ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম সদস্যসচিব বাধন বিশ্বাস স্পর্শ © সংগৃহীত
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে কমেন্ট করার ধরে জুনিয়র শিক্ষার্থীকে হল থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকি এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম সদস্যসচিব বাধন বিশ্বাস স্পর্শ। ফেসবুকে করা মন্তব্যের জেরে অকথ্য গালিগালাজের এক পর্যায়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর হলের সিটের ব্যাপারেও দেখে নেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
ইবির বিতর্কিত এই ছাত্রনেতা এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম সজীব হাসান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ইবির বিতর্কিত এই ছাত্রনেতার এমন কর্মকাণ্ডে তিনি ভীত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্জেন্টিনা ফ্যানস ইউনিটির একটি কমিটি গঠন করা হয়। যেখানে সভাপতি হিসেবে আসিফ হাসান লিখনকে দেখা যায়। কমিটি প্রকাশের কিছুক্ষণ পর একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে ইবির বৈছাআর যুগ্ম সদস্যসচিব বাধন বিশ্বাস স্পর্শ ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি আর্জেন্টিনা ফ্যানস ইউনিটির কমিটিকে ছাত্রলীগের পুনর্বাসন কমিটি হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সভাপতি আসিফ হাসান লিখনকে ছাত্রলীগের দোসর এবং জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারী হিসেবে তকমা দেন।
এ সময় এই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে ‘বান্ধুবির টাকা মেরে, ডেকোরেটরের চেয়ার খেয়ে মনে হয় বাধন ভুলে গেছে, সে নিজেও ছাত্রলীগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল’ বলে মন্তব্য করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সজীব। মন্তব্যের কিছুক্ষণ পর অভিযুক্ত বাধন সজীবকে মুঠোফোনে কল দেন। ফোন ধরতে না পারায় সজীব তাকে আবার ফোন করলে কথোপকথনের এক পর্যায়ে অভিযুক্ত বাধন অকথ্য ভাষায় সজীবকে গালিগালাজ করতে থাকেন। সিনিয়র হয়ে এভাবে গালিগালাজ করার কারণ জানতে চাইলে তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সজীবকে হুমকি দিতে থাকেন এবং মন্তব্যের প্রমাণ চাইতে থাকেন। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে প্রমাণ দিতে না পারলে সজীবের খবর আছে বলেও হুমকি দেন বাধন।
আরও পড়ুন: র্যাগিংয়ের ভিডিও করায় প্রক্টরের সামনে সাংবাদিক ও রাকসু নেতাদের ওপর হামলা
অডিও রেকর্ডে বাধনকে বলতে শোনা যায়, ‘তুই যে দুইটা বলছিস না, ঐ দুইটার প্রমাণ দিবি, ঠিক আছে? সাংবাদিকও প্রমাণ দিতে পারেনি। আজকে সন্ধ্যার মধ্যে ঐ দুইটার প্রমাণ না দিলে কিন্তু আমি নূর ভাইকে (ইবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি) বলব। তুই আমি আমি সাদ্দাম হলের প্রভোস্টের কাছে বলব। এ তুই আসছিস নভেম্বরে, তোর বড় ভাই সম্পর্কে আমার নিজের ব্যাচের বন্ধুরা আছে, সে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছে, সে ছাত্রলীগ মিছিল করছে, তারপর আমরা জুলাইর পর তাকে বের করে দিছি, সে আবার শহরে গেছে, শহর থেকে আবার ব্যাক করছে। তুই এসব ইতিহাস জানিস?’
এ সময় সজীব কথার পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলতে চাইলে বাধন অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে সজীব বলেন, ‘কথা বলতে না দিলে আমি আপনার সাথে কথা না বলি।’ এই প্রত্যুত্তরে বাধন নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে বলেন, ‘আরেকটা কথা বললে কিন্তু রুমে আসবনে। তুই কি পাইছিস? কার রুমে আছিস তুই? ছাত্র ইউনিয়নের তিনটা সিট জানিস না তুই?’ এরপর ক্রমাগত সজীবকে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন বাধন। একপর্যায়ে সজীবের বিভাগের কোন বাপ আছে, কে তাকে বাঁচায়, তা দেখে নেওয়ার হুমকিও দেন বাধন।
এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ইবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদও তার সঙ্গে পারে না বলেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করতে শোনা যায় কল রেকর্ডে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী সজীব বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের পর ক্যাম্পাসে আসায় আগে কে কী করত, কোন রাজনীতির সঙ্গে ছিল, তা আমার জানার কথা না। বাধন ভাইয়ের পোস্টে কমেন্ট করার পরে উনি আমাকে কল দিয়ে খুবই অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে, থ্রেট দেয় নানাভাবে, প্রাণনাশের হুমকি দেয়। আমাকে ক্যাম্পাসে কেউ বাঁচাতে পারবে না, কোনো টিচার, কোনো স্যার কেউ আমাকে বাঁচাতে পারবে না—এই ধরনের কথাবার্তা বলে। এমতাবস্থায় আমি নিরাপত্তার শঙ্কায় ভুগছি।’
‘উনি আমাকে হল থেকে বের করে দেওয়ার কথাও বলেছে। উনি কোন ক্ষমতাবলে বা কোথা থেকে শক্তি পেয়ে এ ধরনের কথাবার্তা বলছে আমার জানা নাই। তবে আমার মনে হয় উনি ওনার রাজনৈতিক অবস্থানের অপব্যবহার করছেন। আমি প্রশাসনের কাছে আমার সার্বিক নিরাপত্তা চাই’ যুক্ত করেন ভুক্তভোগী সজীব।
আরও পড়ুন: ইউএস নিউজ বেস্ট গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে দেশসেরা রাবি
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে অভিযুক্ত বাধন বিশ্বাস স্পর্শকে একাধিকবার মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করা হলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া এ ব্যাপারে ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এস এম সুইটের মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. শাহীনুজ্জামান বলেন, ‘ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর কাছ থেকে গতকাল আমরা একটি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। কিছুক্ষণ আগে সে এসে লিখিতভাবেও অভিযোগ জমা দিয়ে গেছে। এখন আমি প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সদস্যসচিব বাধন বিভিন্ন সময় নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ক্যাম্পাসজুড়ে সমালোচিত হয়েছেন। কিছুদিন আগে তার বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীর ফরম ফিলাপের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তোলায় সেই শিক্ষার্থী ও তার স্বামীকে হুমকি দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে ইবিতে আয়োজিয় জাতীয় ছাত্রশক্তির হ্যাঁ ভোটের প্রচারণায় বাধা দেন তিনি। এ সময় অনুষ্ঠানস্থল থেকে অতিথিদের বসার চেয়ার ও বৈদ্যুতিক তার নিয়ে সাদ্দাম হোসেন হলের গেস্টরুমে আটকে রাখেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত মন্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্যাম্পাসের ছাত্রনেতাদের নিয়ে অপমানসূচক মন্তব্য করে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি।