জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নিয়োগ পাওয়া গৌতম বড়ুয়া © টিডিসি সম্পাদিত
জনসংযোগ দপ্তর—যেকোনো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষা, ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে। দেশের সরকারি ও বেসরকারি কলেজের তদারক প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও জনসংযোগ দপ্তর রয়েছে। সেখানে পরিচালকসহ মোট ৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। এরপরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে প্রায় সোয়া এক লাখ টাকা মাসিক বেতনে চুক্তিভিত্তিক গৌতম বড়ুয়া নামে একজনকে ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার স্থায়ী কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। ফলে চুক্তিভিত্তিক এ নিয়োগটি নিয়ে চরম অসন্তোষ রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মিডিয়া উপদেষ্টা’ হিসেবে গৌতম বড়ুয়াকে নিয়োগ দেন তিনি। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপত্র প্রদান করেন। এর আগে সেটি সিন্ডিকেটের এক সভায় পাস করান উপাচার্য।
নিয়োগপত্রের তথ্য বলছে, গৌতম বড়ুয়াকে অস্থায়ীভাবে মাসিক সর্বসাকুল্যে এক লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিয়োগের শর্তাবলি ও কাজের অধিক্ষেত্র উল্লেখ রয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে ‘মিডিয়া উপদেষ্টা’ অথবা ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নামে কোনো পদ নেই বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
তার এই নিয়োগ নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করা শীর্ষ কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে মুখ খুলেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, উপাচার্য এ নিয়োগটি সিন্ডিকেটের সভায় পাস করেছেন। তাই সেখানে তাদের আর কিছু বলার ছিল না। আর উপাচার্য এই নিয়োগের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন বিভাগ দুর্বল হওয়ায় এই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তদারক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) বলছে, এই ধরনের নিয়োগের কোনো বৈধতা নেই। এটা অর্থ অপচয় ও উপাচার্যের ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া কিছুই নয়।
জানা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস রাজধানী ঢাকার অদূরে গাজীপুরে অবস্থিত। তবে রাজধানীর ধানমন্ডিতে নগর কার্যালয় রয়েছে। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়টিও কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ গৌতম বড়ুয়া মূল ক্যাম্পাসে যান না। তিনি ধানমন্ডিতে নগর কার্যালয়ে নিয়মিত বসেন। সেখানে তার জন্য একটি কক্ষও বরাদ্দ রয়েছে।
কেন মূল ক্যাম্পাসে যান না, সেটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তাদের দাবি, ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নয়, গৌতম বড়ুয়াকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উপাচার্যের বিশেষ উদ্দেশ্যে পূরণ করার জন্য। তাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে সর্ম্পক ও যোগাযোগের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি বাইরের কাজ বেশি করে থাকেন। কলেজের অধিভুক্তি যাচাই, তদন্ত, নিয়োগ পরীক্ষায় রাখাসহ প্রভৃতি কাজেও তিনি নিয়োজিত থাকেন। যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কাজের জন্য আলাদা দপ্তর রয়েছে।
নিয়োগপত্র সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৩০ অক্টোবর এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান গৌতম বড়ুয়া। নিয়োগপত্রে তার দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়—বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, প্রেস রিলিজ ও সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত ও প্রচার, প্রেস কনফারেন্স ও ইভেন্ট আয়োজন, কলেজ ডিরেক্টরি প্রকাশ, জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ওয়েবসাইটের জন্য কনটেন্ট তৈরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা, গণমাধ্যম সমন্বয় এবং সংকটকালীন পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে পরামর্শ দেওয়া। এছাড়া উপাচার্যের নির্দেশনা অনুযায়ী “অন্যান্য দায়িত্ব” পালনের কথাও নিয়োগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জনসংযোগ দপ্তর থাকা অবস্থায় নতুন করে ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নিয়োগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের অভিযোগ, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও গৌতম বড়ুয়াকে বিভিন্ন কলেজের অধিভুক্তি, পরিদর্শন ও তদন্ত কার্যক্রমে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি এসব কাজে অংশ নিয়ে তিনি সম্মানীও গ্রহণ করছেন।
কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, কলেজ অধিভুক্তি–সংক্রান্ত নানা কার্যক্রমেও তার প্রভাব রয়েছে। অথচ এসব দায়িত্ব প্রশাসনিক ও একাডেমিক সংশ্লিষ্টদের আওতায় থাকার কথা।
এদিকে প্রতিবেদকের হাতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অফিশ আদেশে ঢাকার একটি কলেজের স্নাতকোত্তর (শেষ পর্ব) শিক্ষাকার্যক্রমে অর্থনীতি, মার্কেটিং, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং এবং সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের অধিভুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে গৌতম বড়ুয়াকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অথচ তার শিক্ষাগত যোগত্য ইংরেজি বিষয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে জনসংযোগ দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, সেখানে আলাদা করে উচ্চ বেতনে ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ নিয়োগের প্রয়োজন কী ছিল? একই সঙ্গে অনুমোদনহীন একটি পদে নিয়োগ দিয়ে তাকে প্রশাসনিকভাবে কতটা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটিও এখন আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে ইউজিসির এক দায়িত্বশীল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এই ধরনের নিয়োগের বৈধতা নেই। অর্থ অপচায় ও উপাচার্যের ক্ষমতার অপব্যবহার। এছাড়া এমন কোনো নিয়োগের বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনকে অবগত করেনি।
জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তি মূলত অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন বিভাগ দুর্বল হওয়ায় আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা ও যোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করতে তাকে যুক্ত করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এবং অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাকালীন কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও কেন আলাদা কমিউনিকেশন এক্সপার্ট প্রয়োজন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা সবাই যোগ্য। তবে তারা বিভিন্ন প্রশাসনিক, পরীক্ষা, অধিভুক্তি ও তদন্তের কাজে ব্যস্ত থাকেন। অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মানের রিপোর্ট পাওয়া যায় না বলেই বাইরের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া হয়।
কমিউনিকেশন এক্সপার্টকে বিভিন্ন কলেজের অধিভুক্তি বা তদন্ত কাজে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অধিভুক্তির কাজে নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কর্মকর্তারাই যান। তবে কোনো কোনো সংবেদনশীল বিষয়ে অথেনটিক রিপোর্টের প্রয়োজন হলে বাইরের বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদেরও টিম মেম্বার হিসেবে নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞদেরও এ ধরনের কাজে যুক্ত করা হয়। এটি নতুন কিছু নয়, আগে থেকেই এমন চর্চা রয়েছে।
তবে মার্কেটিং, অর্থনীতি বা ফিন্যান্সের মতো বিষয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা ব্যক্তিকে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের বিষয়ে সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকরাই যান। যদি কোথাও ব্যত্যয় ঘটে থাকে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
জানতে চাইলে ‘কমিউনিকেশন এক্সপার্ট’ গৌতম বড়ুয়ার সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করার পরও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপের এক বার্তায় তিনি জানান, পারিবারিক অসুবিধার কারণে তিনি এখন সাড়া দিতে পারছেন না।
কে এই গৌতম বড়ুয়া?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের উপাচার্য ও জনসংযোগ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকায় খুঁজেও গৌতম বড়ুয়ার নাম-পরিচয় বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে সাধারণত তাদেরও তালিকা ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইন ও ফেসবুকে তার দুটি আইডি খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ফেসবুকে Gautam Barua নামের একটি আইডিটি খুঁজে পাওয়া যায়। এখন পরিবর্তন করে Brian Tomlinson নামে রাখা হয়েছে আইডিটি। আইডিটি লক করে রাখায় আর বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।
আর Gautam Barua নামের লিংকডইন আইডিটিতে গিয়ে দেখা যায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক করেছেন তিনি। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় উল্লেখ রয়েছে-২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বৈশাখী টিভিতে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর বাংলাদেশ লিগ্যাল টাইমস (https://bdlegaltimes.com/) নামে আইনবিষয়ক একটি ইংরেজি ম্যাগাজিনে নিউজ এডিটর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে গৌতম বড়ুয়া বেসরকারি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক এবং অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন বলে উপাচার্য দাবি করেছেন। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির একটি অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। সেখানে গৌতম বড়ুয়ার পদবি হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া উপদেষ্টা ও ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির গেস্ট ফ্যাকাল্টি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে এরকম কারও তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।