সাংবাদিক ও ছাত্রসংগঠনের সাথে মতবিনিময়

ভুয়া বিল-ভাউচারে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র উপদেষ্টার লাখ টাকা আত্মসাৎ!

০২ মে ২০২৬, ০৯:১৬ PM , আপডেট: ০২ মে ২০২৬, ০৯:২৫ PM
অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম

অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন গ্রিন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের বিরুদ্ধে আপ্যায়ন বিলের ভুয়া ভাউচারে দেড় লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ক্যাম্পাসের সাংবাদিক ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার নামে আপ্যায়ন ব্যয় দেখিয়ে এসব অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। তবে, তার কার্যালয়ে তেমন একটা মতবিনিময় সভাই হয়নি বলে জানিয়েছেন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

কয়েকদিন আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক হারে আপ্যায়ন বিল উত্তোলনের অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইবির আপ্যায়ন বাজেট ছিল ১৩ লাখ টাকা। তবে প্রশাসনের অস্বাভাবিক আপ্যায়ন ব্যয়ে মাত্র ৫ মাসেই শূন্য হয়ে যায় আপ্যায়ন বাজেট। বিষয়টি সন্দেহজনক হওয়ায় গতবছরের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন দপ্তরের নামে উত্তোলনকৃত আপ্যায়ন বিল যাচাই-বাছাই করে দেখা যায়, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের নামে এই অফিসের আপ্যায়ন বিল উঠেছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩২০ টাকা। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুয়া ভাউচারে অর্থ উত্তোলন করেছেন তিনি। 

বিলের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, অধিকাংশ আপ্যায়ন বিল ই তোলা হয়েছে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার নামে। তন্মধ্যে, গত ২২ সেপ্টেম্বর জুলাই বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ছাত্র সংগঠনের সাথে মতবিনিময় সভার বিল বাবদ ২২,০৫০ টাকা, ২৫ অক্টোবর সাংবাদিক ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সাথে মতবিনিময় সভা বাবদ আপ্যায়ন বিলে ২২০৫০ টাকা, এরই এক সপ্তাহ পর ২ নভেম্বরে ৩টি সভা বাবদ আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১,৬০০ টাকা, একই দিনে আবারও ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২১,৪২০ টাকা, ১৭ নভেম্বর তারিখে একইসাথে ছাত্র সংগঠনের সাথে ৩টি সভার আপ্যায়ন বিল বাবদ ২২,১৪০ টাকা এবং অর্থনীতি ও জিওগ্রাফি বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় বাবদ ২২,০৫০ টাকা আপ্যায়ন বিল তোলা হয়েছে। 

এসব বিলে ক্যাম্পাসের মেইন গেটের ইবি স্ন্যাকস দোকানের প্যাকেট প্রতি ৩০০ টাকা মূল্যের বিরিয়ানি এবং যেদিন বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়নি সেসব সভায় ঝাল চত্বরের অভি ক্যাফের ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার প্যাকেট দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব দোকান থেকে মাঝেমধ্যে প্রশাসনের লোকজন খাবার নিলেও ক্যাশ মেমো নেওয়ার সময় দোকানদারের স্বাক্ষর নিয়ে একাধিক ফাঁকা মেমো নিয়ে যান। পরবর্তীতে এসব মেমো প্রয়োজনমতো কাজে লাগানো হয়। পরিচয় গোপন রেখে এসব দোকান থেকে প্রতিবেদক নিজেও একাধিক ফাঁকা মেমো নিয়ে এসেছেন যেখানে ইচ্ছেমতো খাবারের বিবরণ ও দাম বসিয়ে বিল উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে। 

এ ব্যাপারে ঝাল চত্বরের অভি ক্যাফের মালিক আলমগীর বিশ্বাস কে ছাত্র উপদেষ্টার জমা দেওয়া ২০০ টাকা মূল্যের নাস্তার মেমো দেখিয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমার দোকানে তো কোনো প্যাকেট ই নাই আর আমি নাস্তা বানাইও না। সেখানে আমি প্যাকেট করে নাস্তা বিক্রি করবো কীভাবে। আর আমি প্যাকেট নাস্তা বিক্রিও করি না। এগুলোর ব্যাপারে আমার জানা নেই। 

