পদোন্নতির জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ

২১ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ PM , আপডেট: ২১ জুলাই ২০২৬, ১১:০৩ PM
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি ফটো

সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি গ্রহণে নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। পদোন্নতির জন্য করা আবেদনে অসামঞ্জস্যতা দেখা যাওয়ায় ফাইলটি ভাইস চ্যান্সেলর দপ্তর থেকে বিভাগে ফেরত পাঠিয়ে প্ল্যানিং কমিটির ব্যাখ্যা চেয়েছেন ইবি উপাচার্য। 

অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম ড. মো. আসাদুজ্জামান, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির সভায় তার আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ফাইল প্রশাসনের কাছে পাঠানোর পর তিনি গোপনে ফাইলে নতুন নথি যুক্ত করেছেন। পাশাপাশি বিভাগীয় সভাপতি স্বাক্ষরিত একটি নথি সরিয়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া তার গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউকৃত পুস্তক নিয়েও রয়েছে বিতর্ক। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির নীতিমালা অনুযায়ী ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান গত ২৮ এপ্রিল অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আবেদন করেন। তার মোট চাকরিকাল ১৬ বছর ৮ মাস ৬ দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য পিএইচডি ডিগ্রিসহ মোট চাকরির মেয়াদ ১২ বছর ও সহযোগী অধ্যাপক পদে ৫ বছর এবং এই পদে থাকাকালীন কমপক্ষে ৫টি প্রকাশনা বা রিভিউকৃত পুস্তকসহ সর্বমোট ৯টি প্রকাশনা থাকতে হবে। 

কিন্তু ড. আসাদুজ্জামানের আবেদনের তথ্য অনুযায়ী তার ১০টি গবেষণা প্রবন্ধ ও একটি রিভিউ পুস্তক রয়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী একটি রিভিউকৃত পুস্তক সমান তিনটি গবেষণা প্রবন্ধের সমান হওয়ায় তার সর্বমোট গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ১৩টি। কিন্তু এসব গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকে কোনো তারিখ উল্লেখ নেই। তাই এটি কবে প্রকাশিত হয়েছে তা নিশ্চিত নয় প্ল্যানিং কমিটি। 

এছাড়া ড. আসাদুজ্জামানের মোট চাকরির বয়স বিধি মোতাবেক হলেও অধ্যাপক পদে পদোন্নতি জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী উক্ত পদে ৫টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রয়োজন হলেও তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদে একটি রিভিউ পুস্তক জমা দিয়েছেন। যে পুস্তক তিনি জমা দিয়েছেন সেখানেও তারিখ উল্লেখ নেই। 

সবচেয়ে বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদনকৃত ফাইল প্রশাসনে পাঠানোর পর। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একবার আবেদন দাখিলের পর সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে উক্ত শিক্ষক গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের তালিকা পরিবর্তন করেছেন। 

গত ২৮ এপ্রিল দাখিলকৃত আবেদনপত্রের সঙ্গে তার স্বাক্ষরিত গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের একটি তালিকা সংযুক্ত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রশাসন কর্তৃক যখন ফাইল ফেরত পাঠানো হয়, তখন সেখানে সেই তালিকার পরিবর্তে একটি নতুন তালিকা পাওয়া যায়। 

বিভাগে কথা বলে জানা যায়, দাখিলকৃত কাগজপত্র প্ল্যানিং কমিটি কর্তৃক যাচাই-বাছাইয়ের ভিত্তিতে বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরিত একটি তালিকা প্রশাসনের নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল। তবে গত ১২ জুলাই যখন প্রশাসন ফাইলটি ফেরত পাঠায়, তখন নথিতে বিভাগীয় সভাপতির স্বাক্ষরিত তালিকাটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

সূত্রের দাবি, অভিযুক্ত শিক্ষক ফাইলের কাগজপত্র শক্ত করে বেঁধে দেওয়ার নামে অ্যাকাডেমিক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ফাইলটি অবৈধভাবে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে গবেষণা প্রবন্ধ ও রিভিউ পুস্তকের তালিকাটি প্রশাসনের অজ্ঞাতে নতুন করে যুক্ত করে পরদিন আবার এসে ফাইল যথাস্থানে জমা দিয়েছেন। ফলে আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত মূল তালিকা আর প্রশাসন কর্তৃক প্রেরিত ফাইলের সংযুক্ত তালিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একবার প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদনের পর দাখিলকৃত আবেদন এভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। কোনো পরিবর্তন করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর লিখিতভাবে আবেদন দিয়ে প্রশাসনের অনুমতিপূর্বক নথিপত্র সংযোজন বা বিয়োজন করা যেতে পারে। 

