কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফটো
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) এখনো গড়ে ওঠেনি নিজস্ব উদ্যোগে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিন প্রকাশের সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অর্জন এবং ক্যাম্পাস জীবনের বহুমাত্রিক চিত্র তুলে ধরতে স্বতন্ত্র কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয় না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও সম্ভাবনাকে প্রামাণ্য আকারে সংরক্ষণ এবং বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম অনুপস্থিত রয়েছে।
হাজার বছরের পুরোনো ‘শালবন বিহার’ এর পাশেই লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে ২০০৬ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। জন্মের ঊষালগ্ন থেকেই একাধিক বিভাগ, অনুষদ ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষা, গবেষণা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্জন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব অর্জন ও অভিজ্ঞতাকে সমন্বিতভাবে উপস্থাপনের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে নিয়মিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিন প্রকাশের নজির নেই।
বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাগাজিন প্রকাশের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের Harvard Magazine, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের Johns Hopkins Magazine এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের Princeton Alumni Weekly - এসব প্রকাশনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, একাডেমিক উৎকর্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জীবন, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা স্থান পায়। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয় সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বাংলাদেশেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বার্তা’র মতো প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা জার্নাল, বার্ষিক প্রতিবেদন ও নিউজলেটার প্রকাশের চর্চাও আছে। তবে গবেষণা জার্নাল, প্রশাসনিক নিউজলেটার ও বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিনের উদ্দেশ্য এক নয়। গবেষণা জার্নাল মূলত একাডেমিক গবেষণার প্রকাশ মাধ্যম; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাগাজিনে শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ক্যাম্পাস জীবন, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বিকাশের চিত্র উঠে আসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর সূত্রে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়নি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহমান আস সাদী বলেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও একটি প্রকাশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের কাজ, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাফল্য, ক্যাম্পাসের সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশের ধারাবাহিকতা একটি মানসম্মত প্রকাশনার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ ধরনের ম্যাগাজিন প্রকাশিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনের পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা, সংকট ও সম্ভাবনাও বস্তুনিষ্ঠভাবে আলোচনার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক জোরদার, নতুন শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচিতি তৈরি এবং জাতীয় পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি তুলে ধরতেও এটি সহায়ক হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগঠন ‘পাটাতন’ এর সাধারণ সম্পাদক সাইদুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অর্থায়নে বছরে অন্তত একবার বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এমন একটি ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে একটি স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রকাশনার মান ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখতে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম মাধ্যম ম্যাগাজিনের শূন্যতা প্রচণ্ডভাবে অনুভব করি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমজাদ হোসাইন সরকার বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে অনেকগুলো কাজ হাতে নিয়েছি। ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ার্স দপ্তরের পরিচালক ও পিআরকে বলব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তরের পরিচালক ড. আব্দুল আহাদ বলেন, আমাদের দেশের ক্যাম্পাসগুলো ছোট। ফান্ডিং ও রিসার্চের একটা দূর্বলতাও রয়েছে। তবে আমাদের ক্যাম্পাসের অনেকেই গবেষণা করে ভালো জার্নালে পাবলিশ করছেন। কিন্ত এগুলো হাইলাইট করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার জন্য আমরা কিছু শর্ট-টার্ম ও লং-টার্ম উদ্যোগ নিব। ম্যাগাজিন বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্রান্ডিং করে। আমরা ক্যাজুয়ালি সামনের দিকে আগাব।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তরের কোনো অফিস নেই। তবে বর্তমান উপাচার্য আমাদের জন্য একটি রুম বরাদ্দ করেছেন। আমরা সেখানে বসে বিশ্ববিদ্যালয়কে গ্লোবালি রিপ্রেজেন্ট করার জন্য কাজ করব।