তিন সপ্তাহে আত্মহত্যা ৮ শিক্ষার্থীর
আত্মহত্যার মিছিলে যুক্ত হওয়া শিক্ষার্থীরা © সংগৃহীত
আত্মহত্যার মিছিলে ফের যুক্ত হলো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আরেক শিক্ষার্থীর নাম। আজ রবিবার (৫ জুন) দুপুরে কাজল মন্ডল নামে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীর নিজ মেসের রুমে গলায় ফাঁস দেওয়া লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই হলরোডের এক মেসে। তার বাড়ি যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলায়।
মৃত্যুর আগে তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের স্টোরি লিখেছেন ‘I wana to come again but with properly (আমি আবার আসতে চাই তবে সঠিকভাবে)। প্রাথমিকভাবে তার বন্ধু ও সহপাঠীদের ধারণা, ব্যক্তিগত ও ক্যারিয়ার কেন্দ্রীক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাতাশা থেকে সুইসাইড করতে পারেন কাজল।
শুধু কাজল মন্ডলইই নন, গত তিন সপ্তাহে সরকারি ও বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ শিক্ষার্থীর আত্মহননের খবর পাওয়া গেছে। তাদের সুইসাইড নোট এবং সহপাঠী পরিবারের সঙ্গে কথা বলা জানা যায়, সম্পর্কের টানাপড়েন, আর্থিক অনটন, পারিবারিক ও মানসিক সংকট থেকেই তারা আত্মহননের পথ বেঁচে নেয়।
‘চোরাবালির মতো ডিপ্রেশন বেড়েই যাচ্ছে, মুক্তির পথ নেই, গ্রাস করে নিচ্ছে জীবন, মেনে নিতে পারছি না।’- এমন সুইসাইড নোট লেখে বাবার ডায়েরিতে রেখে গেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী সাদিয়া তাবাসসুম। গলায় ফাঁস দিয়ে গত ১০ মে আত্মহত্যা করেন মেধাবী এ ছাত্রী।
একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ রফিক-জব্বার হলের ছাদ থেকে পড়ে নিহত শিক্ষার্থী অমিত কুমারের রুমে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আমার মস্তিষ্কই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি নিজেই নিজের শত্রু হয়ে পড়েছি অজান্তেই। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত। আর না। এবার মুক্তি চাই।’
গত ১ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার জাপান গার্ডেন সিটির একটি ভবন থেকে পড়ে জায়না হাবিব প্রাপ্তি (২২) নামের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন।
জায়না হাবিব প্রাপ্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। চিরকুটে প্রাপ্তি লিখেন, “আমার জীবন একটা ব্যর্থ জীবন। না পারলাম বাবা-মাকে খুশি করতে, না পারলাম অন্য কাউকে খুশি করতে। একটা ঘটনা জানার পরও যখন কেউ চুপ করে থাকে তখন সত্যিই সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। আমি গেলে কিছু আসবে-যাবে না, আমি জানি। Because every person is replaceable. আমরা কাদেরকে ভালোবাসি তারা সেটা জানে। কে বেশি কষ্ট পাবে সেটাও জানি। But nothing makes sence anymore. The pain helps increasing. Now tell me how much a person can take. Prapti, June 1, 2022।”
গত ৩ সপ্তাহে মন্ডল-সাদিয়া-অমিত-প্রাপ্তির মতোই আত্মহননের পথ বেচে নেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবিদ বিন আজাদ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র এবিএম ত্বকী তানভীর, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ছাত্র ইমাম হোসেন মিশু।
এছাড়া ঢাবির প্রাক্তন ছাত্র ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান ঢাকার পান্থপথের বাসায় আত্মহত্যা করেন। সুইসাইড নোটে তিনিও লিখে যান হতাশার কথা।
আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া এসব শিক্ষার্থীর স্বজন ও সহপাঠীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তানদের ঘিরেই অনেক স্বপ্ন বুনেন পরিবারের সদস্যরা। পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটি চাকরি নিয়ে পরিবারের হাল ধরবে, সেই মানুষটি যখন নিজেকেই নিজেই আত্মঘাতী হয়ে যায় তখন পুরো পরিবারের জন্য তৈরি হয় ভয়াবহ মানবিক সংকট। যে ক্ষত সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, করোনায় অনেকের টিউশনি চলে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে আয়-রোজগার। বাধ্য হয়ে তাই অনেককে দীর্ঘ সময় বাড়িতে থাকতে হয়েছে। তারা আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে আগের স্বাভাবিক রুটিনে ফিরতে পারছেন না। পূরণ করতে পারছেন না পরিবারের প্রত্যাশাও। সামাজিক জীবন বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি অনেকের সম্পর্কও ভেঙে গেছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় চাকরি পরীক্ষা বন্ধ থাকায় বেড়েছে বেকারত্ব। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার সঞ্চার হয়েছে, অস্থিরতা বেড়েছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার সময় বিষণ্নতাসহ মানসিক রোগ তিন থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। সাধারণ স্বাস্থ্যের চেয়েও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন করে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। সেটা যতদিন সম্ভব হবে না, ততদিন শিক্ষকদের সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন শিক্ষার্থী কোনোভাবে হেয় প্রতিপন্ন না হয় এবং নিজের প্রয়োজনীয়তা খুঁজে পায় সেই চেষ্টা থাকতে হবে।