ইবি স্ন্যাকসের মালিক এনামুল কবির জানান, প্রশাসনের লোকজন তার দোকান থেকে সচরাচর যেসব বিরিয়ানি নেয় সেগুলো খাসির বিরিয়ানি, দাম ১৮০ টাকা। অর্ডার ব্যতীত সাধারণ সময়ে ৩০০ টাকা প্যাকেটের কোনো বিরিয়ানি বিক্রি করেন না তিনি। 

এছাড়া, যেকোনো মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হলে সাধারণত সভার রেজুলেশন তৈরি করার কথা থাকলেও এসব বিলের সাথে সভার কোনো রেজুলেশন কপি পাওয়া যায়নি। এসব সভার রেজুলেশন বা বিলের ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য চাইলে উপরমহলের অনুমতি ছাড়া তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা। 

আবার, ভিন্ন ভিন্ন দিনে ও ভিন্ন ভিন্ন ভাউচারে বিল তোলা হলেও একই অঙ্কের (২২,০৫০৳) বিল একাধিক দিনে উত্তোলিত হওয়ায় সন্দেহের মাত্রা বেড়েছে। কেননা একাধিক দিনের মতবিনিময় সভায় উপস্থিত সদস্যবৃন্দের সংখ্যা একই হওয়াটা অস্বাভাবিক। এখানে পূর্বেই দোকান থেকে নিয়ে আসা ফাঁকা ভাউচার একাধিক দিন ভিন্ন ভিন্ন নামে ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলন করা হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।  

এদিকে, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন গুলো ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে কোনো মতবিনিময় সভা করেননি। তাই তাদের সাথে মতবিনিময় সভার নামে উত্তোলনকৃত এসব বিলের ব্যাপারেও জানেন না তারা। 

খেলাফত ছাত্র মজলিসের সভাপতি জোনায়েদ বলেন, নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে কখনোই কোনো মিটিং হয়নি, তবে প্রক্টর অফিসে বিভিন্ন ইস্যুতে বসা হয়েছে। মিটিংয়ে লেক্সাস বিস্কুট, কলা, সিঙ্গারা, ডিম প্যাটিস এসব খাওয়ানো হতো। ৩০০ টাকা দামের বিরিয়ানি কখনো আমাদের খাওয়ানো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। 

তালাবায়ে আরাবিয়ার সেক্রেটারি শামীম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে মনে হয় একবার বসছিলাম তার অফিসে। এর বাইরে কোনো মতবিনিময় সভা আমরা করিনি। প্রক্টর অফিসের মিটিংয়ে নর্মাল নাস্তা খাওয়াতো আর লম্বা সময় হলে সবজি রোল খেয়েছি। অন্যান্যরা হয়তো ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে বিরিয়ানি বা ওই খাবার খেয়েছে, তবে আমি খাই নাই। আর নাস্তার দাম কোনোমতেই ৩০০ টাকা হবে না। 

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল হোসেন রাহাত বলেন, চব্বিশের জুলাইয়ের পরে ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে বিভিন্ন সংগঠনের অনুমোদন এবং বঙ্গবন্ধু চেয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে সভা হয়েছিল। এর বাইরে গত এক বছরে আমি কোনো সভা করিনি, অন্য সংগঠন করেছে কিনা জানি না। তবে আসলেও যদি কোনো সভা হতোই তাহলে আমি উপস্থিত না থাকলেও অন্তত অবগত থাকতাম। 

শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাসুদ রুমি মিথুন বলেন, ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ কোনো মিটিং করিনি। সেখানে একাধিকবার মতবিনিময় সভা করা বা ৩০০ টাকা প্যাকেট খাবার খাওয়ার প্রশ্নই ওঠেনা। যেখানে আমরা কোনো মিটিংই করিনি সেখানে আমাদের নামে কীভাবে আপ্যায়ন বিল তোলা হলো তা ঠিক জানি না। আর এই বিলের টাকা কোথায় গেলো তাও আমরা জানতে চাই। 

তবে ইবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এস এম সুইট প্রথমে বিষয়টি তার মনে নেই, কমিটির মুখ্য সংগঠক গোলাম রাব্বানীর সাথে কথা বলে জানাবেন বলে জানান। পরবর্তীতে তিনি মন্তব্য দিতে রাজি হননি। 

জিওগ্রাফি বিভাগের ২০১৯-২০ সেশনের নোমান জানান, ছাত্র উপদেষ্টার অফিসে আনুষ্ঠানিক সেরকম মতবিনিময় সভা আমরা করিনি। বিভাগের নাম পরিবর্তন ও পরীক্ষা আটকে থাকার ইস্যুতে কয়েকবার স্যারের রুমে গিয়ে কথা বলছি কিন্তু একাধিকবার রাস্তাতেই স্যারের সাথে কথা হয়েছে। এত টাকা বিল হওয়ার মতো কোনো নাস্তা আমরা খাইনি। 

বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘এত বেশি বিল হওয়ার কথা না। যদি আমার সংগঠনের নামে (প্রেসক্লাব) ৩৫ জনের বিল দেখিয়ে থাকে, তা ভুলভাবে দেখিয়েছে। প্রেসক্লাবের তখন ৩৫ জন সদস্যই ছিল না। অধিকাংশ সময় ২/৩ জনের বেশি পাঠাতাম না। পুরো সংগঠন নিয়ে মতবিনিময় থাকলেও ক্লাস-পরীক্ষার কারণে সবাই যেতে পারতো না।’

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ইবি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ হয় এই প্রতিবেদকের। গত ২৫ এপ্রিল যেসব বিল নিয়ে অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর বিবরণ তিনি তার হোয়াটস অ্যাপে দিতে বলেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করার পর আজ তিনি জানান, এগুলো অনেক আগের বিল, বিস্তারিত মনে নেই। একটি প্রজেক্টের কাজে তিনি ব্যস্ত আছেন। প্রজেক্টের কাজ শেষ হলে তিনি ফাইল দেখে এ ব্যাপারে সময় দেবেন। 

ভুয়া ভাউচারে বিল পরিশোধের ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমাদের যখন কোনো অফিস বিল পাঠায়, আমরা তো মাঠপর্যায়ে গিয়ে যাচাই করি না। যিনি বিল পাঠান তাকে বিশ্বাস করেই আমরা বিল দিই। এখন তিনি যদি ১০ জনকে খাওয়ায়ে ৫০ জন লেখেন, সেটা তো আমাদের দেখা সম্ভব না। কিন্তু যদি কোনো অভিযোগ আসে তাহলে প্রশাসন কমিটি করে যাচাই-বাছাই করে দেখবে। এমন পাওয়া গেলে তাকে টাকা ফেরত দিতে হবে। আমি কোনো অনিয়ম ছাড় দেবো না। 

খালাতো বোনের বাড়ি যাওয়ার পথে ‘গণধর্ষণ’, চারজনের বিরুদ্ধে ম…
  • ০২ মে ২০২৬
ফিনল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি রয়েছে স্থায়ী হওয়ার সুযোগ
  • ০২ মে ২০২৬
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আগুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩
  • ০২ মে ২০২৬
১২ হাজার শিক্ষার্থীর এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু কাল
  • ০২ মে ২০২৬
বৃষ্টির ভেজা ছোঁয়ায় ভ্রমণ—মেঘ, মাটি আর মনখোলা যাত্রার গল্প
  • ০২ মে ২০২৬
‘২৭ সালের মধ্যে রোহিঙ্গাদের গুডবাই জানানো হবে’
  • ০২ মে ২০২৬