এদিকে ওই শিক্ষকের দাখিলকৃত গবেষণা প্রবন্ধ ও পুস্তক নিয়েও রয়েছে জালিয়াতি চেষ্টার অভিযোগ। প্রশাসন কর্তৃক প্রেরিত নথিতে নতুনভাবে যে তিনটি গবেষণা প্রবন্ধের স্বীকৃতিপত্র (Acceptance Letter) সংযুক্ত করা হয়েছে, এই তিনটি গবেষণা প্রবন্ধ সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য দাখিলকৃত আবেদনপত্র ও গবেষণা প্রবন্ধের তালিকায় ইতোমধ্যে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেখানে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. আসাদুজ্জামান সুকৌশলে একই গবেষণা প্রবন্ধ একদিকে প্রকাশিত হিসেবে আবেদনপত্রের সঙ্গে দাখিলকৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আবার অন্যদিকে উক্ত প্রবন্ধগুলোর স্বীকৃতি পত্র (Acceptance Letter) নতুনভাবে নথিতে সংযুক্ত করেছেন। 

নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, Anti Money Laundering Efforts: Case Study এবং Practice of Corporate Social Responsibility : A Case Study on Dutch Bangla Bank Limited (DBBL) শীর্ষক যে দুটি গবেষণা প্রবন্ধের স্বীকৃতিপত্র (Acceptance Letter) তিনি জমা দিয়েছেন, এই দুটি গবেষণা প্রবন্ধ অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছে। সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদনের সময়েও এই গবেষণা প্রবন্ধগুলোই দেখিয়েছেন তিনি। অথচ একবার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পর পুনরায় স্বীকৃতিপত্র (Acceptance Letter) নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। 

অসামঞ্জস্যতা রয়েছে এই শিক্ষকের রিভিউ পুস্তকের ক্ষেত্রেও। আবেদনের সঙ্গে ড. আসাদুজ্জামান Comprehensive Analysis of INSURANCE AND RISK MANAGEMENT শীর্ষক যে রিভিউ পুস্তকটি দাখিল করেছিলেন, সেখানে পুস্তক প্রকাশের কোনো সাল বা তারিখ উল্লেখ ছিল না এবং লেখক হিসেবে ‘ড. মো. আসাদুজ্জামান, সহযোগী অধ্যাপক’ উল্লেখ ছিল এবং First Edition কথাটি সংযোজিত ছিল। এছাড়া পুস্তকের প্রচ্ছদের বিপরীত পাশে একটি বারকোড বিদ্যমান ছিল।

কিন্তু প্রশাসন কর্তৃক প্রেরিত ফাইলে সংযুক্ত রিভিউ পুস্তকটি পূর্বে দাখিলকৃত পুস্তকের সঙ্গে কোনো মিল দেখা যায়নি। সেখানে দেখা যায়, ওই রিভিউ পুস্তকে First Edition শব্দের পরে ‘০১-০৭-২০২১ এবং Second Edition– ১০-১২-২০২৫’ যুক্ত করা রয়েছে। একইসঙ্গে, উক্ত পুস্তকের পেছনে আগে জমা দেওয়া বারকোড বা কোনো ISBN নম্বর নেই। 

ড. আসাদুজ্জামান সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির আবেদনই করেছিলেন ২০২৫ সালে ৮ জুলাই। তাহলে ২০২১ সালের ১ জুলাই প্রকাশিত বইয়ে তিনি নিজেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দাবি করেছেন কীভাবে- তা প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ নথি অনুযায়ী, তখন তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ড. আসাদুজ্জামান বলেন, আমি বিভাগে আবেদন জমা দিয়েছি, বিভাগ থেকে প্ল্যানিং করে প্রশাসনে পাঠিয়েছে। তারপরের বিষয়গুলো প্রশাসনের, এই বিষয়গুলোতে আমার কোনো হাত নেই। এখানে জালিয়াতির কোনো বিষয় নেই।

গোপনে ফাইল বাসায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা প্রশাসনের বিষয়, আবেদন জমা দেওয়ার পরে প্রশাসন যখন যেভাবে চাইবে, সেভাবে কাজ করতে হবে। তবে প্রশাসন নতুন করে কোনো ডকুমেন্ট চেয়েছিল কি-না, জানতে চাইলে তিনি প্রশাসনের সাথে কথা বলতে বলেন। 

একই গবেষণা প্রবন্ধ একবার প্রকাশিত দেখিয়ে পদোন্নতি নেওয়ার পর পুনরায় স্বীকৃতিপত্র (Acceptance Letter) নেওয়া ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি প্রশাসনে আবেদন করেছি, এটার একটা প্রক্রিয়া আছে। আবেদনটা যদি গৃহীত না হয়, তাহলে প্রশাসন আমাকে দেবে না পদোন্নতি, আমিও নেব না। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা আছেন, বিধি মোতাবেক না হলে আমাকে দেওয়ার দরকার নেই। 

এ বিষয়ে অ্যাকাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মীর সিরাজুল ইসলাম রিপু বলেন, আমার যোগসাজশে ফাইলকেও বাসায় নিয়ে গেছে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার কাছে যখন এই শিক্ষকের ফাইল এসেছিল, আমি ডকুমেন্টগুলো পেয়েছিলাম। কিন্তু প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্তের কপিতে সেগুলো পাইনি। দুই জায়গায় অমিল পাওয়ায় আমি বিভাগীয় সভাপতিকে বিষয়টা জানাই। তারপর আমি প্ল্যানিং কমিটি যা লিখেছে আর বাস্তবে ফাইলে যা যা পেয়েছি, দুটি তথ্যই তুলে ধরেছি। এরপরে ফাইলটি ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে পাঠানো হয়েছে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য। এর মধ্যে নতুন ডকুমেন্টস কীভাবে ঢোকানো হয়েছে তা আমি বলতে পারবো না। প্ল্যানিং কমিটি বিস্তারিত বলতে পারবে। 

জানতে চাইলে প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কুমার সরকার বলেন, তার আবেদনের প্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে প্ল্যানিং কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে তার পদোন্নতির সুপারিশ করে আবেদনপত্রটি রেজিস্ট্রার অফিসে প্রেরণ করা হয়। পরে প্রশাসন থেকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও মতামত চেয়ে ফাইল ফেরত আসলে প্ল্যানিং কমিটির সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করে কিছু অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এগুলো তুলে ধরেই আমরা প্রশাসনে ফাইলটি পাঠিয়েছি। 

আগের ডকুমেন্টস উধাও করে নতুন ডকুমেন্টস সংযুক্ত কীভাবে হয়েছে - জানতে চাইলে তিনি বলেন, উনার আবেদনের সঙ্গে যে যে কাগজপত্রযুক্ত ছিল সেগুলোর ব্যাপারে আমরা উল্লেখ করেই দিয়েছিলাম। কোনো ডকুমেন্টস থাকার পরেও আমরা সেটা উল্লেখ করিনি, এমনটা হয়নি। এখন নতুন কোনো কাগজপত্র কীভাবে উনার ফাইলের সাথে সংযোজন বিয়োজন হলো সেটা প্ল্যানিং কমিটিরও প্রশ্ন। বিষয়গুলো প্ল্যানিং কমিটি খতিয়ে দেখে যাচাই-বাছাই করে রেজুলেশন আকারে আমাদের সিদ্ধান্ত প্রশাসনকে জানিয়েছি। এখন প্রশাসন বাকিটা দেখবেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, প্ল্যানিং কমিটির নথি প্রেরণের পর নতুন কোনো ডকুমেন্টস সংযোজন বা বিয়োজন করার জন্য ওই শিক্ষকের কোনো আবেদন আমি পাইনি। কোনো একটা কারণে তার প্রমোশনের ফাইলটি আবার ভাইস চ্যান্সেলর মহোদয়ের নির্দেশে নতুন করে মতামত চেয়ে প্ল্যানিং কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। সেটাও প্ল্যানিং থেকে এসেছে সম্ভবত। তবে ফাইলে নতুন কোনো কাগজপত্র সংযুক্তির ব্যাপারে আমার জানা নেই।

জবিতে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে আয়োজিত সেমিনারে গেলেই মিলবে ২ কোর…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীকে মারধর, ৪ সেমিস্টারের জন্য বহিষ্কার…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীমান্ত হত্যাকে বৈধতা দিয়েছেন—দাবি হাসনাত…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
মেস থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর অর্ধগলিত মরদ…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
তুরস্কের পামুক্কালে বিশ্ববিদ্যালয় ও নোবিপ্রবির মধ্যে একাডেম…
  • ২২ জুলাই ২০২৬
এমপি নজরুলের বিয়ের কাবিননামা নিয়েও চাঞ্চল্য, কোথায় বিয়ে হয়ে…
  • ২২ জুলাই ২০২৬