বিধি উপেক্ষা করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ
ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় © ফাইল ফটো
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহর দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছরের মধ্যেই বিধি উপেক্ষা করে যাচাই-বাছাই ছাড়া শুধু তদবির আর বাণিজ্যের আশ্রয় নিয়ে দেড় শতাধিক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক/মাস্টাররোলে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের বিস্তারিত তথ্য চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে চিঠি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। চিঠিতে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য প্রেরণের নির্দেশনা থাকলেও একমাস পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই চিঠির জবাব দেয়নি প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৪ মার্চ বিকেলে নিজ বিভাগে অফিস কক্ষে কর্মচারীর হাতে প্রাণ হারান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা। রুনার হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলু বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারীদের নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর জেরে গত ৯ মার্চ একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘বিধি উপেক্ষা করে দেড় শতাধিক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
পরে গত ১২ মার্চ ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক মাস্টাররোল কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। এতে বলা হয়, সম্প্রতি আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক/মাস্টাররোল কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মর্মে বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এমতাবস্থায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগকৃত দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক/মাস্টাররোল কর্মচারীর সংখ্যা এবং অদ্যাবধি দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক/মাস্টাররোল কর্মচারীর সংখ্যা (নাম, পদবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, নিয়োগের তারিখ ও নিয়োগের কারণ উল্লেখপূর্বক) পরবর্তী ০৫ (পাঁচ) কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনে প্রেরণের অনুরোধ করা হলো।
তবে সেই পাঁচ কার্যদিবস পেরিয়ে প্রায় বিশ কার্যদিবস সময় পার হয়ে গেলেও এখনো সেই চিঠির জবাব দেয়নি ইবি প্রশাসন। সংবাদের প্রেক্ষিতে ইউজিসির চিঠি ইস্যুর পরপরই ওই সংবাদের প্রতিবাদলিপি পাঠায় ইবি প্রশাসন। সেখানে প্রকাশিত সংবাদকে মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেখানে প্রশাসন জানায়, ‘ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও দপ্তরপ্রধানদের চাহিদা তদপ্রেক্ষিত সুপারিশ অনুযায়ী দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে সীমিত সংখ্যক ব্যক্তিকে দিয়ে কাজ করানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর হতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর কাছে বাজেট চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে।’
প্রতিবেদকের হাতে থাকা তথ্য বলছে, ইবি প্রশাসন নিজেই মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী ইউজিসির কাছে বাজেট চেয়ে আবেদন পাঠানো হলেও এখনো সেই বাজেটের অনুমোদন হয়নি। কিন্তু গত ১৫ মার্চ, যেদিন ওই প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়েছে, ঠিক সেদিন-ই ৩৫টি চেকের বিপরীতে প্রায় ২ লক্ষাধিক টাকা বিভিন্ন বিভাগীয় সভাপতি ও অফিস প্রধানদের নামে দৈনিক মজুরীর ফেব্রুয়ারি/২৬ মাসের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এখন থোক বরাদ্দে ইউজিসির স্থগিতাদেশ এবং দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ইউজিসির বাজেটের অনুমোদন না থাকলেও কীভাবে এই অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে, আর ইউজিসির অনুমোদন না পেলে সেক্ষেত্রে এই কর্মচারীদের ভবিষ্যত কী—সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বেশিরভাগ বিভাগে স্থায়ী কোনো পিয়ন বা কর্মচারী নেই। কিন্তু বিভাগ বা প্রশাসন তো চালাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিধ খাত বলতে একটি খাত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তাৎক্ষণিক বিভিন্ন প্রয়োজন এই খাত থেকে মেটানো হয়। আপাতত এই খাত থেকে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হচ্ছে। তবে শীঘ্রই ইউজিসির অনুমতি চেয়ে আবারো চিঠি দেওয়া হবে।
আর নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও চিঠির জবাব না দেওয়ার ব্যাখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, ইউজিসির চিঠি টা পেয়েছি। সে অনুযায়ী আমরা দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক কর্মচারীদের তালিকা প্রস্তুত করছি। সব দপ্তরের তথ্যপ্রাপ্তি এখনও শেষ হয়নি। তাই তালিকা চূড়ান্ত না হওয়ায় জবাব দেওয়া হয়নি। যেহেতু, এটি একটি সিরিয়াস বিষয় তাই আমরা চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে জবাব দিতে।
জানতে চাইলে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক গোলাম মোস্তফা বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক/মাস্টাররোলে নিয়োগকৃত কর্মচারীদের তথ্য চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ কার্যদিবসের সময় দেওয়া হলেও আমাদের দপ্তরে জবাব এসেছে কি-না জানি না। তবে এখন পর্যন্ত আমার টেবিলে জবাব আসেনি। যদি তারা তথ্য না-ই দেয়, তাহলে আমরা আবারও চিঠি দেব। আর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এদের তথ্য দিলে তবেই আমরা বাজেট অনুমোদনের ব্যাপারে পদক্ষেপ নিব। আগে তথ্য দিতে হবে।