খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় © সম্পাদিত
যৌন হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলনের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুবি) অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। প্রশাসনিক ভবন ও অন্যান্য অ্যাকাডেমিক ভবনের তালা খুলে দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকও এখনো বন্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা যেমন আন্দোলনের দাবিগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চান, তেমনি দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে দ্রুত পরীক্ষা ও ক্লাস শুরুরও প্রত্যাশা করছেন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে, নারী শিক্ষার্থীদের ভিডিও ধারণের ঘটনায় অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
ইতোমধ্যে এসব দাবির কয়েকটির বিষয়ে প্রশাসন পদক্ষেপ নিয়েছে। অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক সব ধরনের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডির জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়গুলো এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে চলমান আন্দোলনের কারণে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি স্কুলের প্রথম বর্ষের প্রথম টার্ম পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাও কাম্য নয়।
গণিত ডিসিপ্লিনের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এটাই আমাদের প্রথম টার্ম ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই আন্দোলন শুরু হওয়ায় বাকি পরীক্ষাগুলো আর দিতে পারিনি। আমরা অবশ্যই পরীক্ষা দিতে চাই, কারণ সেশনজট বা অ্যাকাডেমিক ক্ষতির মুখে আমরা পড়তে চাই না। তবে একই সঙ্গে আমরা চাই, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন হোক। আমাদের কাছে ন্যায়বিচার এবং শিক্ষা দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
একই ডিসিপ্লিনের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মো. সাহেদ বলেন, প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন ও প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে পরীক্ষা মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব পরীক্ষা আবার শুরু হোক। একই সঙ্গে প্রশাসন যেন শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। আমরা চাই, ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে চলুক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর বাস্তবায়নে অগ্রগতি হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক মো. সালাউদ্দিন বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেসব কাজের অগ্রগতি এখন বেশ ভালো। আমরা যে সময়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ সেই সময়ের মধ্যেই কাজগুলো সম্পন্ন হবে।
ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন শিক্ষক হিসেবে এবং প্রশাসনের অংশ হিসেবে আমরা এতে চরমভাবে ব্যথিত ও দুঃখিত। আমরা চাই এ ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও বিচার হোক। বিচার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং প্রশাসন এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে।
অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। বিচার প্রক্রিয়া চলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক ক্ষতি যেন না হয়, সেটিও আমাদের দায়িত্ব। তাই আমরা চাই ক্লাস-পরীক্ষা স্বাভাবিক হোক, যাতে একজন শিক্ষার্থীকেও অতিরিক্ত সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে না হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের কোর্স চার বছরেই শেষ করার যে সুনাম রয়েছে, সেটি ধরে রাখতে শিক্ষক ও ডিসিপ্লিনগুলো সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক বন্ধ থাকার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ছাত্রবিষয়ক পরিচালক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তো শিক্ষার্থীদের জন্যই ক্যাম্পাসে আসেন। কিন্তু মূল ফটক বন্ধ থাকায় তাঁদের সাব-গেট (পুলিশ ফাঁড়ি গেট) দিয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। এভাবে বিকল্প পথ দিয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে অনেক শিক্ষকই অসম্মানিত বোধ করছেন। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার আন্তরিক অনুরোধ, মূল ফটকটি খুলে দেওয়া হোক। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্যই একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক পরিবেশ বজায় থাকবে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে সংবেদনশীল আছি এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান করতে চাই।