চট্টগ্রাম সিটি কলেজ
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ © টিডিসি সম্পাদিত
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফল কিংবা সনদ অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা, প্রতিভা বিকাশ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাও একটি আদর্শ ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে রয়েছে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের নিজেদের গড়ে তোলার নানা সম্ভাবনা। তবে এসব সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে আবাসিক সুবিধার অভাব, ক্যান্টিন না থাকা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যাম্পাসটি যেমন স্বপ্ন পূরণের ঠিকানা, তেমনি কিছু প্রত্যাশা ও আক্ষেপেরও জায়গা। শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা ও মতামতে উঠে এসেছে কলেজটির বর্তমান চিত্র, সংকট এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশা।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে প্রায় ১৭টি বিভাগে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। সহজ যাতায়াতব্যবস্থার কারণে কলেজটি শিক্ষার্থীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তবে দীর্ঘদিন ধরে পড়াশোনা করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত ও প্রশাসনিক কিছু উদ্যোগ প্রয়োজন।
আবাসিক হল ও ক্যান্টিনের অভাব
একটি কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ও খাবারের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সুবিধা। বিশেষ করে দূরবর্তী জেলা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক সুবিধা না থাকা পড়াশোনার ক্ষেত্রে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ইফতির মতে, কলেজটির সম্ভাবনা অনেক থাকলেও কিছু মৌলিক সুবিধার ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে ফেলছে। গত চার বছরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আবাসিক হল না থাকায় দূরবর্তী জেলার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও যাতায়াতে বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ক্যান্টিন না থাকায় খাবারের জন্য শিক্ষার্থীদের বাইরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ইফতির মতে, এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন। ক্যান্টিন স্থাপন, আবাসিক হল নির্মাণ এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের সুযোগ বাড়াতে কলেজ কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন তিনি।
একই ধরনের প্রত্যাশা বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমা আক্তারেরও। তার মতে, ক্যাম্পাসে ক্যান্টিন না থাকায় শিক্ষার্থীদের বাইরের স্টলের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু খাবারের ব্যবস্থাই নয়, ছাত্রীনিবাসে বিশুদ্ধ পানির সংকটও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে বলে জানান নাজমা। তার ভাষ্য, ছোট ফিল্টারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পানির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। তাই পর্যাপ্ত নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা জরুরি।
নিরাপদ ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা
শিক্ষার্থীদের কাছে একটি আদর্শ ক্যাম্পাসের অন্যতম শর্ত নিরাপত্তা। শুধু পাঠদানের পরিবেশ থাকলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ হয় না; শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সুস্থতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
নাজমা আক্তার মনে করেন, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী, কার্যকর নজরদারি এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। তার মতে, ক্যান্টিন, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপত্তার দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের মৌলিক প্রয়োজন। এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে কলেজ প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
পরীক্ষার ফলের বাইরে প্রতিভার মূল্যায়ন
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার আরেকটি বড় জায়গা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক যোগ্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। গান, সাহিত্য, বিতর্ক, খেলাধুলা কিংবা নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
ইংরেজি বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরসিফা সুলতানা করিম মনে করেন, অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন পরীক্ষার নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এতে সৃজনশীল ও প্রতিভাবান অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতা প্রকাশের যথাযথ সুযোগ পায় না।
তিনি বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু ফলাফলে নয়, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস ও মানবিক গুণাবলি বিকাশেও প্রতিফলিত হয়। এ জন্য নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সাহিত্যচর্চা ও ক্রীড়া কার্যক্রম আয়োজন করা জরুরি।
আরসিফার প্রত্যাশা, কলেজে এমন পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতারও মূল্যায়ন করা হবে।
শিক্ষকসংকট ও শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়ে আক্ষেপ
শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব ক্ষেত্রেও কিছু সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাওয়া বিনতে সাত্তার তন্না জানান, কলেজে আন্তরিক শিক্ষকদের পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া ব্যাহত হয়। কখনো ক্লাস পিছিয়ে যায়, আবার কখনো বাতিল হয়। এতে পাঠ্যক্রম শেষ করা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ নিয়েও রয়েছে তাঁর আক্ষেপ। গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত বাতাসের অভাবে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, প্রথম বর্ষের প্রয়োজনীয় বই শিক্ষাবর্ষের প্রায় শেষ দিকে সেমিনারে সরবরাহ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে বইয়ের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
তন্নার মতে, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকসংকট নিরসন, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নত করা এবং সময়মতো সেমিনারে বই সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের আন্তরিকতার পাশাপাশি এসব সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রেণিকক্ষের বাইরেও জ্ঞানচর্চার সুযোগের দাবি
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবই, শ্রেণিকক্ষ কিংবা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েও একজন শিক্ষার্থী নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থীর কাছে ক্যাম্পাসটি নিজেকে গড়ে তোলার অনন্য ক্ষেত্র। যুব রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায়দের সহযোগিতা করা এবং শিশুদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও সেবার প্রকৃত অর্থ শিখিয়েছে।
তার মতে, শ্রেণিকক্ষের বাইরের এসব অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাই স্বেচ্ছাসেবা, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা ও অন্যান্য সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সবার জন্য বিস্তৃত করা প্রয়োজন।
কেমন ক্যাম্পাস চান শিক্ষার্থীরা?
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই উঠে এসেছে। কেউ চান আবাসিক হল ও ক্যান্টিন, কেউ নিরাপদ পানি ও উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা, আবার কেউ চান পর্যাপ্ত শিক্ষক, পরিকল্পিত শ্রেণিকক্ষ এবং প্রতিভা বিকাশের সুযোগ।
তাদের প্রত্যাশা, কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে সমস্যাগুলো সমাধানে উদ্যোগী হবে। শুধু পাঠদান ও পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে জ্ঞানচর্চা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও দক্ষতা বিকাশের পরিবেশ তৈরি করা হবে।
তাদের মতে, একটি আদর্শ ক্যাম্পাস শুধু শিক্ষার্থীদের হাতে সনদ তুলে দেয় না; বরং তাদের যোগ্য, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও তেমন একটি ক্যাম্পাসের প্রত্যাশা করেন, যেখানে সুযোগের অভাবে কোনো সম্ভাবনা থেমে থাকবে না।