ অনেককিছু পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। তাছাড়া এখনকার টেক্সট বইও প্রশ্নবিদ্ধ। তাই মূল্যায়ন পদ্ধতিকে দায়ী করছি। পরীক্ষার মূল্যায়ননীতির কারণে পরীক্ষায় পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষা নির্ভর, পারিবারিক চাপে শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ পেতেই হবে এমন একটি ধারণা চালু আছে। ফলে এসব চাপ শিক্ষার্থীরা নিতে পারে না। তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় এবং মনে মনে কত শিক্ষার্থী খুন হয়ে যাচ্ছে তা আমরা টেরও পাচ্ছি না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ২০০৮ সালের পর সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু হওয়ার ফলে প্রশ্নের কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে সহজে উত্তর করতে পারে। এর ফলে পাশের হার বৃদ্ধিতে একটি প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ ক্ষমতা যাচাই করার কথা থাকলেও, বাস্তবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে তা করতে পারছেন—সেটা বড় প্রশ্ন। আমরা প্রায়ই বলি নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু শিক্ষকরা মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপ কতটা ভালোভাবে বুঝছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সর্বোপরি প্রশিক্ষণের অভাব।
গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে আমাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিক্ষকই প্রশ্ন প্রণয়ন করলেও তারা প্রশ্নের গভীরতা বা কাঠামো পুরোপুরি বোঝেন না। অনেক ক্ষেত্রে গাইড বই বা প্রশ্নব্যাংকের ওপর নির্ভর করা হয়, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্নের প্যাটার্ন এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যেখানে প্রথম ধাপগুলো অধিকাংশ শিক্ষার্থীই করতে পারে। ধীরে ধীরে উচ্চতর দক্ষতার জায়গায় যাওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে শিথিলতা দেখা গেছে। এ ধরনের নির্দেশনা থাকায় ফলাফল বৃদ্ধির একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়।
নকল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নকল একটি বাস্তবতা। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে আমরা দেখেছি কীভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রে নকল সরবরাহ করা হয় বা দলবদ্ধভাবে উত্তর করা হয়। এসব কারণে কিছুটা হলেও পাসের হার বেড়েছে—এটা অস্বীকার করা যায় না।
তবে তিনি মনে করেন, পাসের হার বাড়ার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রশ্নপদ্ধতির পরিবর্তন, নম্বর প্রদানে শিথিলতা এবং নকল—সবকিছু মিলিয়েই এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে।