উচ্চশিক্ষায় স্বপ্ন যাদের জার্মানি

খাদিজা লিজা
খাদিজা লিজা  © টিডিসি ফটো

ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী দেশ জার্মানি। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে কয়েক হাজার কোর্স থেকে পছন্দের কোর্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ। এসবকিছু মিলিয়ে সাম্প্রতিককালে শিক্ষার্থীদের পছন্দের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশটি। জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ও সম্ভবনা নিয়ে লিখেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার-

খাদিজা লিজা পড়াশোনা করছেন আনহাল্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সে মলিকুলার বায়োটেকনোলজি বিষয়ে। ২০২১ সালে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োটেকনোলজি ও জ্যানেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করেন। শুরুতে ইচ্ছে ছিল কানাডার জন্য প্রসেসিং শুরু করবেন। তারপর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। ১৫ দিনের মধ্যেই আনহাল্ট ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্স থেকে অফার লেটার পেয়ে যান।

অফার পেয়ে অ্যাম্বাসির অ্যাপয়েন্টমেন্ট  নিতে গিয়ে দেখেন ১২ মাসের ওয়েটিং পিরিয়ড। অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর জন্য রেজিস্ট্রেশন কমপ্লিট করে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তার ১০-১২ দিন পর Ansbach University of Applied Sciences থেকে অফার লেটার আসে। আর ডিসেম্বরে ডিরেক্ট অফার আসে TUM থেকে (৭০% এর উপরে আসায়)। কিন্তু ওয়েটিং পিরিয়ডের জন্য কোথাও অ্যাডমিশন নিলেন না। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন উইন্টার ২০২২ সালে আবেদন করবেন। তারপর শুধু  TUM এবং  Anhalt University of Applied Sciences এ দুইটাতে আবেদন করলেন। যথারীতি Anhalt থেকে অফার পেলেন কিন্তু ফিজিক্যাল এটেন্ডেন্স ছাড়া অ্যাডমিশন নিবে না। আর TUM এর নতুন নিয়মে লিজার পয়েন্ট ৭০% এর নিচে আসায় ইন্টারভিউ দিতে হবে। কিন্তু সম্ভব হয়নি।

তারপর আবেদন করলেন University of Tubingen-এ। অফার লেটার পেয়ে গেলেন ২০ দিনের মধ্যে। কিন্তু অ্যাম্বাসির কোনো খবর নেই। এদিকে Tubingen এডমিশনের জন্য মেইল করেছে। তারা সর্বোচ্চ এক মাসের লেইট অ্যারাইভাল দিবে জানালো। এবং মের ৩১ তারিখ পর্যন্ত লেইট অ্যারাইভাল লেটার পাঠালো।এবারও নানা জটিলতায় সম্ভব হলো না।

পরবর্তীতে চলতি বছরের মার্চের ১৫ তারিখে Anhalt এ অ্যাপ্লাই করেন এবং সাথে সাথে আগের অফার লেটার সহ বিস্তারিত লিখে তাদের মেইল করেন। এর মধ্যে যে কোনো দিন ডক মেইল আসতে পারে। তারপর মার্চের ২৬ তারিখ ডক মেইল আসে লিজার। অবশেষে সব ভালোভাবে জমা দেওয়ার পর  ইন্টারভিউ ডেইট পড়লো মের ৯ তারিখ। এরপর জুলাইয়ের ৫ তারিখ কালেক্ট করেন সেই কাঙ্ক্ষিত ভিসা। এরপর যদিও TUM এবং HOH থেকে অফার লেটারও আসে, কিন্তু স্বামী University of Leipzig-এ অ্যাডমিশন নেওয়াতে তিনি অন্য কোথাও যাননি। সন্তান থাকায় একই শহরে থাকার সিদ্ধান্ত নেন।

জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার যোগ্যতা
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগ্যতা একেক ভার্সিটির জন্য একেক রকম। এটা নির্ভর করে চাহিদার উপর। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় IELTS 7 চায়। আবার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়  6 চায়। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়  MOI দিয়েও অফার লেটার দেয়। তবে এম্বাসিতে মিনিমাম 5.5 চায়।

কাজের সুযোগ
পার্টটাইম জবের প্রচুর আছে। তবে আপনাকে অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে। জব বেশির ভাগ সময় সিটি টু সিটি নির্ভর করে। যেমন হালেতে লিভিং কস্ট সবচেয়ে কম। আপনি চাইলে একদিনের চাকরিও করতে পারেন। এরকম অর্গানাইজেশনও আছে। ফলে একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়তি আয়ও করতে পারবেন জার্মানিতে।

পড়াশোনার ভাষা
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষায় অধিকাংশ কোর্সই ইংরেজিতে পড়ানো হয়। তাই বেছে বেছে ইন্টারন্যাশনাল কোর্সগুলোতে অ্যাপ্লাই করতে হবে। ব্যাচেলর ম্যাক্সিমাম কোর্স জার্মান ল্যাঙ্গুয়েজ।তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়  কিছু কিছু ব্যাচেলর কোর্স ইংরেজি বা পারশিয়ালি ইংরেজিতে  পড়ানো হয়।

আবেদন প্রক্রিয়া
আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে  লিজা জানান, আনহাল্টসহ কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে  ইউনি অ্যাসিস্টের মাধ্যমে অ্যাপ্লাই করতে হয়। যার জন্য প্রথম যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন  করবেন তার জন্য ৭৫ ইউরো পে করতে হয়। এরপর ঐ একই সেমিস্টারে আপনি যতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাই করেন প্রতি অ্যাপ্লিকেশনে ৩০ ইউরো লাগে৷ আবার সেমিস্টার চেঞ্জ হলে আগের নিয়মে প্রথম অ্যাপ্লিকেশনে ৭৫ ইউরো, পরের সবগুলোর জন্য প্রতি অ্যাপ্লিকেশন ৩০ ইউরো।

আবার অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে  ফ্রিতে অ্যাপ্লাই করা যায়। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্রিতে অ্যাপ্লাই করা যায় তারা ভিপিডি চায়। ভিপিডি হলো জার্মান গ্রেডিং স্কেলে আপনার রেজাল্ট কনভার্শন। আপনার অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ইউনি অ্যাসিস্টকে দিলে ওরাই ভিপিডি দিবে আপনাকে। এর জন্য আগের নিয়মে পে করতে হয়।এ সম্পর্কে বিস্তারিত ইউনি অ্যাসিস্টে ঢুকলেই পেয়ে যাবেন। উল্লেখ্য যে,জার্মানিতে অ্যাপ্লাই করতে কোনো দালাল বা এজেন্সির প্রয়োজন হয় না। সব কিছু আপনি নিজেই করতে পারবেন৷ শুধু আপনাকে একটু সময় দিতে হবে।

আর স্কলারশিপের ক্ষেত্রে যেহেতু অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো টিউশন ফি এড হয় নি, এখানে স্কলারশিপ এর প্রয়োজন পড়ে না। 

তবে সামনে যারা আসবেন তাদের টিউশন ফি দিয়ে পড়তে হবে। তাদের জন্য স্কলারশিপ পাওয়াটা খুবই প্রয়োজন।ম্যাক্সিমাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ আছে। কিন্তু টিউশন ফি না থাকার কারণে অনেকেই এর খোঁজখবর রাখে না।ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য আলাদা কিছু স্কলারশিপ আছে। সবচেয়ে কমন যেটা স্কলারশিপ, সেটা DAAD স্কলারশিপ।প্রথম সেমিস্টারে স্কলারশিপ এর জন্য আবেদন করতে পারবেন না।

স্কলারশিপের জন্য ২য় সেমিস্টারে আবেদন করতে হয়। প্রথম সেমিস্টারের রেজাল্ট দিয়ে। সেক্ষেত্রে ভালো রেজাল্ট করাটা একটা ফ্যাক্ট। জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার গ্রহণে ৩টি স্কলারশিপ উল্লেখযোগ্য। সেগুলো হলো- Bundesausbildungsförderungsgesetz, BAföG (Economically poor student), Deutschlandstipendium (Germany Scholarship)(good achievments and volunteer work) ও  DAAD scholarship। 

নতুনদের জন্য পরামর্শ
জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে খাদিজা লিজার পরামর্শ হলো,সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড হলে জার্মানিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আবেদন করতে পারেন। কেননা সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে টপ র‍্যাংকে আছে তারা। আর যারা নতুন এখনো চিন্তা করছেন কীভাবে অ্যাপ্লাই করবেন, কীভাবে আগাবেন, কিছুই জানেন না, তাদের উদ্দেশ্য বলেন, আগে আপনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে, কোন কোর্সে অ্যাপ্লাই করতে চান সেটা ডিসাইড করবেন। তারপর আবার সেই ভার্সিটি এবং কোর্সের ইনফরমেশন ভালোভাবে ওয়েবসাইট ঘেটে জেনে নিবেন। কারণ ২০২৪ থেকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় টিউশন ফি এড করছে। তাই অ্যাপ্লাই করার আগে চিন্তা ভাবনা করে সব ক্যালকুলেট করে তারপর অ্যাপ্লাই করতে হবে।


সর্বশেষ সংবাদ