৬৪ জেলার ২৬টিতে নেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সুপারিশ আছে ৬টিতে, দাবি উঠছে বাকিগুলোতেও

০২ জুলাই ২০২৬, ০৪:৫৭ PM , আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৪ PM
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত

একসময় নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে সড়ক, সেতু, হাসপাতাল কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্পের দাবি তুলতেন সংসদ সদস্যরা। কিন্তু সেই চিত্র বদলেছে। সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনগুলোতে প্রত্যেক এমপিকে নিজ আসনে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলতে দেখা গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক চাহিদার চেয়ে উচ্চশিক্ষার মান, অবকাঠামো ও শ্রমবাজারের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বর্তমানে দেশের ২৬টি জেলায় কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এদিকে ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কক্সবাজার, ভোলা, নড়াইল, রাজবাড়ী, বরগুনা ও জয়পুরহাটে নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করলেও তিন বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এসব সুপারিশ কার্যকর হলে দেশের ৪৪ জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। 

ইউজিসি সূত্রে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬২। শিক্ষা কার্যক্রম চলমান ৫৪টিতে। গত দেড় দশকে ৩২টি নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখানে ২০০৯ সালের আগে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৩০টি।

এভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায় জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন প্রতিষ্ঠিত অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্তত আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া করা ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও শিক্ষক সংকট, কোথাও গবেষণাগার ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়ে গেছে।

এ অবস্থায় সম্প্রতি সংসদে বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যে নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন নতুন সংসদ সদস্যরা। ইতোমধ্যে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি নওগাঁ, মুন্সিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার এমপিরা।

বিএনপির নাটোর-নওগাঁ সংরক্ষিত নারী আসন থেকে মনোনীত সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি সম্প্রতি সংসদে নিজ জেলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় চেয়ে বলেন, ‘নাটোরের শিক্ষা ব্যবস্থা খুবই পিছিয়ে আছে। নাটোরের আশপাশের সব জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও আমাদের জেলায় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। তাই আমি মাননীয় স্পিকারের মাধ্যমে নাটোর জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জোর দাবি জানাচ্ছি।’

শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধু আইন পাস বা নাম ঘোষণার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িত পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন, প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। এসব নিশ্চিত না করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলে উচ্চশিক্ষার সংকট আরও বাড়তে পারে।

৭ জেলায় ৩২ বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে রাজধানী ঢাকায়; সংখ্যার হিসেবে এটি ১০। এরপর রাজধানীর নিকটতম জেলা গাজীপুর এবং দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে রয়েছে সমান সংখ্যক ৫টি করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভাগীয় জেলা খুলনায় ৪টি; রাজশাহী ও সিলেটে ৩টি করে এবং সর্বশেষ প্রতিষ্ঠিত বিভাগ ময়মনসিংহে রয়েছে ২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

২৬ জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয়
দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সরকারের সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেশে প্রতিষ্ঠা পায় ২২ টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অবস্থানের বিচারে কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, চাঁদপুর, রাঙামাটি, নোয়াখালী, কুমিল্লা, যশোর, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, মেহেরপুর, নওগাঁ, নেত্রকোণা ও জামালপুরে স্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান পরিচালনা করছে এসব সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়ার অনুমোদন
বিগত আগস্টে নাটোরে একটি এবং সেপ্টেম্বরে সাতক্ষীরা ও নারায়ণগঞ্জ নতুন করে আরও ২টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নওগাঁ ও ঠাকুরগাঁও জেলায় দুটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা।

৬ জেলায় নতুন করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ
দেশের উচ্চশিক্ষা বিন্যস্তকরণ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সম্ভাবনা বিবেচনায় নতুন করে আরও ৬ জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব জানিয়েছে ইউজিসি। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রস্তাবনায় দেশের উচ্চশিক্ষার তদারক সংস্থাটি কক্সবাজার, ভোলা, নড়াইল, রাজবাড়ি, বরগুনা ও জয়পুরহাটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ জানিয়েছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই দেশের ২০ জেলায়
উচ্চশিক্ষা বিস্তারে দেশের প্রতিটি জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনায় সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে ৪৪ জেলায়। সরকারি সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষিসহ বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পাঠদান করছে উচ্চশিক্ষালয়গুলো। তবে সরকারের ব্যাপক উদ্যোগের পরও এখনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি দেশে বর্তমানে এমন জেলার সংখ্যা ২০টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে নেই কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকার দিক থেকে ঢাকার পরেই রয়েছে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগ। খুলনা বিভাগের ৪টি জেলায় নেই কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। জেলাগুলো হলো- চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, বাগেরহাট ও ঝিনাইদহ। তবে সরকারের ধারাবাহিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অচিরেই এমন জেলায়ও সরকারি উদ্যোগে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা জেলাগুলোর সচেতন মহল।

চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এরপর রংপুর বিভাগের ৩ জেলায়- পঞ্চগড়, নীলফামারী ও গাইবান্ধা এবং বরিশাল বিভাগের একটি জেলা ঝালকাঠিতে নেই কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। একই সাথে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই এমন জেলার তালিকায় রয়েছে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার এবং সদ্য ও সর্বশেষ প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলা।

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না; সমান গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষার মানোন্নয়নেও। অন্যথায় তা উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য তৈরি করতে পারে নতুন চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের কিছু আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়; যেমন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের আগে আমাদের এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি চাকরির বাজার বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠদান এবং দক্ষ শিক্ষার্থী অর্থাৎ মানবসম্পদ তৈরিতে জোর দিতে হবে। সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন পরিহার করতে হবে।

দুই ইংলিশ মিডিয়ামে কুরআনের হাফেজ হলেন ১০০ শিক্ষার্থী, দেওয়া…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
এমপি নিলোফার মনির বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করল ছাত্রদল, য…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভুয়া প্রবেশপত্রে পরীক্ষা দিতে এসে আটক ২
  • ০২ জুলাই ২০২৬
অ্যাসিস্ট্যান্ট টেরিটরি সেলস ম্যানেজার নিয়োগ দেবে প্রাণ গ্র…
  • ০২ জুলাই ২০২৬
সিসিটিভিতে ধরা, জামালপুরে মোবাইল নিয়ে পরীক্ষা দিতে এসে বহিষ…
  • ০২ জুলাই ২০২৬