আবু সাঈদ ও বেরোরি লোগো © টিডিসি সম্পাদিত
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) শহীদ আবু সাঈদের এই ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ১০৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানছে না কেউই। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদধারী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি আয়োজন করছেন। এ তালিকায় রয়েছেন খোদ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীও।
গত ৮ এপ্রিল বেরোবি প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয়তাবাদী ফোরামের কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যায় ছাত্রদল, বিএনপিপন্থী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের। সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য। এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করলে তীব্র বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও গত ৮ মার্চ বেরোবি শাখা ছাত্রদলের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক মাঠে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এম এম মুসা, রংপুর মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব মাহফুজ-উন-নবি ডনসহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা। সেখানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী। উপস্থিত ছিলেন ড. ফেরদৌস রহমানসহ বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা। এমনকি ওই দিন খাবার পরিবহন ও ইফতারের কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্স ও মাইক্রোবাস ব্যবহার করা হয়, যা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়।
আরও পড়ুন: বিদ্যুৎ জটিলতায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা
এছাড়াও ছাত্রদলের ব্যানারে কেন্দ্রীয় মসজিদে দোয়া মাহফিল, বিজয় দিবসের শোডাউন, তিলাওয়াত প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি করতে দেখা যায়।
সর্বশেষ শনিবার (১৮ এপ্রিল) নিজস্ব ব্যানারে বেরোবি শাখা ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা স্মারক মাঠে দুই দিনব্যাপী নববর্ষ প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করে, যা সকাল ৯টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলার কথা।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সকল পক্ষের এমন কার্যক্রমে ক্ষুব্ধ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, আইন প্রণেতারা নিজেরাই আইন ভঙ্গ করায় কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেরোবিতে এখনও রাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। এখানে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী কারোরই প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি করার সুযোগ নেই—অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী, বেরোবি উপাচার্য
সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে বেরোবি সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী ও শহীদ আবু সাঈদের সহপাঠী রিশাদ নুর বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের চাহিদায়। শিক্ষার্থীরা যখন দেখেছে তাদের ভাই মারা গেছে, বন্ধু জেলে গেছে, ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে অত্যাচার চলেছে, লুট চলেছে, তখন প্রতিবাদ জানিয়ে বন্ধ করেছে। এখন কিছু নব্য রাজনীতি করা মানুষ পুরোনো বন্দোবস্ত ফিরিয়ে আনতে চায়। কারণ সেখানে ক্ষমতা ও টাকার ঝনঝনানি। সেই লোভে তারা বেরোবির ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীর চাওয়াকে উপেক্ষা করছে। এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা চাই না অতীত আবার ফিরে আসুক কিছু সুবিধাভোগীর স্বার্থে।’
বেরোবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. ইয়ামিন বলেন, ‘অতীতে ছাত্রলীগের বাধার কারণে সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতি বাধাগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু কোনো একটি সংগঠনের অপকর্মের দায়ে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ও গঠনমূলক রাজনীতি বন্ধ থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হয়তো কিছু অনিয়ম ঢাকতে রাজনীতি বন্ধ রেখেছিল। এখন সময় এসেছে সুস্থ ও ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালু করার। যারা অপরাজনীতি করবে, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে।’
বেরোবি শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি মো. সুমন সরকার বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করি। কিন্তু যেহেতু ক্যাম্পাসে আগে ছাত্রদল কর্মসূচি করে নিয়ম ভেঙেছে এবং সেখানে প্রশাসনও উপস্থিত ছিল, যদি শাস্তির আওতায় আনা হয় তাহলে ক্রমানুসারে আসুক। সে ক্ষেত্রে আমাদের কর্মসূচিও চলুক, আমরাও অপরাধী হই। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে রায় দেবে আমরা তা মেনে নেব।’
এ বিষয়ে বেরোবি প্রক্টর ও রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ রয়েছে। এর আগে ছাত্রদল একটি কর্মসূচি করেছে, যা তাদের করা ঠিক হয়নি। ইফতার মাহফিলের বিষয়টি মানবিক দিক বিবেচনায় তখন বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। সেই ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে ছাত্রশিবির কর্মসূচি করছে। তবে এর পর আর কাউকে এমন সুযোগ দেওয়া হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে, ততক্ষণ ক্যাম্পাসের ভেতরে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না।’
বেরোবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলী বলেন, ‘সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেরোবিতে এখনও রাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। এখানে ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী কারোরই প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি করার সুযোগ নেই। রমজান মাসে আমি কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলাম। সে সময় দলীয় ব্যানার ব্যবহার না করতে ছাত্রদলকে নিষেধ করেছি। এছাড়াও ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা উৎসবে আমরা বাধা দিয়েছি। তারা জোর করে অনুষ্ঠান করেছে। আগামী সিন্ডিকেট সভায় আমরা বিষয়টি উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গত ৮ এপ্রিল জাতীয়তাবাদী ফোরামের অনুষ্ঠানটি কোনো দলীয় কর্মসূচি ছিল না।’