ভাষার মাসজুড়েও সমালোচিত ছিল চবি ছাত্রলীগ
বছরজুড়েই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ডুবে থাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। সংঘাত-সংঘর্ষ কিংবা অস্ত্রের ঝনঝনানি- কোন কিছুতেই যেন কম যান না এই সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। শৃঙ্খলাবিরোধী এমন অপকর্মের দায়ে ২০১৭ সালের ৪ মে প্রাথমিকভাবে শাখা সংগঠনটির কার্যক্রম স্থগিত ও পরে ৬ ডিসেম্বর কমিটি বিলুপ্ত করে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ। যদিও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং বারবারই ফিরেছে পুরনো চেহারায়, স্বরূপে। যার সর্বশেষ চিত্র গোটা ভাষার মাসেও লক্ষ্য করা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাখা সংগঠনটিকে সুসংহত ও গতিশীল করতে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে সাংগঠনিক সফর করেন ৫ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় একটি প্রতিনিধি দল। তখন কমিটি দেয়ার কথা বলে পদপ্রত্যাশী ৯৬০ জনের জীবন-বৃত্তান্তও সংগ্রহ করেন ওই নেতারা। কিন্তু পরে আর সেই কমিটি দেয়া হয়নি। ফলস্বরূপ সংঘাত-সংঘর্ষও থেমে নেই। পদপ্রত্যশীরা বলছেন, নির্দিষ্ট সময় পর পর নতুন কমিটি গঠনে কেন্দ্রীয় সংগঠন আন্তরিক হলে অনেক সমস্যাই কেটে যেত।
জানা যায়, নতুন কমিটি চেয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি শাখা ছাত্রলীগের পক্ষে সাবেক সাধারণ সম্পাদক এইচ.এম.ফজলে রাব্বী সুজন কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষ নেতা বরাবর একটি খোলা চিঠি দেন। আবেদনের পরে ধরেই নেওয়া হয়েছিল, শাখা সংগঠনটিতে শৃঙ্খলা ফিরতে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা তখনও হিতে বিপরীত। তথ্যমতে, ফেব্রুয়ারি মাসেই একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগের কয়েকটি পক্ষ। এর মধ্যে কখনো হল ভাংচুর, কখনো মোটরসাইকেলে আগুন কিংবা বগিভিত্তিক রাজনীতিতে জড়িত থাকায় শিক্ষার্থী পিটিয়ে আহত করার ঘটনাও ঘটেছে।
এখানেই শেষ নয়। ভাষার মাসে নিজেদের নামে পাশে বেশকিছু কলঙ্কের দাগও লাগিয়েছে চবি ছাত্রলীগ। এর মধ্যে অস্ত্রসহ আটক, গাঁজা সেবনকালে গ্রেপ্তার, বিভিন্ন অভিযোগে বহিষ্কার এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মারধরসহ বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনা রয়েছে।
যদিও মাসের প্রথম দিকে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে শোডাউন, সম্মিলিত অমর একুশে ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন, ক্যাম্পাস পরিচ্ছন্ন কর্মসূচি, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে র্যালি, শ্রদ্ধা নিবেদন, চকবাজার ট্রাজেডির প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন, চাকসু নির্বাচনের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ছিল চোখে পড়ার মত। তবে একাধিক সংঘর্ষে এবং বিভিন্ন সাজার দায়ভার মাথায় নিতে গিয়ে ঢাকা পড়েছে ভালো দিকগুলো।
ফেব্রুয়ারি মাসে যত সংঘর্ষ
৬ ফেব্রুয়ারি পূর্ব শত্রুতার জের ধরে চবি ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে প্রায় দু’ঘন্টা যাবত ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কমপক্ষে ৫ জন আহত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সহ-সভাপতি গোলাম রসুল নিশানকে অপহরণের ঘটনায় চবি ছাত্রলীগের সিক্সটি নাইন ও উল্কা গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন ১১জন। রাতভর থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে।
২৭ ফেব্রুয়ারিও সংঘর্ষ বাধে। এদিন রাত ১০ টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হল এর মোড়ে সিএফসির ইখলাসুর রহমানের একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় বিজয়ের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় উভয় পক্ষের দু’জন এবং পুলিশের লাঠিচার্জে দুই সাধারণ শিক্ষার্থীসহ মোট চারজন আহত হয়। বিজয়ের এক কর্মীকে মারধর করায় এ সংঘর্ষ শুরু হয়।

এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি চবির শাহ জালাল ও সোহরাওয়ার্দী হলে গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে বহিরাগত এক তরুণী এবং অস্ত্রসহ ছাত্রলীগের ১৮ জনকে আটক করে হাটহাজারী থানা পুলিশ। পরদিন ছাত্রলীগের তিনকর্মীকে আসামি করে দুটি মামলা করে পুলিশ।
১৮ ফেব্রুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে চবির কলা অনুষদের ঝুপড়ি থেকে ৭টি রামদা উদ্ধার করে পুলিশ। যদিও সেই অভিযানে কাউকে আটক করা হয়নি।
এছাড়াও ৭ ফেব্রুয়ারি চবির এ এফ রহমান হলের এমদাদুল হক নামে এক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে মারধর করে হল থেকে বের করে দেয় ৭ ছাত্রলীগ কর্মী। পরে তাদের বিরুদ্ধে প্রক্টর অফিস ও থানায় অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। এর আগের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি মাদক সেবনকালে ছাত্রলীগের ছয় কর্মীকে আটক করা হয়। পরদিন ৭ ফেব্রুয়ারি তাদের সাময়িক বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের নির্বাহী আদেশে তাদের বহিষ্কার করা হয়।
এছাড়াও ১৯ ফেব্রুয়ারী ভর্তি জালিয়াতি, সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী মারধর, মোবাইল-ল্যাপটপ চুরি সহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে চবির ১৬ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সনদপত্র স্থগিত ও ছাত্রত্ব বাতিল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসাশন। এদের মধ্যে ১৩ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার, সাবেক দুই শিক্ষার্থীর সনদ স্থগিত এবং এক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। যাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ঝুপড়িতে সাইফুল্লাহ খালেদ নামে এক শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে মারধর করে চবি ছাত্রলীগের সিক্সটি নাইনের কর্মীরা। যদিও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান শুধুমাত্র ২০১৫ সালের ফেইসবুকে একটা ইসলামি স্ট্যাটাস দেওয়ার অপরাধে তাকে মারধর করা হয়েছে।
প্রশংসনীয় উদ্যোগ
গত ২১ ফেব্রুয়ারী ‘ক্লিন ক্যাম্পাস, গ্রীন ক্যাম্পাস’ কর্মসূচি গ্রহণ করে শাখা সংগঠনটি। ভাষার মাসে ভাষা শহীদদের স্মরণে চবি ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজায়নের ওই কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি ‘খেলা ধুলায় বাড়ে বল, মাদক ছেড়ে খেলতে চল’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চবি ছাত্রলীগের বগিভিত্তিক গ্রুপ ‘বাংলার মূখ’র উদ্যোগে ‘অমর একুশে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট-২০১৯’-এর আয়োজন করা হয়। এতে শাখা ছাত্রলীগের অধিকাংশ পক্ষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মত।
এছাড়া গত ১৮ ফেব্রুয়ারী চবিতে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে শাখা ছাত্রলীগের একাংশের নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে সিক্সটি নাইন ও কনকর্ড গ্রুপ মানববন্ধন করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে এ দাবি জানান। এছাড়া চাকসু নির্বাচনের দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে চবি ছাত্রলীগ। সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়ে দাবি জানায় নতুন শহীদ মিনার নির্মানের।
সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারী রাতে ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকান্ডে নিহতের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করে ১ মিনিটের নিরবতা পালন করে চবি ছাত্রলীগ। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে ৫২’র ভাষা শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিলুপ্ত কমিটির কোন নেতাই কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না শর্তে একাধিকজন জানান, বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া সংগঠনের কাছ থেকে এ ধরণের আচরণ কাম্য নয়। অন্তত ভাষার মাসে সংযত হওয়া উচিত ছিল। তবে সংঘর্ষের নেপথ্যের কারণ হিসেবে কমিটি না থাকাকে দায়ী করেন ওই দুই নেতা।