ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের রয়েছে নানা স্বপ্ন ও উদ্দীপনা © টিডিসি
নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পেল নতুন পরিচয়। একাডেমিক জটিলতা, সেশনজট, রেজাল্ট দিতে দেরি, শিক্ষার নিম্নমান ও বৈষম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে এক পর্যায়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সাত কলেজের অধ্যক্ষদের জরুরি বৈঠকে গত ২৭ জানুয়ারি (সোমবার) ঢাবি অধিভুক্তি বাতিল করা হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের দাবির ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, শিক্ষক ও কলেজ প্রতিনিধি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ২০২৬’-এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সরকার।
৯ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির চূড়ান্ত অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। সকাল ১০টায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ কর্তৃক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এ গেজেট প্রকাশ করা হয়।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের রয়েছে নানা স্বপ্ন ও উদ্দীপনা। তারা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় মানে কেবল একটি ক্যাম্পাস নয়, বরং এটি একটি পরিচয়ের জায়গা, স্বপ্ন নির্মাণের কারখানা। এটি শুধু নতুন নামের একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়।এটি তাদের অতীতের ক্ষোভ, বর্তমানের অপেক্ষা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের সমষ্টি।
তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সোহরাওয়ার্দী কলেজ ক্যাম্পাসের অর্থনীতি বিভাগের ২৪-২৫ সেশনের মেহেদী হাসান বলেন, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির গ্যাজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার প্রতিফলন। তাই এটি আমাদের পরিচয় ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।’
তিনি বলেন, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। কোনো দলীয় রাজনীতি যেন শিক্ষা, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে। এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মুক্ত চিন্তার নিরাপদ ক্ষেত্র যেখানে মেধা ও যোগ্যতাই হবে অগ্রগতির একমাত্র মানদণ্ড।’
মেহেদী হাসান আরও বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত হবে। পিএইচডি ও গবেষণামুখী শিক্ষক, ভিজিটিং ও অভিজ্ঞ ফ্যাকাল্টির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী একাডেমিক কাঠামো গড়ে উঠবে।’
ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসের ইতিহাস বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী আবির মাহমুদ রবিন বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সূচনা নয়, বরং একটি জাতির স্বপ্নের বাস্তবায়ন, সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন এবং উচ্চশিক্ষায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আমাদের প্রত্যাশা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি হবে জ্ঞান, গবেষণা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক উৎকর্ষ কেন্দ্র। এখানে শিক্ষা হবে সময়োপযোগী ও ভবিষ্যতমুখী, গবেষণা হবে বাস্তব সমস্যা নির্ভর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, আর চিন্তাচর্চা হবে মুক্ত, যুক্তিনিষ্ঠ ও সৃজনশীল। বিষয়ভিত্তিক পিএইচডিধারী, গবেষণায় সক্রিয় ও একাডেমিকভাবে দক্ষ শিক্ষকসমাজের নেতৃত্বে এই বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান উৎপাদনের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে এটাই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।’
বাঙলা কলেজ ক্যাম্পাসের অর্থনীতি বিভাগের ২১-২২ সেশন মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘যেখানে আন্দোলনটা ছিল সিন্ডিকেটকে চুরমার করে উচ্চশিক্ষা বাস্তবতা করা। প্রত্যাশা করি আগামী ৭ বছরের মধ্যে এই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিশ্বের মুখে সুনাম অর্জন করবে। আমাদের বিশ্বাস যে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে দেশের প্রথম স্থান অর্জন করবে। এই ইউনিভার্সিটির ল্যাব ফেসিলিটিস, রিচার্জ সেন্টার, সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, আবাসন ইত্যাদি খুব আধুনিকায়ন হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুদান দেওয়ার ঘোষনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই ইউনিভার্সিটি দেশ ও দেশের বাহিরের মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্ব দাপটে এগিয়ে যাবে।’
বেগম বদরুন্নেছা কলেজ ক্যাম্পাসের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ১৯-২০ সেশনের শিক্ষার্থী জাফরিন আক্তার বলেন, ‘আমরা উপলব্ধি করি যে সংস্কার কেবল একটি অস্থায়ী ও অনিশ্চিত সমাধান,তখনই সম্মিলিতভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আমাদের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার সকল কর্মের কেন্দ্র থাকবে এই সাতটি কলেজ। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের কাঙ্ক্ষিত আশার প্রতিফলন ঘটবে বলে আমরা শতাধিক আশাবাদী।’
তিনি বলেন, ‘সাতটি ক্যাম্পাসে স্নাতক পর্যায় রেখে সময়োপযোগী নতুন সাবজেক্ট সংযোজন করবে এবং মূল ক্যাম্পাসে স্নাতকোত্তর ও অন্যান্য পর্যায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা বহাল থাকবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি। সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি।’
তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাসের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের ২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মো. সানি বলেন, ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিটির আগামী দিনে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু এটি একটি নতুন প্রতিষ্ঠান, তাই এখানে নতুন কিছু করার সুযোগ অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এটি দ্রুতই দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হতে পারে। এর জন্য যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, অভিজ্ঞ শিক্ষক মণ্ডলী এবং আধুনিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি। এ ছাড়া শিল্প ও সমাজের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে এটি একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।’
কবি নজরুল কলেজ ক্যাম্পাসের অর্থনীতি বিভাগের ২১-২২ সেশনের মোঃ রায়হান বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়া আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আশাব্যঞ্জক ঘটনা। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে আমার অনেক প্রত্যাশা রয়েছে, যেমন মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, দক্ষ ও নৈতিক নেতৃত্ব তৈরি করা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ বৃদ্ধি করা, শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস ও সুযোগ সুবিধা তৈরি করা ইত্যাদি। ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের প্রতীক। আমি চাই এটি দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।’
ইডেন মহিলা কলেজ ক্যাম্পাসের সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন মৌ বলেন, ‘আমরা চাই এই বিশ্ববিদ্যালয় হবে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত শিক্ষা অর্জন করবে, তাদের দক্ষতা, জ্ঞান ও নেতৃত্বের ক্ষমতা এমনভাবে বিকশিত হবে যে তারা বিশ্বের যেকোনো প্রেক্ষাপটে নিজের স্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞানে পারদর্শী হবে না, তারা হবে মানবিক, ন্যায়পরায়ণ এবং দায়িত্বশীল। শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণও ফলপ্রসু হবে। তাদের উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
সাদিয়া আফরিন আরও বলেন, ‘একাডেমিক মান, গবেষণার মান, আধুনিক লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাস ও পরীক্ষার কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ এবং সমালোচনামূলক চিন্তাধারায় সক্ষম করে তুলবে। এসবের মাধ্যমে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ধাপে ধাপে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের র্যাঙ্কিংয়ে উঠবে।’